ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক
‘‌মাননীয় স্পিকার মহোদয়, ইন্ডিয়া ইজ অ্যা স্পিটিং নেশন। আমরা একঘেয়ে বোধ করলে থুতু ফেলি, আমরা ক্লান্ত থাকলেও থুতু ফেলি, রেগে গেলে তো ফেলিই বা কিছু করার না থাকলেও থুতু ফেলি!‌ আমরা যেখানে–‌সেখানে থুতু ছেটাই, সবসময় করি, এমনকী অসময়েও’। ২০১৬ সাল। রাজ্যসভার কার্যবিবরণী থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বের বক্তব্যটুকু তুলে আনলাম। বক্তা তৃণমূল সাংসদ–‌সাংবাদিক মহম্মদ নাদিমুল হক। সায় দেন প্রায় সব দলেরই সাংসদ। বিদেশে ভারতের মূল্যায়নে অনেকে হাতি, মহারাজা এবং স্নেক চার্মারের পাশাপাশি রসিকতায় যোগ করেছেন ‘‌দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান স্পিট’। করোনা–‌কালে এই থুতু ফেলা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ধোঁয়াহীন তামাক সেবনের প্রবণতা অতীতে বাঙালির আত্মিক সমর্থন সেভাবে পায়নি, বলা হত ওটা অন্য প্রদেশের কৃষ্টি। বাঙালি সংস্কৃতিতে তার আদৌ স্থান নেই। এখন বোধহয় দিগ্বিদিক রাঙিয়ে দেওয়ার ‘‌কালচার’–‌এ আমরা পিছিয়ে নেই।‌ সিগারেট–‌বিড়ি–‌সিগার অপরাধ এবং বর্জনীয়। পানমশলা, গুড়াখু, গুটখা, খৈনি, তাম্বাকু, জর্দা, গুল, কিয়াম, নস্যি কম কীসে?‌ মুশকিল, সর্বশেষ সমীক্ষা জানাচ্ছে বাঙালিও এই বিপজ্জনক নেশায় ডুবছে।
‘‌পান পরাগ কালচার’‌ কি সত্যিই আমাদের গ্রাস করল?‌ ‘অতি ‌অবশ্যই’‌। সম্পূর্ণ একমত মেডিসিন অতি–‌বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুকুমার মুখার্জি, কার্ডিয়াক সার্জেন ডাঃ কুণাল সরকার, ক্যান্সার সার্জেন ডাঃ গৌতম মুখার্জি, ফেসিও–‌ম্যাক্সিলারি সার্জেন ডাঃ সৃজন মুখার্জি এবং দন্ত শল্যবিদ ডাঃ পি কে ব্যানার্জি। পুণেতে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সোশ্যাল সাপোর্ট গ্রুপ ‘‌সারে জাঁহা সে আচ্ছা’। তাদের দীর্ঘকালীন ক্যাম্পেন ‘‌স্পিট ফ্রি ইন্ডিয়া’‌। অধিকর্তা রাজা নরসিমহন সম্প্রতি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী এক সমীক্ষা–‌যাত্রার পর জানান, ভারতের কোনও দেওয়াল‌ রেহাই পায়নি। উত্তর ভারতে পরিস্থিতি চূড়ান্ত খারাপ, দক্ষিণে কিছুটা যেন রেহাই। দেশের সর্বত্র, একজন মার্সিডিজ মালিক থেকে সাধারণ শ্রমজীবী, কেউ এ বদঅভ্যাস থেকে মুক্ত নন। ৫ এপ্রিল আইসিএমআর এবং ১০ এপ্রিল কেন্দ্রের স্বাস্থ্য মন্ত্রক কড়া আদেশ জারি করে। ‘‌জনারণ্যে থুতু ফেলা নিষিদ্ধ। তাতে কোভিড–‌১৯ সংক্রমণ হু হু করে বাড়তে পারে’‌। একইসঙ্গে ২০০৫ সালের জাতীয় বিপর্যয় আইন বলবৎ করে স্বরাষ্ট্র দপ্তর। তার ৫১(‌বি)‌ ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, প্রকাশ্য স্থানে থুতু ফেললে ১ বছর অবধি জেল, আর্থিক জরিমানা এমনকী দুটো একযোগে হতে পারে। বিহার সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক ডাক্তার, পরে আইএএস ডাঃ কৌশল কিশোর বললেন, আইন আমরা প্রণয়ন করতেই পারি। দেশের মানুষের যা মানসিকতা, তাদের ঘাড় ধরে বাধ্য না করালে কেউ কিস্যু শোনেন না।
ডাঃ সুকুমার মুখার্জি বললেন, প্রকাশ্যে থুতু ফেলার রীতি সব দেশে, সব কালেই বর্জনীয়। পানমশলা জাতীয় ধোঁয়াহীন তামাক মুখের লালা বা স্যালাইভা নিঃসরণ বাড়ায়। তার ফল পথেঘাটে দেখতে পাই। ডাঃ পি কে ব্যানার্জি মনে করেন, গ্রামের দিকে চল বেশি। এখন অবশ্য শহরও বাদ যায় না। মানুষ অজুহাত খোঁজেন। সিগারেট বিড়ির মতোই এই স্মোকলেস টোব্যাকো নাকি মানুষকে প্রশান্তি দেয়। ডাঃ গৌতম মুখার্জি বললেন, স্পিটিং টোব্যাকো অত্যন্ত বদঅভ্যেস। সিগারেট ফোঁকার মতোই জঘন্য অপরাধ। ভয়েজ অফ টোব্যাকো ভিক্টিম্‌স (‌ভিওটিভি)‌ দেশজুড়ে প্রচার এবং সামাজিক আন্দোলন চালায়। আমি ন্যাশনাল পেট্রন। এখানে ক্যান্সার ঠেকাতে অনেক সভা ও মিছিল করেছি। আগে কয়েকটি সম্প্রদায় ও বিশেষ জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হত। এখন বাঙালিরাও এ দোষে দুষ্ট। বিভিন্ন আর্থ–‌সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষ দায়ীই। সচেতনতা না বাড়লে বলপ্রয়োগে কিছু হবে না। একটা নামী আবাসনে সিসিটিভি লাগানোর পরই আবাসিকদের পান বা পানমশলা খেয়ে থুতু ছেটানোর অভ্যেস দূর হয়েছে।
ডাঃ সৃজন মুখার্জি জানালেন, ভারতে ৩০ থেকে ৪০%‌ মুখের ক্যান্সার হয়। সুপারি, খয়ের, চুন এবং তামাক মিশলে ‘‌ডেডলি কম্বিনেশন’‌ তৈরি হয়। সুপারিতে এমনিতেই অ্যারেকোলিন নামক অ্যালকালয়েড বা ক্ষার থাকে। সেটা প্রমাণিত কার্সিনোজেন। দীর্ঘদিন সুপারি খেয়ে অনেকের মুখ আর হাঁ হয় না। ক্যান্সারের আগের পর্বে ফাইব্রোসিস হয়ে যায়। ভয়ঙ্কর। ভারতে ওরাল হ্যাবিট বেশ খারাপ। অনেকের ওরাল হাইজিন অর্থাৎ মুখের স্বাস্থ্য বা পরিচ্ছন্নতাবোধ খুব নিম্নমানের। ধোঁয়াহীন‌ তামাকের প্রতিটি ভ্যারিয়ান্ট প্রচণ্ড ক্ষতিকারক। খৈনির রসটা যাতে সহজে মুখের ঝিল্লি বা মিউকাস মেমব্রেনে শোষিত হয় সেজন্যই চুনের ব্যবহার। কিন্তু সেটা ওই অংশটায় ক্রমাগত ক্ষত তৈরি করতে থাকে। ক্ষত সারায় কোষের বিভাজন। ভুল বিভাজনেই তো ক্যান্সারের উৎপত্তি। মনে রাখা দরকার থুতু ফেললে তার থেকে শুধু নোভেল করোনাভাইরাস কেন, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা–‌সহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের জীবাণু ছড়ায়। আমরা ভুলে যাই কথা বলার সময় অজান্তে মুখ থেকে থুতু ছিটকায়। আর পানমশলার রস জমিয়ে রাখলে তো কথাই নেই!‌ ডাঃ কুণাল সরকার‌ বললেন, কিছু জিনিস আমাদের মজ্জাগত হয়ে গেছে। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসলেই যেমন হর্ন বাজাতে হবে। দিনে দেড় লিটার থুতু তৈরি হয়। সেটা গেলার জন্যই। উত্তর ভারতে কিডনিতে পাথর বেশি হওয়ার কারণ শরীরে জলের মাত্রা কমে ডিহাইড্রেশন হয় বেশি থুতু ফেলে। পানমশলা খেয়ে থুতু ছেটানো বন্ধ করতে বরং এক প্রকল্প নেওয়া হোক। সব বড় রাস্তায় কলকাতা পুলিশের সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। থুতু ফেলার ছবি ক্যাপচার করে রোজ সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে ‘‌টুডে’‌জ স্পিটিং হিরো’‌ বা আজকের থুতু ফেলা বীরপুরুষদের ছবি দিনের পর দিন প্রকাশ করা হোক। ‘‌নেমিং অ্যান্ড শেমিং’‌ নীতি ছাড়া এ প্রবণতা বন্ধ হওয়ার নয়।
‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’‌ সিনেমায় গান্ধীগিরি শেখাতে এফএম রেডিওয় সঞ্জয় দত্ত থুতু ফেলা রুখতে শ্রোতাদের যে ‌‌দাওয়াই বাতলেছিলেন, বাঙালির জন্য কি তেমনই করার সময় এল?‌(প্রতীকী ছবি)

জনপ্রিয়

Back To Top