নীলাঞ্জনা সান্যাল: গতানুগতিক পড়ানো নয়। সম্পূর্ণ অন্য আদলে গড়ে উঠছে সংস্কৃত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়। রাজ্যের আর–‌পঁাচটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হয়, এখানে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। যা সাধারণত কোথাও পড়ানো হয় না, সেই বিষয়গুলির ওপরই জোর দিতে চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে ‘‌কাট পেস্ট’‌ করা নয়। নতুন আঙ্গিকে এবং চিন্তা–‌ভাবনায়, সংস্কৃত কলেজের ঐতিহ্যকে মাথায় রেখেই তৈরি হচ্ছে নতুন পাঠ্যক্রম। উপাচার্য পলা ব্যানার্জি বলেন, ‘‌সংস্কৃত ভাষা কোনও ধর্মের ভাষা নয়। সংস্কৃত বিশ্বকে দেখার আয়না। দর্শনের আঙ্গিকে আমরা সেটাই দেখাতে চাই।’‌
বিষয় হিসেবে পড়ানো হবে না বিজ্ঞান। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার থাকছে। পড়ানো হবে ভাষা, ভাষা–‌সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন। এ ছাড়া থাকছে মিউজিওলজি, আর্কিওলজি এবং ম্যানুস্ক্রিপ্টোলজি। 
এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় সংস্কৃত, প্রাকৃত, বাংলা, ইংরেজি ভাষা। উপাচার্য জানালেন, খুব শিগ্‌গির, হয়তো আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে তঁারা দেবনাগরী এবং তামিল ভাষা পড়ানো শুরু করবেন। শুধু দেশের নয়, পড়ানো হবে বিদেশের ভাষাও। জার্মান, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ।
ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রেও গতানুগতিকতার বাইরে হঁাটতে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়। আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপ–‌কেন্দ্রিক ইতিহাস নয়। পড়ানো হবে মধ্যপ্রাচ্য, থাকবে আরব, ইজরায়েলের ইতিহাস, দক্ষিণ, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়ার ইতিহাস। তার সঙ্গে পড়ানো হবে আফ্রিকা। উপাচার্য বলেন, ‘‌রাজ্যে তো বটেই, মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া দেশের কোথাও সেভাবে আফ্রিকার ইতিহাস পড়ানো হয়। আমরা পড়াব।’‌ 
পড়ানো হবে দর্শনের বিভিন্ন দিক। ন্যায়দর্শন, ধর্মশাস্ত্র, ব্রহ্মবিদ্যা। চর্চা করা হবে ধর্মের বিভিন্ন দিক। যেমন ধর্মের দর্শন। 
সদ্য হঁাটতে শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। সংস্কৃত কলেজটিই এখন সংস্কৃত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়। একক বিশ্ববিদ্যালয়, অধীনে কোনও কলেজ না থাকলেও নির্দিষ্ট কোনও ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। রাজ্যের যে–‌কোনও জায়গায় তঁারা স্টাডি সেন্টার বা ক্যাম্পাস খুলতে পারেন বলে জানালেন উপাচার্য। আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের পঁাচটি ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হবে। কলেজ স্ট্রিটের মূল ক্যাম্পাসটি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। সংস্কৃত কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই ক্যাম্পাসের একটি ঘরে অজস্র পুঁথি পড়ে রয়েছে। সেগুলিকে ইতিমধ্যেই ডিজিটাইজ্‌ড করার প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। এই ক্যাম্পাসটিতে মূলত সংস্কৃত মিউজিয়াম এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা কেন্দ্র করা হবে। পাশাপাশি মিউজিওলজি, আর্কিওলজি ও ম্যানুস্ক্রিপ্টোলজি নিয়ে পঠনপাঠনও এই ক্যাম্পাসে হবে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসটি গড়ে তোলা হবে নবদ্বীপে। এই ক্যাম্পাসটি তৈরি হবে সংস্কৃত ও ভারতীয় দর্শনের চর্চাকেন্দ্র হিসেবে। সেখানে অবশ্য স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ থাকছে। তৃতীয় ক্যাম্পাসটি হবে রাজারহাটে। যেখানে বিশ্বের ইতিহাস, বিদেশি ভাষা ইত্যাদি পড়ানো হবে বলে ঠিক হয়েছে, জানিয়েছেন উপাচার্য। বাকি দুটি ক্যাম্পাস হবে মেদিনীপুর ও কোচবিহারে।  
ইতিমধ্যেই নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতাপত্র সই হতে চলেছে। জার্মানির ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও অনেক দূর কথা এগিয়েছে। উপাচার্য বলেন, ‘‌ওখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক শিক্ষিকা এখানে এসে ভারতীয় দর্শন ও ইতিহাস 
নিয়ে চর্চা করতে চান বলে আমাদের জানিয়েছেন।’‌
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে ৩০০–‌র মতো টোল রয়েছে। এই টোলগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসার কথা। টোলগুলির আধুনিকীকরণ করা কথা ভাবা হয়েছে। উপাচার্য জানালেন, ‘‌এখানে যঁারা পড়েন বা পড়ান, তঁাদের ভবিষ্যৎ কী?‌ দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশই পুরোহিতগিরি করেন। পুরোহিত তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হতে পারে না। আমরা ঠিক করেছি, টোলগুলিতে সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে ভারতীয় দর্শন, ইতিহাস পড়াব। মন্ত্রের ইতিহাস পড়ানো হবে। ‘‌ওঁ’ ‌মন্ত্র আমরা কেন উচ্চারণ করি, ইত্যাদি। মেয়েরাও যাতে পড়তে পারেন, তার সুযোগও থাকবে।’‌ জল, আগুন, নির্দিষ্ট কিছু গাছ, গাছের পাতা পুজোয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, পড়ানো হবে সে–‌সবও। শুধু হিন্দু ধর্ম নয়, সব ধর্মের মধ্যেই রয়েছে এটা। ব্যাপটিজমের সময়ও জল লাগে। টোলের পড়ানোর পাঠ্যক্রম তৈরির জন্য বিভিন্ন ধর্মের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন উপাচার্য। 
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সংস্কৃত ছাড়াও ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনে স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম চালু হতে চলেছে। পাঠ্যক্রম তৈরির জন্য বোর্ড অফ স্টাডিজ গঠন করা হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কিছু ডিপ্লোমা কোর্সও চালু হয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশ মেনে সেমেস্টার ও চয়েস–‌বেস্‌ড ক্রেডিট সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

 

ক্লাস চলছে।

জনপ্রিয়

Back To Top