বললেন তিনি। মুকুন্দপুর আমরির ঘটনায় তাঁর অপসারণের দাবি উঠেছে। অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য প্রশাসক মানছেন, আরও স্বচ্ছতা দরকার। শুনলেন সাগরিকা দত্তচৌধুরি 

সুষ্ঠুভাবে একটা হাসপাতাল চালাতে গেলে কী করা উচিত? ‌‌
রূপক বড়ুয়া: সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংবেদনশীল প্রশাসন। এখন মানুষের মধ্যে একটা অবিশ্বাস কাজ করছে। তার কারণ যোগাযোগ বা সমন্বয়ের অভাব। সংবেদনশীল হতে শেখানো একদিনে সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে হবে। নিজেদের রোগীর জায়গায় বসালে এটা বুঝতে সুবিধা হবে। 
‌‌ কীভাবে রোগীর বাড়ির লোক ও প্রশাসনের দূরত্ব কাটানো সম্ভব?‌‌ 
রূপক: সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি খুব বাজে জায়গায় চলে যাচ্ছে। কিছু হলেই রোগীর বাড়ির লোক চিকিৎসকদের সন্দেহ করছেন। তাঁদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। সব হাসপাতালকেই বলব, এই বিষয়টায় ভালভাবে নজর দিতে। চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রশাসন রোগীর পরিজনদের একটু সময় দিলেই অবিশ্বাসের বাতাবরণ কেটে যাবে। 
‌‌  হাসপাতালের কর্মীদের জন্য কি কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়? ‌‌
রূপক: হ্যাঁ, কর্মীদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা সব জায়গাতেই আছে। মাঝে মাঝে সব কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া কিন্তু কম–বেশি সব প্রতিষ্ঠানেই হয়। যদি আমাদের প্রতিষ্ঠানের কথা বলেন, এখানে কিন্তু আলাদা প্রশিক্ষণ বিভাগই আছে। রোগীর পরিজনদের সঙ্গে আচরণ কী রকম করতে হবে, সে বিষয়ে আমাদের এখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু আমার মনে হয়, রাতারাতি সব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। নিজের মনের ভেতর থেকে পরিবর্তনটা হওয়াটাই দরকার। 
‌‌ সব বেসরকারি হাসপাতালকে কী বলবেন? 
রূপক: মূল বিষয়টা হল কীভাবে আমি পরিস্থিতির মোকাবিলা করছি, সেটা দেখা। শুধু আমরি বা অ্যাপোলো হাসপাতাল বলে নয়, সব হাসপাতালের ক্ষেত্রেই দরকার কত সহজে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলাচ্ছি, এটা দেখা। আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে সমন্বয় বজায় রেখে চলতে হবে।
‌‌ আপনি তো এর আগে পিয়ারলেস, বিড়লা গ্রুপ এবং সিএমআরআইয়ের সঙ্গে ছিলেন। তখন কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতেন? ‌এখন কি হাসপাতাল প্রশাসন চালানো আরও কঠিন হয়ে গিয়েছে? ‌‌
রূপক: ‌আগে লোকজন তাড়াতাড়ি ধৈর্য হারাতেন না।  চিকিৎসা পরিষেবা নেব। অথচ বিল দেব না— আগে এধরনের অযাচিত এবং অদ্ভুত আব্দার ছিল না। যেটা ইদানিং ভীষণভাবে দেখা যাচ্ছে। সর্বাধুনিক মানের চিকিৎসা পরিষেবা চাই। অথচ বিল মেটানোর সময় টাকা দেব না— এমন একটা মানসিকতা চলে এসেছে। হাসপাতালের প্রশাসন নিত্যদিন এ ধরনের বিষয় সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত। ফলে অনেক সময় তারাও সহ্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। আগের থেকে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।  তবে আমাদেরও যেটা করণীয়, সেটা হল বিলের ধোঁয়াশা কাটিয়ে স্বচ্ছতা আনা। সকলকে নিয়ে একসঙ্গে বসে কাজ করা। 
‌‌ রোগীর পরিজনদের কী পরামর্শ দেবেন?
রূপক: বলব, যাতে অহেতুক কোনও ‌‌অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না করা হয়। সমস্যা হলে হাসপাতালে ভাঙচুর করে বা কর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে সমাধান হবে না। বুঝতে হবে, হাসপাতালে একই জায়গায় আরও অনেক রোগী থাকেন। শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সংবেদনশীল হলে হবে না। রোগীর বাড়ির লোককেও সংবেদনশীল হতে হবে। হাসপাতালেরও কিছু বাধ্যবাধকতা, কিছু নিয়মকানুন থাকে। সেগুলো মেনে চলতে হয়। 
‌‌ রোগীর পরিবার আর ম্যানেজমেন্টের কী সম্পর্ক হওয়া উচিত?‌
রূপক: বন্ধুত্বপূর্ণ। রোগীর পরিজনকে নিজের পরিবারের একজন ভাবতে হবে। তাঁদের কতটা চাপ আর মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটাতে হচ্ছে, সেটা বুঝতে হবে হাসপাতালের প্রশাসনকে। আবার রোগীর পরিবারকে বুঝতে হবে, হাসপাতালে প্রশাসনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। 
‌‌ রোগীর পরিজনেরা এত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন কেন? শুধুই অবিশ্বাস? ‌‌
রূপক: অবিশ্বাসের চেয়েও বড় কারণ হল, যেনতেন প্রকারে বিল না–মেটানোর মানসিকতা। আরেকটা জিনিস দেখছি, মৃতের পরিবার পরিস্থিতি বুঝে  হয়ত চলে গেছেন। কিন্তু আশেপাশের বহিরাগতরা ইন্ধন জোগাচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। 
‌‌ বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় কেন এত খরচ?‌ বিল নিয়ে অস্বচ্ছতা কেন? ‌
রূপক: বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা এখন প্রচুর ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনেক চেষ্টা করছে সাধারণ মানুষকে ভাল স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার। এতটা চেষ্টা অন্য কোনও রাজ্যে দেখা গেছে বলে আমার মনে হয় না। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে বেসরকারি হাসপাতাল থাকাও জরুরি। আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে। যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, তুলনায় সেই পরিমাণ রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না।  আধুনিক প্রযুক্তির নতুন নতুন মেশিন আসছে, অনেক লোক কাজ করছেন, ওষুধের খরচ, বৈদ্যুতিক খরচ— সমস্ত মেটাতে বেসরকারি হাসপাতাল দিশেহারা। তবে তার মানে এই নয় যে, যে যা খুশি চার্জ করবে। যে কোনও হাসপাতাল যেটাই চার্জ করুক, তার মধ্যে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। রোগীর বাড়ির লোককে স্পষ্ট বোঝাতে হবে। এখনও অনেক জায়গায় স্বচ্ছতা মানা হচ্ছে না। বিলে স্বচ্ছতা আনার দিকে আরও বেশি জোর দিলে রোগীর পরিজন, হাসপাতাল, চিকিৎসকদের মধ্যে দূরত্ব কাটানো যাবে। 
‌‌ সম্প্রতি যে সব কাণ্ড ঘটছে, সেগুলো  কীভাবে সামলানো যেত?
রূপক: অনেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। কোনও রোগী মারা গেলে তিনি কেন মারা গেলেন, কীজন্য বাঁচানো গেল না, এসব অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে বোঝাতে হবে।  রোগীর পরিবারকেও বুঝতে হবে হাসপাতালে রোগী এলেই ১০০ ভাগ গ্যারান্টি সহকারে ভাল হয়ে যাবেন তা নয়। রোগীর মৃত্যুর পিছনে গাফিলতি তা ছাড়াও অনেক কারণ থাকে। প্রসাশনের কর্তারা রোগীর পরিজনদের সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে পরিষ্কারভাবে বোঝালে পরিস্থিতি অনেক সহজ হয়ে যাবে।

জনপ্রিয়

Back To Top