সংবাদ সংস্থা, দিল্লি, মুম্বই: কম্পিউটার কার্যত বিলাসিতা। স্মার্টফোন বাড়িতে একটা থাকলেও কাজের জন্য সেটা হাতছাড়া করতে চান না বাবা–মা। বিদ্যুৎও থাকে না। ফোনে চার্জ ফুরিয়ে গেলে আরেক উৎপাত। ইন্টারনেট পরিষেবার সঙ্গেও সকলে পরিচিত নয়। সব মিলিয়ে অনলাইন ক্লাসের ধাক্কায় জেরবার অধিকাংশ পড়ুয়া। তাদের স্বপ্নগুলো ক্রমশই হয়ে যাচ্ছে ধূসর। অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে তাদের অভ্যস্ত করতে গিয়ে নাজেহাল শিক্ষক–শিক্ষিকারা। জম্মু–কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, সর্বত্র একই ছবি। 
করোনা সংক্রমণের দাপটে দেশজুড়ে পঠন–‌পাঠন হচ্ছে অনলাইনে। এর সঙ্গে খাপখাইয়ে নেওয়া যাবে তো, গোড়া থেকেই এই সংশয় ছিল পড়ুয়াদের একাংশের। দিন যত গড়াচ্ছে সমস্যা ততই গভীর হচ্ছে। দিল্লি–নয়ডা সীমান্তে যমুনার তীরে মাথা নীচু করে রয়েছে অসংখ্য ঝুপড়ি। নদী ফুলে ফেঁপে উঠলে নৌকা চড়ে স্কুলে চলে যেত ঝুপড়ির ছেলেমেয়েরা। এখন ঘরে থাকলেও অনলাইন ক্লাস করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে তারা। সেখানকারই বাসিন্দা জ্যোৎস্না কুমারী। ১২ বছরের মেয়েটির বাড়িতে একটা ফোন আছে। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনলাইন ক্লাস করতে পারছে না। ফোনে চার্জ দেওয়ার জন্য কয়েক কিলোমিটার পথ উজিয়ে যেতে হয়। চার্জ ধরে রাখতে ফোনের আলো কমিয়ে রাখতে হয়। তাছাড়া তার ভাইও স্কুল পড়ুয়া। একটা ফোনেই দু’‌জনকে অনলাইন ক্লাস করতে হয়। একজন যখন পড়ে অন্যজনের তখন বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই। বাবা দিনমজুর। সংসার চালিয়ে আরেকটা ফোন কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর।
 হরিয়ানার সূচি সিংয়ের গল্পটাও একই রকম। অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া সূচিরা তিন ভাইবোন। পালা করে ফোন ব্যবহার করতে হয় তাদের। ক্লাসের টপার হলেও ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছে না। বাবা রাজেশ কুমার খবরের কাগজ বিক্রেতা। জোড়াতালির সংসার চালিয়ে আরেকটা ফোন কেনা তাঁর কাছে বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। তাঁর কথায়, ‘‌ই–ক্লাস জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।’‌
আরব সাগরের তীরেও অস্বস্তির হাওয়া। মুম্বইয়ের আর্য কলোনির বাসিন্দা জ্যোতি রনধে। দশম শ্রেণির পড়ুয়া। বাড়িতে একটা স্মার্টফোন আছে। মায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। জ্যোতির বান্ধবী রোশনী নেরিরও একই অবস্থা। দুই বোনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে হয় তাকে। এ অবস্থায় মেয়েদের ভবিষ্যতের চিন্তায় ঘুম ছুটেছে রোশনীর মায়ের। মায়ানগরী থেকে কাশ্মীরের দিকে চোখ রাখলেও ধরা পড়বে ক্ষোভ। সেখানে ক্ষোভ নেট নিয়ে। ধীর গতির ২জি পরিষেবায় উঁচু ক্লাসের পড়াশোনা চালানো কষ্টকর, বলছেন স্থানীয় লোকজন। সময়ও বাঁধা ধরা। অনেক প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে অজানা। তখন অন্যের সাহায্যের অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে মোবাইল ফোনের ব্যবহারও জানে না। 
ওদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে অনলাইন ক্লাস করতে গিয়েও ক্লান্ত হয়ে পড়ছে পড়ুয়ারা। একের পর এক বিভিন্ন বিষয়ের পঠন–‌পাঠন। সঙ্গে পরীক্ষা। তড়িঘড়ি খাতা জমা করে দেওয়া। একটা ক্লাস শেষ হতে না হতেই আরেকটা তাড়া। খাপ খাওয়াতে গিয়ে দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়। অথচ লকডাউনের জেরে এটাই এখন রুটিন হয়েছে।
অনলাইন ক্লাসের হরেক অসুবিধার শোনা যাচ্ছে শিক্ষিক–শিক্ষিকাদের মুখে। মুম্বইয়ের একটি স্কুলের গণিতের শিক্ষিকা জয়াশ্বরী আরসি নাদার। তাঁর কথায়, অঙ্ক জিনিসটা পড়ুয়াদের হাতে ধরে শেখাতে হয়। অনলাইন ক্লাসে সেটা করা কষ্টকর। ১০–১৫ জন ছাত্রছাত্রী ক্লাস করতেই পারছে না।
ধারাভির স্কুলের হিন্দি ও ইতিহাসের শিক্ষিকা জয়েশ্বর সুলোচনা। তাঁর কথায়, অধিকাংশ পড়ুয়া থাকে এক কামরার ঘরে। শোরগোলে তাদের পড়াশোনার দফারফা। বাড়ির বড়রা স্মার্টফোন নিয়ে কাজে চলে যান। ফলে অনেকেই অনলাইন ক্লাস করতে পারছে না। সকলে মোবাইলের ব্যবহারও জানে না। অনলাইন ক্লাস করিয়ে শান্তি নেই। কলকাতার একটি স্কুলের ভূগোলের শিক্ষিকার কথায়, পড়ুয়াদের মানচিত্র দেখিয়ে পড়াতে হয়। কিন্তু ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে পড়ার সুবিধা নেই। অনেকেই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে পড়াশোনায় অনভ্যস্ত। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ করেও পড়ানো সম্ভব নয়। অনেকে গ্রুপে থাকে না। এভাবে অনেকেই পড়তে পারছে না। জানা গিয়েছে দিল্লির সরকারি স্কুলগুলিতে মোট ১,৬০০,০০ পড়ুয়া রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ শতাংশ অনলাইন ক্লাসের পরিষেবা নিতেই পারছে না।
অনলাইন ক্লাস চালু হলেও কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের দেওয়া ২০১৭–১৮ সালের তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে, মাত্র ১০.‌৭ শতাংশ ভারতীয়ের কম্পিউটার রয়েছে। ২৩.‌৮ শতাংশ ইন্টারনেট পরিষেবা ভোগ করে। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক ২০১৭–১৮ সালে গ্রামাঞ্চলে সমীক্ষা করেছিল। তাতে দেখা গিয়েছে ১৬ শতাংশ বাড়িতে দৈনিক ১–৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ৩৩ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে ৯–১২ ঘণ্টা। ৪৭ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকে ১২ ঘণ্টা। স্মার্টফোনের ব্যবহারেও বিস্তর ফারাক। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশের ৩৪ শতাংশ পুরুষ আর ১৫ শতাংশ মহিলা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। সব মিলিয়ে অনলাইন ক্লাস স্বস্তি দিতে পারছে না পড়ুয়াদের।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top