আজকালের প্রতিবেদন: সারা বছর পড়াশোনা, পরীক্ষা আর নানা ইভেন্টে গমগম করে টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউনের ক্যাম্পাস। কেউ কি ভাবতে পেরেছিল হঠাৎ বদলে যাবে সব কিছু!‌ প্রথমে ভাবা গিয়েছিল, খুব বেশি হলে মাসখানেক চলবে এই অচলাবস্থা, তারপর আবার আগের মতোই প্রাণ ফিরে পাবে ক্লাসরুমগুলো, ছেলেমেয়েদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ। তা যখন হওয়ার নয় বোঝা গেল, খুব দ্রুততার সঙ্গে ভেবে নিতে হল অনলাইন শিক্ষণ পদ্ধতিটা ঠিক কেমন হবে। অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারটাই বা কীভাবে ঢেলে সাজানো হবে!‌ প্রায় ৩,০০০ ছাত্রছাত্রী যাতে তথ্য‌প্রযুক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারে, সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়েছে। আমরা সবাই জানি, আগামী দিনে ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতি ছাড়া গতি নেই। লকডাউন সেই সম্ভাবনাকেই ত্বরান্বিত করল। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কলেজের ৮টি বিভাগ প্রতিদিন ১৫০–রও বেশি ভার্চুয়াল ক্লাস আর ভিডিও লেকচার আয়োজন করছে। ২,০০০–‌এরও বেশি অনলাইন ক্লাস হয়েছে এ পর্যন্ত। ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশনের সংখ্যাও কম নয়। সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্রছাত্রীদের প্রবল উৎসাহ এই নতুন শিক্ষা পদ্ধতিকে একশো শতাংশ সফল করে তুলেছে। টেকনো ইন্টার‌ন্যাশনাল, নিউ টাউনের বহু ছাত্রছাত্রী প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ খুব একটা ভাল নয়। তা সত্ত্বেও অনলাইন ক্লাসে গড়ে ৮৫ শতাংশ উপস্থিতি শিক্ষকদের বিস্মিত করেছে। এদের কথা ভেবে অনলাইনে আপলোড করা হচ্ছে লেকচার আর লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে নোট দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে তারা সুবিধামতো সেগুলি ডাউনলোড করে পড়াশোনা করতে পারছে।
করোনা–সঙ্কটের এই দুঃসময়ে যেভাবে অনলাইন পড়াশোনা সংক্রান্ত রক্ষণশীলতা কাটিয়ে ওঠা গেছে, তা নতুন আশা জাগিয়েছে। নানা অ্যাপের মাধ্যমে চলছে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম। মাইক্রোসফট টিমস, জুম, বিগব্লুবাটন, ইউটিউব লাইভ, স্কাইপ মাধ্যমে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকেরা। অনলাইনে পাঠ্য বিষয় শেয়ার করা, আলোচনা ও মূল্যায়নের জন্য মুডল বা স্কুলজি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সাবলীলভাবে ব্যবহার করছেন সবাই। কলেজের অধ্যাপকেরা ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ই–‌লার্নিং প্ল্যাটফর্মকে ঢেলে সাজিয়েছেন। সবসময় খেয়াল রাখতে হচ্ছে যাতে শত প্রতিকূলতার মাঝেও কোনওভাবে পঠনপাঠন পিছিয়ে না যায়। ক্লাসরুম থেকে চ্যাটরুম— এই বাধ্যতামূলক বিবর্তনে শিক্ষক ও ছাত্র কারওরই যেন এতটুকু অসুবিধা না হয়, সেদিকে কড়া নজর রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
নবীন প্রজন্মের উদ্ভাবনীশক্তির ওপর আস্থা রেখে টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউন আয়োজন করেছিল কোভিডাম প্রতিযোগিতা। করোনা মোকাবিলায় নতুন নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগানোর প্রচুর প্রস্তাব এসেছে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে। তাতে প্রতিফলিত হয়েছে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা। যেমন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্র তৈরি করেছে কম খরচের ভেন্টিলেশন বেড। এই প্রজেক্ট জমা দেওয়া হয়েছে সরকারি পোর্টালে। এর পাশাপাশি ট্রেনিং অ্যান্ড প্লেসমেন্ট বিভাগ সব স্ট্রিমের প্রি–‌ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রছাত্রীদের কোডিংয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এজন্য প্রতি সপ্তাহে কোজোন অ্যাপে ল্যাব কার্যক্রম চলছে। এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে চাকরি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউনের বিশেষত্ব হল, ওপেন লার্নিং। বিশ্বের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা পরিচালিত প্রায় ৩,৮০০টি অনলাইন কোর্স বিনামূল্যে করার সুযোগ পায় ছাত্রছাত্রীরা। এতে বরাবরই ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। এক একজন ছাত্র দুটি করে কোর্স জুলাইয়ের ভেতর শেষ করে ফেলছে এমন উদাহরণও আছে। গেট বা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিও তারা নেয় অনলাইনে। এ ছাড়া এই লকডাউন পরিস্থিতিতে ওয়েবিনার সেশনে নিয়মিত আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে শিল্পক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেদের। তঁারা তঁাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, তাঁরা জানতে পারছেন আগামী দিনে কী ধরনের প্রযুক্তি বা মানবসম্পদের চাহিদা তৈরি হতে পারে চাকরির বাজারে। গতানুগতিক পড়ার বাইরে এই ধরনের সেশন ছেলেমেয়েদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। সেজন্য সারা বছর টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউন এই ধরনের সেমিনার আয়োজন করে ক্যাম্পাসে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অবশ্য সবটাই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে। থেমে নেই ইন্টার্নশিপের সুযোগও। ইন্টার্নশালা প্ল্যাটফর্মে ওয়ার্ক ফ্রম হোম মডেলে শিক্ষানবিশি করছে ছেলেমেয়েরা। পঁাচ হাজারেরও বেশি বিকল্প থেকে তারা নিজেদের স্ট্রিম ও ইয়ার অনুযায়ী বেছে নিচ্ছে। ইন্টার্নশিপ শেষে মিলছে সার্টিফিকেট আর স্টাইপেন্ড।
কমবয়সিরা যে ঘরবন্দি হয়ে কতখানি হতাশ, সেটা সবাই জানেন। একঘেয়েমি কাটাতে তাই নানা পরিকল্পনা নিয়েছে টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউনের হবি ক্লাবগুলি। শুধুমাত্র সদস্যরা নয়, যে কেউ এখন যে কোনও ক্লাবের প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারে। মিউজিক ক্লাব, ফিল্ম ক্লাব, ফোটোগ্রাফি ক্লাব, লিটারেরি ক্লাব, আর্ট ক্লাব, কন্যাশ্রী ক্লাব দারুণ সক্রিয় উঠে উঠেছে। অনলাইনে নিয়মিত হচ্ছে কুইজ, গল্প বলার আসর, চলচ্চিত্র সমালোচনা। ম্যাকাউট–‌এর নির্দেশ মেনে বাড়িতে বসেই কী করছে ছাত্রছাত্রীরা, তা আপলোড করতে হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে— সে রান্নাই হোক কি বয়স্ক মানুষের সেবা। শুধু যে পয়েন্ট পাওয়ার তাগিদ তা নয়, ছেলেমেয়েরা সামাজিক দায়িত্বেরও পরিচয় দিচ্ছে এ সবের মাধ্যমে।
অবরুদ্ধ পৃথিবী। তবু থেমে নেই ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড আউটরিচ বিভাগের কর্মকাণ্ড। মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গবেষণার নানা ক্ষেত্রে পরিকল্পনা চলছে। তাছাড়া সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজেস–‌এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিদেশি ভাষা শিক্ষার ভার্চুয়াল ক্লাস শুরু হয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ও এআইসিটিই–‌র সহযোগিতায় টেকনো ইন্টারন্যাশনাল, নিউ টাউন আগামী দিনের নিউ নর্মাল পৃথিবীর জন্য শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করছে। আজকের এই লড়াই তাদের ঋদ্ধ করছে ভবিষ্যতের সাফল্যের লক্ষ্যে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top