রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সুপারিশ মেনে নিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সিলমোহর দিল নয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে। এর ফলে শিগগিরই আমূল বদলে যাবে গত ৩৪ বছরের শিক্ষানীতি। অনেকেই মনে করছেন এভাবে লেখাপড়া নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করে দিল কেন্দ্র, যা আসলে ধীরে ধীরে শিক্ষায় গৈরিকীকরণেরই অঙ্গ। বদলে দেওয়া হল কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নামও। নয়া নাম শিক্ষা মন্ত্রক। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে সেপ্টেম্বর–‌অক্টোবরেই নয়া শিক্ষানীতির আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার৷
নয়া শিক্ষানীতির খসড়ায় আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে ‘‌জোর করে হিন্দি ভাষা ঢুকিয়ে দেওয়ার’‌ অভিযোগে শোরগোল পড়েছিল। বিশেষত দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো তীব্র আপত্তি তুলেছিল। খসড়ায় বলা হয়েছিল, প্রাথমিক স্তর থেকে শিশুদের বাধ্যতামূলক ভাবে মাতৃভাষা, হিন্দি ও ইংরেজি শেখানো হবে। এখন বলা হয়েছে, পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের শিক্ষা দিতে হবে মাতৃভাষায়। তবে এবার বলা হয়েছে, এই ৩টি ভাষা নির্বাচন করবে রাজ্য, অঞ্চল এবং পড়ুয়ারা। এর মধ্যে কমপক্ষে দুটি ভাষা দেশের স্থানীয় ভাষা হতে হবে। নতুন শিক্ষানীতিতে দশম শ্রেণির পরীক্ষার গুরুত্ব কমে গেল। চালু হবে ৩ থেকে ১৮ বছরের বাচ্চাদের জন্য ৫+‌৩+‌৩+‌৪ কাঠামো।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে শিক্ষা মন্ত্রক নামটি তুলে নাম দেওয়া হয়েছিল মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। তারপর আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিক্ষা নীতি এবং মন্ত্রকের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করে এসেছে। এর আগে প্র‌য়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সময়েই প্রথম বার জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীত হয়েছিল। ১৯৯২ সালে তা সংশোধিত হয়। গত বছর মে মাসে সংসদে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির খসড়া পেশ করে মোদি সরকার। তা জনসমক্ষে আসে জুন মাসে। নতুন শিক্ষানীতির খসড়া প্রস্তুতির সময় ইসরো–‌র প্রাক্তন প্রধান কে কস্তুরিরঙ্গনের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই কমিটিই মন্ত্রকের নাম পরিবর্তন–‌‌সহ একগুচ্ছ পরিবর্তনের সুপারিশ করে। এর মধ্যে ছিল তিন–‌‌ভাষার ফর্মুলা, ৪ বছরের বি–‌‌এড কোর্স, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য বোর্ডের পরীক্ষা। তারপর সরকার কিছু সংশোধনও করে। 
কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী রমেশচন্দ্র পোখরিয়ালের বক্তব্য, ‘‌বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ, শিক্ষাবিদদের পরামর্শ ছাড়াও সমগ্র দেশ‌ থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ পরামর্শ জমা পড়েছিল। সেগুলি খুঁটিয়ে পর্যালোচনার পরেই নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি হয়েছে। ভাষা নিয়ে জটিলতা কাটাতে তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, ওডিশার মতো রাজ্যগুলির শিক্ষা সচিবদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’‌ স্কুল শিক্ষা মন্ত্রকের সচিব অনীত কারওয়াল জানিয়েছেন, শীঘ্রই শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৬ শতাংশ। এখন তা ৪.‌৪৩ শতাংশ। এছাড়া দেশে গবেষণামূলক কাজের জন্য জাতীয় রিসার্চ ফাউন্ডেশন তৈরি করা হবে।
নয়া শিক্ষানীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে উন্নত মানের শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষার অধিকারের বয়সসীমা ১৪ থেকে থেকে বাড়িয়ে ১৮ করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, এবার থেকে কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সার্বিক ভাবে পরীক্ষার আয়োজন করবে ‘‌ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’‌। যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়, বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। ২০২৩–‌‌এর মধ্যে সমস্ত শিক্ষককে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি রপ্ত করতে হবে। স্কুলজীবন শেষ করার সময় প্রতিটি পড়ুয়াকে কমপক্ষে একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। এজন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু হবে। পড়ুয়াদের স্থানীয় ব্যবসা–‌বাণিজ্যের সঙ্গে পরিচিত করা হবে। থাকবে ইন্টার্নশিপ। ইচ্ছে হলে পড়ুয়ারা স্থানীয় ব্যবসায় ১০ দিন শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে পারবে। বলা হয়েছে, নয়া শিক্ষানীতিতে বোর্ড পরীক্ষাকে দু’‌‌ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যা হল, নৈর্ব্যক্তিক ও বর্ণনামূলক।
স্কুল শিক্ষা মন্ত্রকের সচিবের মতে, ‘‌শিক্ষানীতিতে অত্যন্ত কার্যকরী পরিবর্তন আনা হয়েছে।’‌ সেগুলো কী?‌ শিশুদের প্রাক–প্রাথমিক শিক্ষায় বিশ্বায়ন আনা হবে। এজন্য পাঠ্যসূচি তৈরি করবে এনসিইআরটি। মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাতত্ত্বের জন্য একটি জাতীয় মিশনের সূচনা করা হবে। বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা শুরু হবে মধ্য–‌‌স্কুলে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে ‘‌কোডিং’‌ শেখানো হবে। এছাড়া কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের মধ্যে বাধ্যতামূলক বিভেদ আর থাকবে না। অর্থাৎ, এবার থেকে যে–‌কোনও বিভাগের পড়ুয়ারা নিজেদের পছন্দমতো অন্য বিভাগ থেকে বিষয় বেছে নিতে পারবেন। মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সচিব অমিত খারে এদিন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝে লম্বা ছুটি নিতে পারবেন। এই ধরনের ছুটিকে বলা হয় ‘স্যাবাটিকাল’। কতদিনের জন্য ছুটি দেওয়া হবে তা স্থির করবে উচ্চশিক্ষা কমিশন। 
এছাড়া নয়া নীতি অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে একটি ‘‌উচ্চশিক্ষা কমিশন’‌ গঠন করা হবে। এই কমিশনের অধীনে থাকবে বর্তমানের সবকটি নিয়ামক সংস্থা। কমিশনের শীর্ষে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এছাড়াও কলেজগুলিকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সামগ্রিক ভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘এটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। গত ৩৪ বছরে শিক্ষানীতিতে কোনও পরিবর্তন হয়নি। এখন পরিবর্তন দেখে দেশবাসী, বিশেষত বিশ্বের তাবড় শিক্ষাবিদ নিশ্চয় অত্যন্ত খুশি হবেন।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top