ডাঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিল (এন এম সি) বিলে বলা হয়েছে পাঁচ বছর পড়াশোনা করে যাঁরা এম বি বি এস পাশ করেছেন, লাইসেন্স পেতে তাঁদের আলাদা একজিট পরীক্ষা দিতে হবে। এই বাড়তি বোঝা চাপানোর কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। এই পরীক্ষা যদি দিতেই হয়, তা হলে তিনটি ধাপে এম বি বি এস-এর যে পরীক্ষা হয় তা বাতিল করে দেওয়া উচিত। একজিট পরীক্ষা জাতীয়স্তরে স্বীকৃত একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মানকেও তো প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। তা হলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলিকে অনুমোদন দেওয়া ঠিক হয়নি? এটা হাস্যকর। তা ছাড়া এই পরীক্ষা শুধু ডাক্তারি ছাত্রদের দিতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্যান্য পেশার ছাত্রদের দিতে হবে না কেন? এমনিতেই নানা জটিলতার কারণে ভাল ছাত্ররা ডাক্তারি পড়তে চাইছেন না, এই বিল গোটা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করবে। ব্রিজ কোর্স করে চিকিৎসাবিদ্যার অন্য শাখার ছাত্রদের অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করার ক্ষমতা দেওয়ার অর্থ ওই পাঠ্যক্রমগুলি যথেষ্ট অনাধুনিক মনে করা। আর যদি তাই হবে, তা হলে জাতীয়স্তরে এরা কীভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা–পদ্ধতি হিসেবে এতদিন মান্যতা পেয়ে এল? এ তো স্বীকৃতি দিয়ে স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা পড়াশোনা ও পরীক্ষা দিয়ে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক তৈরি হয়। অন্যান্য শাখার ছাত্রদের এই ধরনের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়ে শুধু ব্রিজ কোর্স করে অ্যালোপ্যাথি ওষুধ প্রয়োগের অধিকার দেওয়া প্রবল বিপজ্জনক। এতে স্টেরয়েড-সহ নানা ওষুধের অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। একজন দক্ষ ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ব্রিজ কোর্স করিয়ে কি পাইলট বানানো সম্ভব? রাতারাতি চিকিৎসক সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে এই ধরনের আইনি স্বীকৃতি আদতে সর্বনাশের নামান্তর। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে। এন এম সি-তে মাত্র ৫ জন নির্বাচিত ও ২০ জন মনোনীত সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। মনোনয়ন হলে নিশ্চিত ভাবে স্বজনপোষণ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার সম্ভবত নির্বাচনে আস্থা রাখতে পারছে না। মনোনয়নের মাধ্যমেই যদি উৎকর্ষ বজায় থাকে, তা হলে দেশে নির্বাচন করা কেন? রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের পছন্দে আমাদের প্রতিনিধি মনোনীত হলে নির্বাচনের মতো বিশাল যজ্ঞ করতে হত না। এর পরেও সংগঠনের যে কাঠামো তৈরি হবে তাতে চিকিৎসা–পরিষেবার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবেন কিছু অ-‌চিকিৎসক। কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না, ক্যান্সার, নিউরোলজি বা কার্ডিওলজির মতো কিছু জটিল বিষয়ে দীর্ঘ পড়াশোনা করেও যেখানে থই পাওয়া যায় না, সেখানে এই বিষয়গুলি সম্পর্কে অজ্ঞ কোনও মানুষ এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কেমন করে? এতে ভুল হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। এ যেন পঞ্চায়েত সদস্যের সুপ্রিম কোর্টের নীতি নির্ধারণ করতে যাওয়ার মতো ঘটনা। এই নীতিতে মেধার প্রবেশ কম হতে বাধ্য। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিকে এই বিলে যে সুবিধে দেওয়া হচ্ছে, নিয়মে যে শৈথিল্য আনা হচ্ছে তাতে মেডিক্যাল শিক্ষাতে অর্থ গুরুত্ব পাবে, মেধা নয়। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে এ দেশের চিকিৎসকদের মধ্যে মেধার স্থান হয়তো তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top