ডাঃ সুকুমার মুখার্জি: ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন নামক যে বিলটি পেশ করা হয়েছে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্তর জলঘোলা হতে শুরু করেছে। তার কারণ, প্রস্তাবিত এই বিলে এমন অনেকগুলি বিষয় রয়েছে যেগুলি চিকিৎসা–‌ব্যবস্থার মূল নীতিগুলিকে আঘাত করে। প্রথমত, এই বিল দেশের অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা–‌ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার অধিকার বা ক্ষেত্রকে খর্ব করবে। কারণ এই কমিশনের মাথায় অ–‌‌ডাক্তার আমলা বসার কথা এবং মূল কমিশনের সদস্য হিসেবে বেশ কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও নাকি রাখা হবে!‌ মূল আপত্তির জায়গা এটাই। ডাক্তারি বিষয়ে সিদ্ধান্ত একজন অ–‌‌ডাক্তার আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কীভাবে নেবেন?‌ তা ছাড়াও চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন— হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, সিদ্ধা, ইউনানি, এমন–‌কি ন্যাচারোপ্যাথি পাস করা ডাক্তারও নাকি এবার অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা করার বা ওষুধ দেওয়ার অধিকার পাবেন!‌ এ–‌সব কার স্বার্থে করা হচ্ছে?‌ সবাই মহেন্দ্রলাল সরকার বা ভোলানাথ চক্রবর্তী নন। যাঁরা একটি পদ্ধতির বিশেষজ্ঞ হয়েও অন্য পদ্ধতিতেও সুনাম ও অনায়াস দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এমনটাও অনুমান করা হচ্ছে যে, এবার ডাক্তারি বা চিকিৎসা–‌ব্যবস্থা প্রাইভেট কর্পোরেটদের হাতে চলে যাবে। আকাশছোঁয়া ডোনেশন নিয়ে ছাত্রভর্তি থেকে শুরু করে নানাভাবে দেশের স্বাস্থ্য–‌ব্যবস্থাকে কানমোলা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে এই সব কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মেডিক্যাল কলেজ।
আমার প্রশ্ন অন্যত্র। কোনও আইন কমিশনের মাথায় কি আইনজ্ঞ ছাড়া অন্য কেউ বসেন?‌ দ্বিতীয়ত, যেটা মনে হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার এই আইন প্রণয়নে বড্ড তাড়াহুড়ো করছে। এ বিষয়ে দেশের সেরা মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তেমন শলাপরামর্শ করাই হয়নি। আমার সুপারিশ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর— এমন সমস্ত উন্নত দেশের জাতীয় মেডিক্যাল কমিশনগুলি যে নীতির ভিত্তিতে তৈরি, সেগুলি ভাল করে পর্যালোচনা করা হোক। দেখা হোক তাদের নীতির মধ্যে কী কী ভাল দিক রয়েছে। আমি আশা করি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি করাই একটা নির্বাচিত সরকারের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত। যদি ‘‌সবার জন্য স্বাস্থ্য’‌ বা ‘‌হেল্‌থ ফর অল’‌— বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই লক্ষ্যে আমাদের এগোতে হয়, তবে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সর্বাগ্রে বাড়ানো উচিত। দেশের জিডিপি–‌‌র নির্দিষ্ট অংশ আগে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হোক। আয়ুষ বা অন্যান্য ক্ষেত্রের বা পদ্ধতির চিকিৎসকদের আমি নির্দিষ্টভাবে জানাতে চাই, তাঁদের সঙ্গে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার কোনও বিরোধ নেই। তাঁরা যদি নিজ নিজ চিকিৎসা–‌পদ্ধতিই 
অনুসরণ করেন, তা হলে সেটাই মানুষের উপকারে লাগবে। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top