KPC: দেশে-বিদেশে দু’ডজন হাসপাতাল, বিশ্ব-বাঙালি কেপিসি নিজেই একটি ব্র্যান্ড

বিভাস ভট্টাচার্য: ঝুলিতে ছিল ডাক্তারির ডিগ্রিটা।

সঙ্গী ছিল সাহস। যেটা নিয়েই তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশে। অনেকদিন আগে। ১৯৬৯ সালে। তারপর? কেটে গেছে অনেকগুলি বছর। গঙ্গা এবং আটলান্টিকে উঠেছে অনেক ঢেউ। সেদিনের সেই তরুণ চিকিৎসক আজ শুধু বিশ্ববরেণ্য চিকিৎসক নন, তিনি সর্ব অর্থে বিশ্ব বাঙালি। রীতিমতো লড়াই করে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন একটার পর একটা প্রতিষ্ঠান। কীর্তির জগতে খোদাই করেছেন তাঁর নাম। তিনি কে? তিনি কালিপ্রদীপ চৌধুরী। যাঁকে তামাম বিশ্ব চেনে 'কেপিসি' নামে। শুধু চেনেই না, কুর্নিশও জানায় সকলে।

অবিভক্ত ভারতের সিলেটে জন্ম কালিপ্রদীপের। জমিদার বংশে। সেখানকার মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে পাস করার পর ভর্তি হন কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। সাফল্যের সঙ্গেই পাশ এবং পাড়ি মালয়েশিয়ায়। বাস্তবকে বোঝার ক্ষমতা এবং চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জোর, এই দুটোই একদিন তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দিয়েছিল সেদেশের তৎকালীন মন্ত্রী টুন আব্দুল সার্ডনের কাছে। মালয়েশিয়ায় সে বছর বন্যা হয়েছিল। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছিল বহু জায়গা। মন্ত্রী এসেছিলেন চিকিৎসকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে। সেখানেই কালিপ্রদীপ ব্যাখ্যা করেন বন্যা পরবর্তী রোগ সম্পর্কে। মন্ত্রী বুঝেছিলেন এত চিকিৎসকের মাঝে এই তরুণ চিকিৎসকই সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন। আলাদা করে তাঁর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলেন মন্ত্রী। এরপর কালীপ্রদীপকে সেখানকার সবচেয়ে বড় হাসপাতালে ‘ইন্টার্নশিপ’-এর ব্যবস্থা করে দেন। সেই সময় ভারতীয়দের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা ছিল। সেই ব্যবস্থাও করেন। 

সেই সময় মালয়েশিয়ায় সারওয়াক দ্বীপে কিছু কমিউনিস্ট মতাবলম্বী নৃশংসভাবে খুন করেছিল এক চিকিৎসককে। বিষয়টি জেনেও কথায় কথায় একদিন কালীপ্রদীপ মন্ত্রীর কাছে সেই দ্বীপে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। টুন আব্দুল সার্ডন প্রথমটায় আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত এই তরুণ চিকিৎসকের জেদের সামনে হার মানেন। সারওয়াক দ্বীপের লুন্ডুতে একটি হাসপাতালের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় তাঁকে। দেওয়া হয় আকর্ষণীয় বেতন। সালটা ছিল ১৯৭১। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সিলেটে কালিপ্রদীপের বাড়িতে বোমা পড়ে। তারপরই গোটা পরিবার চলে আসে ভারতে। 

কালিপ্রদীপের কথায়, ‘সেদিনের ওই বেতনটাই আমাকে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল। এটা আমার জীবনের একটা না বলা ঘটনা।’ এরকমই আরেকটি না বলা ঘটনা হল কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুদ্ধে আহত সৈনিকদের হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে নিয়ে আসা। এই সাহসিকতার জন্য মালয়েশিয়া সরকার তাঁকে দিয়েছিল ‘পেটালিং জায়া’ পুরস্কার। সে দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: রাজ্যে বাড়ছে অযৌক্তিক সিজারের সংখ্যা! প্রসূতি মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্যভবন, তৈরি কমিটি

কর্মব্যস্ত কালিপ্রদীপের জীবনে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে আরও লেখাপড়ার ইচ্ছেটা কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভীষণ চাগাড় দিচ্ছিল। সার্জারি নিয়ে পড়তে তিনি স্কটল্যান্ডে চলে যান। সেখান থেকে কানাডা এবং এরপর ১৯৮২ সালে আমেরিকা।

কানাডা এবং আমেরিকায় অর্থোপেডিক সার্জারি নিয়ে পড়াশোনা। পাস করেন কঠিন পরীক্ষা ‘আমেরিকান বোর্ড অফ অর্থোপেডিক সার্জারি’। ফেলো হন ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ সার্জন’-এর। প্রথমে পেনসিলভেনিয়া এবং সেখান থেকে হেমেটে ‘হেমেট বেলি ডিস্ট্রিক্ট হসপিটাল’-এ কাজ শুরু করেন তিনি।

জীবনের গাড়িটাকে এরপর নিজের পছন্দের রাস্তায় চালাতে শুরু করেন সিলেটের এই বাঙালি। হেমেটে যেই হাসপাতালে কাজ করতেন, ২০১০-এ সেই হাসপাতালটি কিনে নেন তিনি। এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া। আজ আমেরিকার আটটি স্টেটে তাঁর ২১টি ‘অ্যাকিউট কেয়ার ফেসিলিটি’ বা হাসপাতাল আছে। কলকাতায় আছে কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল। সবকটি হাসপাতালই পরিচালিত হয় ‘কেপিসি হেলথকেয়ার’-এর নামে। আমেরিকায় তাঁর সংস্থায় কাজ করেন ৩২,০০০ জন। 

বাংলাদেশের ইতিবৃত্তে ‘দত্ত চৌধুরী’ পরিবারটির একটা আলাদা পরিচয় আছে। তবে পদবী থেকে দত্তটা তুলে দিয়েছেন কালিপ্রদীপ। আর নামে রেখে দিয়েছেন ‘কালি’ এবং 'পি'। 

তাঁর কীর্তিকে সম্মান জানিয়ে আমেরিকায় তাঁর এবং তাঁর পরিবারের লোকেদের নামে আছে পাঁচটি রাস্তা। কেপিসি পার্কওয়ে, চৌধুরী সার্কেল, রেঞ্চোকালি চাদ্রিস, পদ ক্রিসান্ট। তাঁর মায়ের নামে রাস্তাটি হল ‘শোভারাণী লেন’। উচ্চশিক্ষিত তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে কেপিসি হেলথকেয়ারের দেখাশোনা করেন। 

সাহেবদের দেশে বাস। কিন্তু আপাদমস্তক বাঙালি। রান্নায় ঝালের সঙ্গে তাঁর পছন্দের তালিকায় অবশ্যই আছে শুঁটকি মাছ। আমেরিকাবাসী তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন খাঁটি সিলেটি ভাষায়। ভোলেননি বাংলাদেশকে, ভোলেননি ভারতকে। গর্ব করে বলেন, ‘আমি অনেক বাঙালির চেয়েও বেশি বাঙালি’। কীর্তিমান এই মানুষটি ঈশ্বরবিশ্বাসী‌। প্রশ্ন করেছিলাম, যদি ঈশ্বর কখনও জিজ্ঞাসা করেন, আর কী করতে চান তিনি? একটুও না ভেবে তাঁর উত্তর, ‘ঈশ্বরকে বলব, তুমি যদি আমায় আরও দায়িত্ব দাও, তবে আরও অনেককিছু করব।’

আকর্ষণীয় খবর