অনেকেই ‌বলেন, বিদ্যের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে, অথচ চাকরি নেই। সত্যিই কি তাই?‌ আসলে কাজ আছে, কাজের উপযুক্ত কর্মী নেই। কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে কাজের বাজার, তাপস বিশ্বাস–কে জানালেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড.‌ সৈকত মৈত্র।

 

•‌ ডব্লিউবিইউটি থেকে ম্যাকাউট (MAKAUT)।‌ নামের সঙ্গে আর কোথায় পরিবর্তন এসেছে?‌
» আগে রাজ্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছিল সল্টলেকে। এখন ‘‌ম্যাকাউট’‌–‌এর নিজস্ব ক্যাম্পাস হরিণঘাটায়। এ ছাড়াও দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, হুগলির মতো কয়েকটি জায়গায় নোডাল সেন্টার গড়ে উঠেছে। প্রতিটি জায়গায় আর আমাদের প্রতিনিধিদের সশরীরে হাজির হতে হবে না। তৈরি হয়েছে ‘‌ডিজিটাল ইনস্পেকশন’‌ ব্যবস্থা। শিক্ষাকেন্দ্রের সমস্ত ডেটা বেস একটি সুনির্দিষ্ট ক্লাউডে স্টোর থাকবে। এবং তথ্যের আদান–‌প্রদান ‌সহ গোটা ব্যবস্থাপনা হবে ‘‌ক্লাউড–‌বেসড’‌ ইনস্পেকশনের মাধ্যমে।
•‌ এগুলো তো প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোগত পরিবর্তন। শিক্ষা পদ্ধতির কী কী বদল, কোথায়, কীভাবে এনেছেন?‌
» মাত্র দু’‌‌বছর হল প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে এসেছি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে ফরেনসিক সায়েন্স, রোবোটিক্স, ভারচুয়াল রিয়ালিটি, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো নতুন নতুন বিষয়। এবং সমস্ত বিষয়গুলি পড়ানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রিকে সঙ্গে নিয়ে। শিল্পের প্রয়োজন মাফিক ডিজাইন করা হচ্ছে কোর্স কারিকুলাম। যাতে পড়ার শেষে কাজ পেতে অসুবিধে না হয়। যেমন– যদি রিয়েল এস্টেট ম্যানেজমেন্ট পড়ানো হয়, পড়াতে আসছেন আবাসন শিল্পের দিগগজরা।
•‌ এই সব নতুন বিষয় আমদানি হওয়া মানে কি সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল বা মেকানিক্যাল ট্রেডের মতো ‘‌কোর ‌বিষয়’‌ গুলির গুরুত্ব কমে যাওয়া?‌
» যে কোনও উন্নয়নশীল দেশের মতো আমাদের দেশে অর্থনীতি এগ্রিকালচার, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রির ওপর দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে কৃষি হল মূল চালিকাশক্তি। তবে খুব দ্রুত পরিষেবা শিল্পের উত্থান ও বৃদ্ধি হচ্ছে। এখন তাই বলে কি ‘‌এগ্রিকালচার’‌ পড়া ছেলেমেয়েদের কাজের পরিসর কমে যাবে?‌ না। ‌মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেকনলজি, অ্যাগ্রোনমি বা জেনেটিক্স–‌এর মতো বিষয়গুলো উঠে আসবে। একইভাবে মেকানিক্যাল বা সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা আর প্ল্যান্টে কাজ করবেন না। তিনি ঘরে বসেই মেশিন বা বিল্ডিংয়ের প্ল্যান তৈরি করবেন। কোর ‌সাবজেক্টগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তির যে এই মেলবন্ধন, সেটাও একটা বিপ্লব। বলা যায়, টেকনোলজিক্যাল রেভোলিউশন।
•‌ আপনি তো বিপ্লবের কথা বলছেন, এদিকে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বা কলকাতার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে নামী–‌দামি বিষয়ে আসন সংখ্যা পূরণ হচ্ছে না.‌.‌.‌
» সত্যি বলতে কি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যতদিন না শিল্পের প্রয়োজনীয়তা বুঝে বিষয়ের সিলেবাস পরিবর্তন করতে পারবে, ততদিন এই ট্রেন্ড আরও বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শিল্পের চাহিদা মেনে নতুন নতুন কোর্স আমদানি করতে হবে। আগামী দিনে যেমন প্রিন্ট ‌মিডিয়ার অবস্থা বেশ খারাপ হতে যাচ্ছে। কিন্তু শূন্যস্থান কখনও ফাঁকা থাকে না। সেই শূন্যস্থানে কয়েকগুণ বেগে ঢুকে পড়েছে ডিজিটাল মিডিয়া। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ডিজিটাল–‌মিডিয়া কেন্দ্রিক কোর্স স্ট্রাকচার করে, তাহলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। যে পড়া শুধু সার্টিফিকেট দেয়, রুজি–‌রুটির খোঁজ দেয় না, আগামি দিনে কেন, কোনও দিনই সে পড়া কেউ পড়তে আসবে না।
•‌ কিন্তু এ কথাটাও ঠিক যে, এ রাজ্য থেকে ছেলেমেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যানেজমেন্ট কোর্স করে ভিনরাজ্যে চাকরির জন্য ভিড় জমাচ্ছেন। এত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, অথচ চাকরি কোথায়?‌
» ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘‌বাজারে যখন আগুন লাগে, তখন তা ঠাকুর দালানকেও চেনে না।’‌ সেরকমই আজ এখানে কাজের মন্দা বলে লোকে ভিনরাজ্যে ছুটছে। কাল মানে খুব শিগগিরি ওসব জায়গায় একই পরিস্থিতি হবে। আজকের দিনে লেখাপড়া শিখে শুধু নিজের বিষয়টুকুই জানলাম সেটা চলবে না। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে।
•‌ উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ বলতে?‌
» আগামি দিনে ‘‌উদ্ভাবনী ‌শক্তি’‌–‌ই রাজত্ব করবে। এই যেমন জোমাটো বা স্যুইগি, কীরকম ব্যবসা করছে!‌ ঘরের দরজায় আরসালানের বিরিয়ানি থেকে ভীমনাগের সন্দেশ হাজির করছে। আজ থেকে বছর দুই আগেও এমনটা কেউ ভাবত?‌ কিংবা ধরুন ‘‌বাইজু’‌‌র ম্যাথমেটিক্যাল অ্যাপ। একটা লোক সমস্ত কোচিং সেন্টার থেকে তাবড় শিক্ষা–‌প্রতিষ্ঠানের মাথার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মাত্র দু’‌বছরের মধ্যে বাইজু রবীন্দ্রন দেশের সর্ব‌কনিষ্ঠ মিলিয়নেয়ারের খ্যাতি পেয়েছেন। কিছু না, একটা আইডিয়া প্রথাগত ধারণা বদলে দিয়েছে। তার মানে কি এখানেই শেষ, না শেষ নয়। আজকাল পড়ানো হচ্ছে ‘‌ড্রোন টেকনোলজি’‌। হয়তো দেখা যাবে যে লোকটা অর্ডারের খাবার এনে বাড়ির দরজায় টোকা মারছে, তার ভালো সময় দু’‌‌বছরের মধ্যে শেষ। সেই অর্ডারের মাল‌পত্তর ড্রোনই ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। তাই কাজ নেই, কাজ নেই বলে হা–‌পিত্যেশ করে বসে না থেকে, প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজের বিদ্যা কাজে লাগাতে হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top