সিদ্ধার্থ নারায়ণ জোয়ারদার- ভাবুন ভাইরাস নামক ন্যানোমিটার সাইজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি কণিকা নিজেকে বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী ও বুদ্ধিধর ভাবতে থাকা মানুষ নামক জীবটির দাম্ভিকতার বেলুন কীভাবে চুপসে দিয়েছে!
মানুষ এখন করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করার স্বপ্ন ছেড়ে তার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। নভেল করোনা তথা কোভিড–১৯ রোগটি আজ মানুষকে তার পুরনো বহু অভ্যাস বদল করতে শেখাচ্ছে; উপরন্তু নতুন কিছুতে অভ্যস্ত হতেও বাধ্য করছে। মানুষের মতো সামাজিক জীব এখন সমস্ত রকম সামাজিক আচার অনুষ্ঠান জলাঞ্জলি দিয়ে, সাবান–জলে হাত ধুয়ে মুখে ‘‌মাস্ক’‌ পরে ‘‌সামাজিক দূরত্ব’‌ রক্ষা করছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে কর্মক্ষেত্র, সবই এখন ভার্চুয়াল, যন্ত্র নির্ভর। ‘অভ্যাসের দাস’‌ মানুষের কী নির্মম পরিণতি!
এখনও পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী, নভেল করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি বাদুড় থেকে। বাদুড়ের করোনা ভাইরাস জিন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে প্যাঙ্গোলিন নামক প্রাণীতে যায় ও পরবর্তীতে তা মানুষের শরীরে আসে। জিন পরিবর্তিত এই ভাইরাস বর্তমানে অবশ্য মানুষে মানুষে সংক্রমিত হচ্ছে।
এভাবে প্রাণী থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়া রোগকে ‘‌জুনোটিক’‌ রোগ বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, মানুষে যত সংক্রামক রোগ দেখা দিচ্ছে, তার প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগের উৎপত্তিই প্রাণীর দেহে; জুনোটিক। বলাই বাহুল্য, এর বেশির ভাগটাই বন্যপ্রাণী ও পাখির দেহজাত।
আবার উল্টোদিকে, গৃহপালিত প্রাণীকুল মানুষের সাহচর্য্যে থাকার সুবাদে মানুষের পরজীবী ও জীবাণু যে প্রাণিতেও সংক্রমিত হয়, সে উদাহরণও যথেষ্ট আছে। আমাদের চারপাশের প্রাণীদের নিজেদের মধ্যেও জীবাণু, ভাইরাস বা পরজীবীর চলাচল অবারিত। আবার তাদের অনেকের মধ্যেই রয়েছে খাদ্য–খাদক সম্পর্ক।
বিশ্ব প্রকৃতির সমগ্র জীবকুল একে অন্যের সঙ্গে জৈব আত্মীয়তার সূত্রে গ্রথিত। বিশ্ব সংসারের একদিকে যেমন রয়েছে জলজ এককোষী উদ্ভিদ থেকে মূলজ তৃণ, গুল্ম ও বৃক্ষরাজি, অন্যদিকে তেমন জলজ এককোষী প্রাণী থেকে হাতি, জিরাফ বা পাইথনের মতো বৃহদাকার প্রাণীর দল। জৈব বৈচিত্রের এই বিপুল ভাণ্ডারই আমাদের সম্পদ, আমাদের আপন। শুধু তাই বা কেন? এই জৈব বৈচিত্রের বর্ধিত পরিসরে আণুবীক্ষণিক জীবাণু, ভাইরাস ও পরজীবীদের অবস্থিতি।
এই বিশ্ব সংসারে বিভিন্ন জীবগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। তাদের সদস্যদের ভাল থাকা না থাকা নির্ভর করে সমগ্র জীবগোষ্ঠীর ভাল থাকা বা না থাকার ওপর। এক কথায় মানুষের স্বাস্থ্য নির্ভর করছে সামগ্রিক জীবকুলের স্বাস্থ্যের ওপর। আবার জীবকুলের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে প্রাকৃতিক অজৈব উপাদানের আনুপাতিক ভারসাম্যের ওপর। পরিবেশ দূষণ বা বৃহৎ অর্থে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় সমস্ত জীবকুলকে প্রভাবিত করতে বাধ্য। এর জেরে সদস্যদের ঘটে স্বাস্থ্যহানি, এমনকি শুরু হয় অস্তিত্বের সঙ্কট। এরই প্রেক্ষিতে এসেছে ‘‌ওয়ান হেলথ কনসেপ্ট’‌— সমগ্র বিশ্বের একটাই স্বাস্থ্য।
বাদুড় থেকে ‘‌স্পিল ওভার’‌ হওয়া করোনা ভাইরাস মানুষের জীবন–জীবিকাকে যেভাবে সম্প্রতি নাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে আর একবার সামনে চলে এল প্রয়াত জনবিজ্ঞানী তারকমোহন দাসের সেই উক্তি— ‘‌পৃথিবী কি শুধু মানুষের জন্য?’‌ নিজেদের লোভ ও দম্ভে মানুষ আজ ভুলতে বসেছে, ‘‌বন্যেরা বনে সুন্দর’‌। সুন্দর ভাবে বাঁচতে বন্যপ্রাণীদেরও যে খাদ্য ও বাসস্থানের প্রয়োজন হয়, মানুষকে আজ নিজের প্রাজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে হবে। সমগ্র বিশ্বের মানুষকে এই বার্তা দিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের পরিবেশ সংক্রান্ত ইউএনইপি এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসে মূলভাবনা হিসাবে ‘‌জৈব বৈচিত্র সংরক্ষণ’‌কে তুলে ধরেছে। ‘প্রকৃতির জন্য সময়’‌— এই স্লোগানকে সামনে রেখে এবারের মূল অনুষ্ঠানটি হল কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটা–তে। জার্মানি সহযোগী দেশ। এই কলম্বিয়ার জৈব বৈচিত্রের ভাণ্ডার বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট বলে মনে করা হয়। এখানে রয়েছে ৩৫০০ প্রজাতির অর্কিড ও বিশ্বের ১৯ শতাংশ পাখির প্রজাতি। কলম্বিয়া সরকারের জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ সংক্রান্ত উদ্যোগ সারা বিশ্বে সমাদৃত।

(‌অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়)‌

জনপ্রিয়

Back To Top