ডাঃ দুলাল বসু:ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিল বিল চিকিৎসকদের কুক্ষিগত করার এক অশুভ প্রচেষ্টা। দেশের তথাকথিত সর্বশক্তিমান মানুষরা এবারে সমাজের দাবি অগ্রাহ্য করে চিকিৎসকদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এম সি আই)-র ওপরেই সরকারের যত অনীহা। মজার ব্যাপার হল সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকই কিন্তু এই সংস্থার সদস্যদের পছন্দ করে দিত। শুধু দু’‌জন নির্বাচিত হতেন। বলা হচ্ছে, এই সংস্থা নাকি দুর্নীতিপরায়ণ। তা আজকাল তো মন্ত্রীদের মধ্যেও আকছার দুর্নীতি দেখা যায়। তা বলে কি মন্ত্রিসভা তুলে দেওয়া হবে? এত সব কাণ্ড না করে বরং কোনও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া কি ভাল নয়! তা ছাড়া যে নতুন কমিশন গঠিত হতে চলেছে, তাতে যে আরও বেশি দুর্নীতি হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? সামান্য একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করে হোমিওপ্যাথি, ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানিকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে অপচেষ্টা হচ্ছে, তাও খুব বিপজ্জনক। পরীক্ষাতে আজকাল পয়সা দিয়ে ভাল রেজাল্ট করা যায়। এই সব বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোনও আধুনিক ওষুধ তৈরি হয় না। দীর্ঘ গবেষণা করে ওষুধ আবিষ্কারের পরে মানুষের ওপরে প্রয়োগ করে যদি উপকার মেলে একমাত্র সেক্ষেত্রেই সেটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হয়। আর সেটাই আধুনিক ওষুধ। এই ওষুধ একমাত্র অ্যালোপ্যাথিতেই সম্ভব। ১৯৫৪ সালে হাতুড়ে ডাক্তারদের স্বীকৃতি দিতে বিধানচন্দ্র রায় একটি অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, কেউ যদি কোনও চিকিৎসকের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে কাজ করেন, তা হলে তিনি নিজে চিকিৎসা করার জন্য রেজিস্ট্রেশন পেতে পারেন। তখন আমারা ডাক্তারি পড়ছি। আমাদের জনৈক মাস্টারমশাই, যিনি নিজে এম এল এ ছিলেন, রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আজ আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দিত, কারণ আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে ৪০ বছর ধরে থাকার সুবাদে এবার থেকে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করতে পারবে।’ যে হাস্যকর নিয়ম একসময় পশ্চিমবাংলায় চালু হয়েছিল, এবারে সেটা গোটা দেশে হতে চলেছে। এই বিলকে কোনওমতেই পাস হতে দেওয়া উচিত নয়। নতুন বিলে বলা হয়েছে, এম বি বি এস পাস করার পরে লাইসেন্স পেতে নাকি আরও একটি পরীক্ষা দিতে হবে। তা হলে আর এম বি বি এস পরীক্ষা কেন, সরাসরি ওই পরীক্ষায় বসলেই তো হয়। এম বি বি এস পাসের পরে যে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, তাতে লেখা থাকে যে, এই শংসাপত্রধারী মানুষটি ওষুধ দিতে ও শল্যচিকিৎসা করতে পারবে। তা হলে সেই সার্টিফিকেট তো মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। এই বিলে বলা হয়েছে, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি ইচ্ছেমতো স্নাতকোত্তর সিট বাড়াতে পারবে, ৬০% ছাত্র নিজেরা পছন্দ করে নিতে পারবে। তার মানে বেসরকারি স্তরে একটা অসাধু উপার্জনের পরোক্ষ উপায়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। সব মিলে আমার মনে হয়, এই বিলের এত খারাপ দিক আছে যে, এটি কোনওমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top