ডাঃ অভিজিৎ চন্দ (এন্ডোক্রিনোলজিস্ট):  বিশ্ব জুড়ে এখন ডায়াবেটিস মহামারীর আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ বাদ নয় এর প্রকোপ থেকে।  এখন শুধু শহরাঞ্চল বলে নয়, গ্রামাঞ্চলেও হচ্ছে ডায়াবেটিস। অনিয়মিত জীবন–যাপন, খাদ্যাভ্যাসের ফলে ক্রমশ বাড়ছে ডায়াবেটিসের প্রভাব। তার মধ্যে স্ট্রেস এখন ভীষণভাবে প্রভাব ফেলছে ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য। আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। তাই বলে শুধু আজকের দিনটি মাথায় রেখে এই দিবস পালন করা ঠিক নয়। সারা বছর সচেতন হয়ে যাতে চলতে পারি, ডায়াবেটিস যেন আক্রমণ না করতে পারে, সেই সংকল্প নিয়ে চলতে হবে। ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু ডায়াবেটিস থাকলে পাশাপাশি অনেকগুলো রোগ একসঙ্গে গ্রাস করে। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। কিডনি, নার্ভ, চোখের সমস্যাও ধীরে ধীরে চলে আসে। তাই ডায়াবেটিসকে দূরে রাখলে অনেকগুলি রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টাইপ টু ডায়াবেটিসে ভুগছেন অনেকে। কম বয়স থেকে বেশি বয়স, সকলেই এর কবলে পড়ছেন। স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যেও এখন ডায়াবেটিসের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করাই একমাত্র হাতিয়ার। যাঁর ডায়াবেটিস হয়নি, তাঁর যেন না হয়, সেই জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যাঁদের ডায়াবেটিস হয়েছে, তাঁদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন প্রণালীর মাধ্যমে ডায়াবেটিসের আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। আমার ডায়াবেটিস হয়নি, তাই বলে কিছু মেনে চলব না, এমনটা ভুল ধারণা। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত না বাড়ে। নিয়মিত শরীরচর্চা করা প্রয়োজন। তাই বলে এমন নয় জিমে ছুটতে হবে। ছোটখাট কিছু এক্সারসাইজ যা নিয়ম করে বাড়িতে করলে উপকার পাওয়া যাবে। বিশেষ কিছু না করার সময় না পেলে অন্তত দৈনিক ৩০ মিনিট হলেও হাঁটা প্রয়োজন। তেল–ঝাল–মশলাদার খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে। বাইরের জাঙ্ক ফুড, যেমন চিপস, পিৎজা, বার্গার, ভাজাভুজি, এসব খাবার খাওয়া বর্জন করতে হবে। ডায়াবেটিস হলে রুটিন করে সুগার মাপা জরুরি। ব্লাড প্রেশার, কোলেস্টেরল যাতে না বাড়ে সেগুলি লক্ষ্য রাখতে হবে। রান্নায় কম চিনি দেওয়া, কম তেলে রান্না করা খাবারের অভ্যাস করতে হবে। ট্রান্স–স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। 
ডায়াবেটিস হলে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। সুগারের ওষুধ খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে, এই ধারণায় বশবর্তী হয়ে ওষুধ খাব না, এই ধারণা ভুল। সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখার ওষুধ খেতে হবে। সেইসঙ্গে ওজন, প্রেসার, কোলেস্টেরল যাতে না বাড়ে তাও নজরে রাখতে হবে। যদি ইনসুলিন ইনজেকশন প্রয়োজন পড়ে, তা সঠিক নিয়ম মেনে নিতে হবে। এখন অনেক কোম্পানির বহু আধুনিক প্রযুক্তির বেদনাহীন ইনসুলিন ইনজেকশন বেরিয়ে গেছে। যা রোগীদের দেখিয়ে দিলে তাঁরা নিজেরাই বাড়িতে নিয়মিত নিতে পারবেন। তবে বহু রোগীর মধ্যে দেখা যায় ইনসুলিন নেওয়া মানেই ‘‌অন্তিম পর্যায়’ এমন ধারণা করে হতাশায় ভোগেন। আমি বলব এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই। ইনসুলিন নিয়ে, আর একটু খাওয়া–দাওয়া মেনে চললে, সুস্থভাবে থাকা যায়। ডায়াবেটিস মানেই আমার জীবনের সবকিছু শেষ, এমন ভেবে দুশ্চিন্তা করবেন না। 
বছর ৩৫ হলেই নিয়ম করে সুগার পরীক্ষা করাবেন। তবে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ট্রেস নেবেন না। প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না হলেও পরোক্ষভাবে এটি ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুক্ত। তাই কর্মক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে শরীরকে বিশ্রাম দেবেন। জাঙ্ক ফুড না খেয়ে প্রোটিন জাতীয় খাবার খাবেন। ওটস, ডালিয়া, ফল, সবজি, মাছ, গম জাতীয় প্রভৃতি খাবার খাবেন। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে অবহেলা করে ঝুঁকি নেবেন না। কারণ ভুলে যাবেন না, এটি হল ‘‌নিঃশব্দ ঘাতক’। হঠাৎ করেই রক্তে সুগারের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেল অথচ আপনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে বংশগত কারণও অনেকাংশে দায়ী। পরিবারে কারও ডায়াবেটিস থাকলে তাঁরা একটু সাবধান হবেন।                                                  

 ডাঃ অভিজিৎ চন্দ                               
 

 সহায়তা—সাগরিকা দত্তচৌধুরি  ‌     ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top