ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক: যেমন কেউ কেউ কবি, তেমনই সব জ্বরই ডেঙ্গি না। অজানা জ্বর বা বলা ভাল, প্রকৃত কারণ না–‌নির্ণয়–‌করতে–‌পারা জ্বরেও বেশ কয়েকজন রোগী মারা গেছেন গত এক মাসে। এটা বেশি ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনার দিকে। সুতরাং ডেঙ্গি মহামারীর আকার নিতে চলছে বা মড়ক আসছে, এমন প্রচার চালানোর চেষ্টা যাঁরা করছেন, তাঁরা ঘোলা জলেই মাছ ধরছেন। এপিডেমিকের নিজস্ব সংজ্ঞা আছে। যেমন মেনিঙ্গো–‌কক্কাল সংক্রমণে বলা হয় কোনও জনবসতিতে যদি ২ সপ্তাহের মধ্যে ১ লাখ লোকের মধ্যে ১৫ জনের বেশি আক্রান্ত হন, তখনই মহামারীর কথা ভাবতে হবে। অথচ এখন অনেকেই সারাদিন বন্ধ রাখছেন বাড়ির দরজা–জানলা। অযথা প্যানিক তৈরির কোনও যুক্তি নেই। বললেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মসকিউটো গবেষণাগারের কর্ণধার, মেডিক্যাল এনটেমোলজিস্ট ড. গৌতম চন্দ্র। তাঁর কথায়, ‘কোন বছর কোন অসুখ বাড়বে বা কমবে সেটা কারওরই আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। ডিজিজ দু’রকমের। এনডেমিক— সারা বছরই হয় নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে, যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি ইত্যাদি এবং এপিডেমিক— যখন হঠাৎ করে কোনও অসুখে অনেক রোগী মারা যান, তখন তাকে এপিডেমিক বা মহামারী বলে। ডেঙ্গি এ রাজ্যে এখনও সে জায়গায় পৌঁছয়নি।’ 
গত মাসের শেষের দিকে (‌ ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত)‌ রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গিতে মৃতের সংখ্যা ৩৫ এবং আক্রান্ত ১৮,২৩৮।  
অনেকেরই ধারণা, ডেঙ্গির মশা নাকি শুধুমাত্র দিনের বেলাতেই কামড়ায়। অধ্যাপক চন্দ্র মানতে রাজি নন। বললেন, ‘মানুষকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে, প্রতি মাসে ২ বার করে টানা ১ বছর ২৪ ঘণ্টা ওই মানুষটির গা থেকে মশা সংগ্রহ করা হয়েছে। কলকাতা এবং গ্রামে দু’জায়গাতেই এই পরীক্ষা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন স্কুল অফ ট্রপিক্যালের তৎকালীন ডিরেক্টর ডাঃ অমিয়কুমার হাটি। দুই প্রজাতির মশা থেকে মূলত ডেঙ্গি হয়— ইডিস ইজিপ্টাই এবং ইডিস অ্যালবোপিক্টাস‌। প্রধানবাহক ইডিস ইজিপ্টাই শহরের মশা। আর তুলনায় দুর্বল অ্যালবোপিক্টাস গ্রামের মশা। এক সময় ডেঙ্গি ছিল শহরের রোগ। ৮৪% ইডিস ইজিপ্টাই কামড়ায় দিনের আলোয়। ১৬% কামড়ায় রাতে। রাতে মানে একদম অন্ধকারে— সন্ধে ৬টা থেকে রাত ১০টা এবং ভোর ৪টে থেকে সকাল ৬টা। সকাল ৬টার পর এদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় কামড়ানোর সময় সকাল ৭টা থেকে ১০টা। আবার বিকেল ৩টে থেকে সন্ধে ৬টা। ইডিস অ্যালবোপিক্টাস ১০% রাতে কামড়ায়। রাতে যদি দিনের মতো আলো জ্বলে, তা হলে ইডিস ইজিপ্টাইয়ের আচরণ কিন্তু দিনের মতোই হবে।’
এদিকে পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজির (‌এনআইভি)‌ গবেষকেরা বলছেন, ভারতে ঢুকেছে নতুন ডেঙ্গি ভাইরাস। তাঁদের মতে, এটি পুরনো এশীয় ডেঙ্গি ভাইরাসের একটি চরিত্রগত মিউটেশন। ২০০৫ সালে সিঙ্গাপুর এবং ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কায় মহামারীর আকার নিয়েছিল ডেঙ্গি ভাইরাস ডেন্‌–‌১। ২০১২–১৩ সালে তামিলনাড়ু ও কেরলেও ছড়িয়েছিল এই ভাইরাস। 
স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মেডিক্যাল এনটেমোলজির প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডাঃ হিরণ্ময় মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘বর্ষার পর থেকে শীত আসার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই সময়টা মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ। আবহাওয়া এখন যেমন, ঠান্ডা পড়েনি ফলে ডেঙ্গির মশা এখনও সক্রিয় রয়েছে। আবহাওয়ায় এই খামখেয়ালিপনাই ডেঙ্গির অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ইডিস মশা খুবই কষ্টসহিষ্ণু। নিজেদের আড়াল করে অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে এরা। আর এই প্রজাতির মশা খুব দ্রুত একটি মশা থেকে আরেকটি মশার মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।’ 
অধ্যাপক গৌতম চন্দ্রের কথায়, ‘বলা হচ্ছে ভাইরাস এবং ইডিস মশা দুই–ই নাকি তাদের চরিত্র পরিবর্তন করেছে। ৩০ বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণায় যুক্ত আছি। পৃথিবীতে ভাইরাস এসেছে ৪০০ কোটি বছর আগে। সে টিকে থাকার জন্য তার চরিত্র পরিবর্তন করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিছু দিন আগে বৃষ্টি হল এবং শীত পড়তে দেরি হচ্ছে, বৃষ্টির পরিষ্কার জমা জলে মশার দ্রুত বংশবিস্তার হচ্ছে। সে–কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রকোপটা একটু বেশি।’
ডেঙ্গি থেকে বাঁচার উপায় প্রসঙ্গে ডাঃ মুখোপাধ্যায় জোর দেন ট্রানসেক্ট ওয়াকের ওপর। তাঁর মতে, ‘মশার আঁতুড়ঘর ভাঙা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এ কাজে। যেখানেই জমা জল দেখবেন, সঙ্গে সঙ্গে তা উল্টে দিন। তবে সবচেয়ে বড় কাজ মানুষকে আরও সচেতন করা। আর ডেঙ্গিতে পেঁপে পাতার রস খাওয়ার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এতে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। অন্তঃসত্ত্বা, শিশু এবং বয়স্কদের প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ডেঙ্গি আক্রান্ত হলে প্রচুর পরিমাণে জল ও তরলজাতীয় জিনিস (‌ওআরএস)‌ খাওয়া উচিত।’ 
মশা মারতে এখন সর্বত্র ব্লিচিং পাউডার ও পাইরেথ্রিনস ফগিং বা গাড়িতে ধোঁয়া ছড়ানো হচ্ছে। ড. চন্দ্র বললেন, ‘ব্লিচিং পাউডারে মশা মরে না। নোংরা জলে যদি কিউলেক্স কুইনকুফাসিয়েটাস প্রজাতির মশার লার্ভা থাকে, খুব বেশি পরিমাণে ব্লিচিং পাউডার দিলে কিছু কিছু লার্ভা মরে। তবে যে পরিমাণে দেওয়া দরকার, সেই পরিমাণে দেওয়া সম্ভব নয়। এই প্রজাতির মশা থেকে গোদ হয় এবং শহরাঞ্চলে দিনেরাতে যে মশা কামড়ায় তার ৯০%–ই এই প্রজাতির মশা। কারণ শহরাঞ্চলে প্রচুর ড্রেন এবং সেখানে সব সময়ই জল জমে থাকে। আর পাইরেথ্রিনস ফগিং রাস্তায় এবং মাঠেঘাটে কখনওই করা উচিত নয়। বাড়ির কোনও বদ্ধ জায়গা, যেখানে মশা বিশ্রাম নিতে পারে সেখানেই ফগিং চলতে পারে। ঝোপেঝাড়ে যেখানে মশা বিশ্রাম নেয় (‌জন্মায় না)‌, সেখানে যদি ফগিং করতে হয়, তাহলে ঝোপঝাড় নাড়িয়ে দেখতে হবে সেখান থেকে মশা উড়ছে কি না, কারণ ঝোপঝাড়ে অনেক প্রয়োজনীয় পোকামাকড় থাকে, যারা আমাদের উপকার করে। মশা যদি ওড়ে তবেই ফগিং করুন। রাস্তাঘাটে ফগিং করলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাইরের মশা ঘরে ঢুকবে। ভাইরোলজির ওপর অনেক গবেষণা হচ্ছে। তবু এখনও ভাইরাসের কোনও ওষুধ বেরোয়নি। একমাত্র মশা নিয়ন্ত্রণই পারে মশাবাহিত অসুখকে প্রতিহত করতে। মশা এসেছে ২৫ কোটি বছর আগে। মানুষ এসেছে ২ লক্ষ বছর আগে। ডেঙ্গি থেকে বাঁচাতে প্রথম কাজ তাই মশা দমন। ভাইরাল সংক্রমণ হলে ম্যানেজমেন্ট ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না চিকিৎসকদের। একমাত্র হেমাটোলজিক্যাল ফিভার হলে প্লেটলেট কমলে প্লেটলেট দেওয়া হয়।’ এ ছাড়া তাঁর পরামর্শ, ‘‌৯৮%‌ সরষের তেল এবং ২%‌ নিম তেল অথবা ৯৬%‌ নারকেল তেল এবং ৪%‌ নিম তেলের মিশ্রণ গায়ে মাখলে মশার কামড় থেকে ৯০ ভাগ নিরাপত্তা পাওয়া যায়।’‌
এ বছর ইডিস ইজিপ্টাইয়ের সঙ্গে ইডিস অ্যালবোপিক্টাসও সমান ভূমিকা নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। দুর্বল থেকে হয়তো শক্তিশালী হয়ে ওঠছে অ্যালবোপিক্টাস। প্রত্যেক শহরেই এখন এই দুই প্রজাতিরই মশা পাওয়া যাচ্ছে। ইজিপ্টাই শহর ছেড়ে এখন মফস্‌সলে গিয়েও হাজির হয়েছে। শহরের ভেতর গ্রাম্য পরিবেশে অ্যালবোপিক্টাস বেশি থাকে। ফলে দুই প্রজাতির দাপটে বাড়ছে ডেঙ্গি— এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

তথ্য–সহায়তা:‌ প্রীতিময় রায়বর্মন

■ সরষে বা নারকেল তেলের সঙ্গে নিম তেল গায়ে মাখুন, 
মশা কামড়াবে না
■ গ্রামের মশা যাচ্ছে শহরে, শহরের গ্রামে!‌
■ নিয়ম মেনে প্রয়োজন পাইরেথ্রিনস ফগিং 
■ ডেঙ্গিতে পেঁপে পাতার রস খাওয়ার কোনও বৈজ্ঞানিক 
ভিত্তি নেই

 

জনপ্রিয়

Back To Top