সপ্তাহের সাক্ষাৎকার: অমিতাভ নন্দী

 (ক্যালকাটা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্যারাসাইটোলজি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান তথা যশস্বী চিকিৎসক। প্রশ্ন করেছিলেন সাগরিকা দত্তচৌধুরি)

 ডেঙ্গি কী? ডেঙ্গির মশা কখন কামড়ায়? কীভাবে বংশবিস্তার করে?
অমিতাভ নন্দী: ‌‌ডেঙ্গি ভাইরাসজনিত অসুখ। স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার মাধ্যমে একজন রোগী থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে ছড়ায় বলে মশাবাহিত রোগ বলা হয়। এই মশা কামড়ায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যে। রাতে কামড়ায় বলে আমার জানা নেই। এরা পরিষ্কার জমা জলে ডিম পাড়ে। বিশেষত ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ফেলে রাখা ছোট প্লাস্টিকের কাপ, ফুলের টব, গাড়ি সারাইয়ের দোকানের টায়ার প্রভৃতি জায়গায় জমা জলে এবং এয়ারকুলারের নীচের ট্রে–তে জমা জলে ডিম পাড়তে পছন্দ করে। ডিম ফুটে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সাধারণত ৭–১০ দিন সময় লাগে। 
 ডেঙ্গির লক্ষণগুলো কী? কী করে বুঝব ডেঙ্গি হয়েছে? 
ডাঃ নন্দী: মূল লক্ষণ জ্বর।‌ সঙ্গে গায়ে, হাতে, চোখে, মাথায়, মাংশপেশীতে ব্যথা,  জিভ–গলা শুকিয়ে যাওয়া, পরবর্তীকালে গায়ে র‌্যা‌‌শ, গা চুলকানো, গা গোলানো এবং বমি।  
 কীভাবে ডেঙ্গি ভাইরাস ছড়ায়? ‌‌
ডাঃ নন্দী: ‌‌স্ত্রী মশা কামড়ায় তাদের প্রজননের কারণে। পুরুষ মশা কামড়ায় না। এডিস মশা ডেঙ্গি–আক্রান্ত কোনও রোগীর শরীরে হুল ফুটনোর পর শুষে–নেওয়া রক্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাইরাস মশার শরীরে প্রবেশ করে।  ৫–৭ দিন পরে সেগুলো সেই মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যায়। সেই মশা কোনও সুস্থ ‌মানুষকে কামড়ালে মশার লালাগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত লালার সঙ্গে ও হুলের মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে ভাইরাস ঢোকে। সেটা প্রথমে মানুষের লসিকাগ্রন্থিতে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকল করার চেষ্টা করে। তখনই জ্বর শুরু হয়। 
  রোগীকে কখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত? 
ডাঃ নন্দী: অতিমাত্রায় জ্বর বা বমি, দুর্বলতা, ‌ডিহাইড্রেশন‌, ভুল বকা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, চোখ–মাড়ি–নাক বা অন্য কোনও জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ, চামড়ায় র‌্যাশ— এর একটিও কোনও ডেঙ্গি রোগীর মধ্যে দেখা গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। 
 ‌ ডেঙ্গি ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করা মাত্রই কি মারাত্মক আকার ধারণ করে? ‌‌‌ডেঙ্গিতে ‌‌কী কী জটিলতা সৃষ্টি হয়? 
 ডাঃ নন্দী: প্রবেশ করা মাত্রই নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্বর, গা ম্যাজম্যাজ করা, সর্দি–কাশি হলে ভাইরাল ফিভারের মতো হয়ে নিজে থেকেই সেরে যায়। প্রথমবার ডেঙ্গি হলে ৫–৭ দিন জ্বরের সঙ্গে প্রাথমিক লক্ষণগুলো থাকে। তখন শরীরে আইজিএম নামে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা ওই ভাইরাসকে মারতে সক্ষম। সাতদিন পর ভাইরাসের সংখ্যা কমলে জ্বর কমে রক্তে থাকা এনএস ওয়ান অ্যান্টিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। তবে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন জটিলতা শুরু হয়। সেগুলো নজরে পড়ামাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।  র‌্যাশ, প্লেটলেট কমে–যাওয়া, গা–হাত–পায়ে ব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ, বিশেষত ঋতুচক্র থাকাকালীন অতিমাত্রায় রক্তক্ষরণ, রোগীর পেটে ও ফুসফুসের চারদিকে জল জমা, ধীরে ধীরে লিভার, কিডনি ফেলিওর, নিউমোনিয়া, নার্ভের ক্ষতি, সাময়িকভাবে প্যারালিসিসও হয়ে যায়। এরপর হয় ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভার। তারপর ডেঙ্গি শক সিনড্রোম হয়ে রক্তচাপ কমে গিয়ে খুব দ্রুত রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়। 
 ‌ডেঙ্গি চেনা যায় কী করে? ‌‌
ডাঃ নন্দী: একমাত্র রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে। জ্বর হলে এনএসওয়ান টেস্ট। জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর আইজিজি বা আইজিএম টেস্ট। প্লেটলেট কাউন্ট ডেঙ্গি সনাক্তকরণের কোনও পরীক্ষাই নয়! 
 তাহলে কি ডেঙ্গি নিয়ে জনমনে ভ্রান্ত ধারণা চালু আছে?
ডাঃ নন্দী: অবশ্যই! বহু মানু্ষ কিছু কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে এমনকিছু কাজ করে চলেছেন, যা রোগীর ক্ষেত্রে সাংঘাতিক ক্ষতিকারক বলে প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন, পেঁপেপাতার রস বা তার ট্যাবলেট খাওয়ানো, পেয়ারাপাতার রস খাওয়ানো, প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়ানো, পুষ্টিকারক খাবারের বদলে শুধু ফল এবং ফলের রস বিশেষ করে টকজাতীয় ফলের রস খাওয়ানো, পাতি লেবু কেটে হিং ও লঙ্কা গুঁজে মশা তাড়ানোর চেষ্টা প্রভৃতি। 
 জল খাওয়া নিয়েও কি কোনও ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে‌? 
ডাঃ নন্দী: রয়েছে! রোগীকে প্রয়োজনের অধিক জল খাওয়ানোয় রোগীর শরীর ফুলে যায় এবং শারীরিক নানাবিধ প্রক্রিয়া জটিল করে তোলে। মানুষের অদ্ভুত এক ধারণা রয়েছে যে, জল খাইয়ে প্লেটলেট বাড়ানো যায়। আমাদের শাস্ত্রে প্লেটলেট বাড়ানোর জন্য কোনও ওষুধ বা ব্যবস্থা নেই। প্লেটলেট নিজেই নিজের মতো করে বাড়ে। ডেঙ্গি ভাইরাস এবং অ্যান্টিবডি যৌগের প্রভাব জ্বর ছেড়ে যাওয়ার ৫–৭ দিন পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে।    
 ডেঙ্গি ভাইরাসের চরিত্রগত কোনও পরিবর্তন হয়েছে? ‌‌
ডাঃ নন্দী: এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গি ১, ২, ৩ এবং ৪— এই চার ধরনের সেরোলজিক্যাল টাইপ আমরা জানি। এ বছর যে ডেঙ্গির যে ভাইরাস রয়েছে, আগামী বছর তার প্রকোপ থাকবে এমন কোনও কথা নেই।  ডেঙ্গি ভাইরাসের চরিত্রগত পরিবর্তন হয়। রোগীদের লক্ষণ দেখে দেখে মনে হচ্ছে, এ বছর এই ভাইরাসের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ডেঙ্গি রোগীর মধ্যে চিকুনগুনিয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। কিছু মানুষ ডেঙ্গির স্বাভাবিক লক্ষণ নিয়ে এলেও ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে নতুন দুটি লক্ষণ দেখছি—পেটের রোগ এবং গাঁটে গাঁটে ব্যথা। এগুলি সম্ভবত নতুন সংযোজন। 
 ডেঙ্গির আক্রমণ থেকে বাঁচার কী উপায়? ‌‌‌
ডাঃ নন্দী: মশা জন্মানো পুরোপুরি আটকানো যাবে না। ডেঙ্গি রোগী সমাজে থাকলে মশা কামড়াবে এবং রোগ ছড়াবে। প্রতিটি মানুষের ডেঙ্গি থেকে নিজেকে বাঁচানোর অধিকার যেমন আছে, তেমনই ঘরের রোগী থেকে অন্য কারও শরীরে সংক্রমণ আটকানোর দায়বদ্ধতাও রয়েছে। 
 সেটা কীভাবে সম্ভব ?
ডাঃ নন্দী: যে কোনও জ্বরের প্রথম দিন থেকেই এনএস ওয়ান, ম্যালেরিয়া এবং সাধারণ ইনফেকশন ‌জানতে রক্ত পরীক্ষা করা। ডেঙ্গিপ্রবণ এলাকায় এনএস ওয়ান পজিটিভ বা নেগেটিভ যাই হোক না, রোগীকে  দিনের বেলায় মশারির মধ্যে রাখুন।  
 ডেঙ্গি হলে রোগী কী কী খাবার খাবে? ফল খাবে?  ‌
ডাঃ নন্দী: হাইপ্রোটিন, সহজপাচ্য, তেল–ঝাল–মশলা কম, টকজাতীয় জিনিস একদম নয়! ফল–এ কোনও প্রোটিন বা ফ্যাট নেই।  তেমন মাত্রায় কার্বোহাইড্রেটও নেই। অসুখের সময় এই জাতীয় পুষ্টি আমাদের প্রয়োজন। ডেঙ্গি রোগীর খাওয়ার ইচ্ছে কমে যায়। তাই যেটুকু খেতে পারবে, সেটা অবশ্যই পুষ্টিকর হওয়া উচিত। 
 ডেঙ্গি সারার পর কী করতে হবে? ‌ডেঙ্গি মোকাবিলায় কী করণীয়?
ডাঃ নন্দী: ডেঙ্গি সারার পর ৩ থেকে ৬ মাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। তখন অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ঠান্ডা লাগাবেন না। পেটের রোগ আটকাতে ঘরে তৈরি টাটকা খাবার খান। আইসক্রিম, কোল্ডড্রিঙ্ক, ফাস্টফুড খাবেন না। প্লেটলেটের সংখ্যা নিয়ে অযথা মাতামাতি করে রোগীকে বিভ্রান্ত করবেন না। সেটা চিকিৎসকদের হাতে ছেড়ে দিন। রোগীকে অযথা জল, টকফলের রসও খাওয়াবেন না। 
 

জনপ্রিয়

Back To Top