তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ!‌ নইলে কলকাতা–‌সহ রাজ্যের একটি বিরাট অংশ যখন ডেঙ্গির ভয়ে কাঁপছে, ঠিক তখন, গত বৃহস্পতিবার, মানে দোসরা নভেম্বর ভরসন্ধেবেলা আমাকে দেখে চেতলা হাটের মশারির কারবারিদের গাল এঁটো করা হাসি ফুটে ওঠে। গোড়ায় ঈষৎ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। শ্যামল স্টোর্সের মালিক শ্যামল সাউকে এর আগে একবারই দেখেছিলাম। গত বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে, পুজোর ঠিক আগে। ম্লান মুখে ভারীসারি মানুষটা একঠোঙা মুড়ি খাচ্ছিলেন। সামনে মাটির খুরিতে চা। দোকানের বাইরে মেয়েদের শাড়ির আঁচলের মতো কয়েকটা নেটের মশারি ঝুলছিল। ভেতরে দেওয়াল জুড়ে ম্যাট্রেস, বালিশ, ওয়াড়ের কাপড়ের থান থাক থাক। একটা সেলাই মেশিন নিয়ে কারিগরও ছিলেন হাত গুটিয়ে বসে। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া নিয়ে কথা উঠতেই, মনে আছে, বলেছিলেন, কোথায় বিক্রি?‌ মাসে ১০০ থেকে ১৫০ মশারি বিক্রি হয় কি না সন্দেহ। আমাদের বাজার খেয়ে নিয়েছে বিগ বাজার, বাজার, মল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গ্রামগঞ্জের মশারির দোকান, ওডোমস, গুডনাইট আর কলকাতার ঘরে ঘরে এয়ারকন্ডিশন মেশিন। নেহাৎ বাপ–‌ঠাকুর্দার ব্যবসা, তাই আঁকড়ে বসে আছি। আর সেই মানুষটিই এই বেস্পতিবার আমার জন্য উল্টোদিকের দোকানে হাঁক পেড়ে দশ টাকা দামের এক গ্লাস চায়ের অর্ডার দিয়ে বললেন, আপনিই তো সেই আজকালের রিপোর্টার?‌ গত বছর আমাদের কথা লিখেছিলেন।‌
এবার ভাল করে দেখলাম শ্যামল স্টোর্স, আশপাশের এ কে বেডিং স্টোর, আর এইচ খান, চেতলা বেডিং স্টোর্স— চেতলা রোড, চেতলাহাট রোড ও রাখাল দাস আঢ্যি রোডের গোটা পনেরো দোকান নিয়ন ও হ্যালোজেন ল্যাম্পে গোলাপি, হালকা গোলাপি, হলুদ নাইলন নেটের মশারিতে যেন সব্যসাচী মুখার্জির ফ্যাশন দোকানের মতো ঝলমল করছে। গতবার এই রূপের ছটা তো দেখিনি। বললাম, শহর জুড়ে তো ডেঙ্গির রব উঠেছে, আপনাদের চলছে কেমন?‌ ৫৬ বছর বয়সি শ্যামলবাবু আজ ২২ বছর ঠাকুর্দা তারক সাউ প্রতিষ্ঠিত এই দোকান দেখছেন। তার আগে দেখতেন ছোট ভাই কার্তিক, তিনি এখন ব্যস্ত গাড়ির ব্যবসায়। ১৯৯২ পর্যন্ত দেখে গেছেন শ্যামল–‌কার্তিকের বাবা রামদাস সাউ। রামদাস বেচতেন শুধু মশারি ও গামছা। মুড়ি চিবোনো বন্ধ করে শ্যামলবাবু বললেন, দারুণ। গতবার আপনি বলেছিলেন মাসে গড়ে বড়জোর ১০০ থেকে ১৫০ পিস মশারি বিক্রি করেন, আমি জানতে চাইলাম, এখন মাসে ক’পিস?‌ জবাব পেলাম, ২০০ থেকে ২৫০ পিস। আর এক প্রশ্নের জবাবে বললেন, সব খরচখরচা বাদ দিয়ে আগে যেখানে থাকত মাসে ৭ থেকে সাড়ে ৭ হাজার, এখন থাকছে ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার। আমি একমত নই। শ্যামলবাবু এখন মাসে লাভ করেন ১২ থেকে ১৩ হাজার। শ্যামল স্টোর্সের গায়েই দোকান আর এইচ খান। মালিক রবিউল হক। বয়স ৬৬/‌৬৭। গতবার বলেছিলেন, একমাত্র ছেলে পড়ে ডায়মন্ড হারবার কলেজে। বলেছিলেন, বাবার হাল তো দেখছে, ও আর এ ব্যবসায় আসবে না। সেই মানুষটির কাছেই এদিন জানতে চাইলাম, মশারি কেমন কাটছে?‌ দু’‌দিনের সাদা দাড়ি গুঁড়িগুঁড়ি ফুটে উঠেছে শীর্ণ গালে। সেই গাল উজ্জ্বল হল হাসিতে— থার্টি পার্সেন্ট সেল বেড়েছে। তখন বললাম, তাহলে ছেলে বাপের ব্যবসায় আসছে তো?‌ উজ্জ্বল মুখটি ম্লান হয়ে গেল, নাহ্‌, মাস কয়েক আগে উস্তিতে একটা ওধুধের দোকান দিয়েছে। আমাদের কথার ফাঁকেই দু’‌জোড়া অল্পবয়সি কাপল এসে মশারির দরদাম করলেন। মেয়ে দুটি দোকানের সামনে ঝোলানো নেটে হাত দিয়ে সম্ভবত ঘনত্ব বোঝার চেষ্টা করলেন। কিন্তু দেখলাম, দরে পোষায়নি বলে চলে গেলেন।
জানতে চাইলাম, সেল বেড়েছে বলে মশারির দামও বেড়েছে?‌ রবিউল বললেন, গতবার ৮ নভেম্বরের নোটবন্দী আমাদের যেটুকু বিক্রিবাটা হচ্ছিল, তাও কেড়ে নিয়েছিল। এবার জিএসটি–‌র ফলে দামও কম করে ৩০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট বেড়ে গেছে। তার খেসারত দিচ্ছি আমরা। 
একটু অবাক হয়েই জানতে চাইলাম, কীভাবে?‌ রবিউলের ব্যাখ্যা— মিল মালিক নেটের থান বিক্রি করছেন ব্রোকারকে ৫ পারসেন্ট জিএসটি যোগ দিয়ে। ব্রোকার সেই থান বেচছেন ওই জিএসটি–‌সহ থানের দামের ওপর আরও ৫ পার্সেন্ট জিএসটি যোগ দিয়ে হোলসেলারকে। হোলসেলার বা মহাজন দু’‌বারের দেওয়া জিএসটি–‌র শোধ তুলছেন আমাদের ওপর ৫ পারসেন্ট চাপিয়ে। এবার নিজেই হিসেব করে দেখুন, একটা এক হাজার টাকার থান থেকে বানানো মশারি আমরা কত দামে কিনছি। কিন্তু খদ্দেররা সে কথা শুনবেন না। তাঁদের বক্তব্য, গতবার তো ৩০০ টাকা দাম ছিল, এবার কেন ৩৫০ চাইছেন?‌ কী জবাব দেব বলুন?‌
উল্টোদিকে হাফিজুল খানের এজমালি দোকান এ কে বেডিং স্টোর। দোকানের ফ্রন্ট জুড়ে দাঁড়িয়ে একটা কালো সেডান বডি হন্ডা। ভেতরে বেঞ্চে বসে মাঝবয়সি সম্পন্ন এক মহিলা মশারি বাচছেন। হাফিজুল জাজিমের ওপর মশারির পাহাড় নামিয়ে ভদ্রমহিলার চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছিলেন। আমাকে দেখে হেসে উঠলেন। চিনতে পেরেছেন। উঠে এলেন। জানতে চাইলাম— সেল কেমন বেড়েছে?‌ ফিসফিস উত্তর এল, গতবারের চেয়ে ফিফটি পার্সেন্ট বেশি। তারপর নিজের সেল নাম্বারটা দিয়ে বললেন, ফোন করবেন, সব বলব। তারপর ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে বললেন, সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে এসেছেন। মেয়ে–‌জামাই ও নিজেদের, মানে কর্তা–‌গিন্নির জন্য দু’‌খানা দামি মশারি কিনবেন। বুঝতেই পারছেন।
হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। গতবারের চেতলার মশারির হাটে বইছিল কেওড়াতলার বাতাস। এবার শীতের মুখেই ফাল্গুনের হোলি চলছে মশারির এই হাটে। চলুক। কারও সর্বনাশ তো কারও পৌষ মাস, আপনি–‌আমি বাধা দেওয়ার কে?‌‌‌

কলকাতার একটি হাসপাতালে। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top