ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক- ‘‌ফ্রম চায়না উইথ লাভ’‌। না। বরং ‘.‌.‌.‌‌উইথ ফিয়ার’‌। কলকাতায় রাজপথে, মলে মানুষের মুখ ঢাকা মুখোশে! আতঙ্কিত মানুষ বাঁচার পথ খুঁজছেন।‌ সাম্প্রতিক ভিলেন, ‘‌২০১৯–‌এনসিওভি’‌। ওটা পোশাকি নাম। আসলে নোভেল করোনা ভাইরাস। কিস্যু না, গোত্রান্তর ঘটেছে। সার্স মনে পড়ে?‌ সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম। নভেম্বর ২০০২ যার উৎপত্তি চীনেরই গুয়াংডং শহরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মেনে নিয়েছিল— ‘‌ফার্স্ট প্যানডেমিক ইন টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি’‌। ৭০০ মৃত্যু, বিশ্বের ২৯টি দেশ রীতিমতো কেঁপে গিয়েছিল। ২০০৩–‌এর পর আর কোনও সার্স–‌এর নথিবদ্ধ বা রেকর্ডেড কেস মেলেনি। ভাইরাস চরিত্র বদলে ২০১২–‌তে সৌদি আরবে ফিরে আসে মার্স (‌মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম)‌ হিসেবে। সেটাও করোনা ভাইরাসই ছিল। এবারেরটা নোভেল। কারও শরীরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এবং রোগের বহিঃপ্রকাশে আগে ইনকিউবেশন পিরিয়ড ছিল ৩ মাস। এবার সংস্পর্শে আসার এক মাসের মধ্যে‌‌ই রোগটা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। স্পষ্ট বলা‌ যাক, ঘাতক হয়ে উঠছে। এবারের উৎসমুখ চীনের হুবাই প্রদেশের ইউহান শহর। শুধু দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়া নয়, ছড়াচ্ছে বিশ্বময়। দুপুরে আমার পাঠানো ই–‌মেলের এক লাইন জবাব এল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক দপ্তর থেকে— ‘‌স্টিল নট অ্যা গ্লোবাল সিচুয়েশন অর থ্রেট’‌। আমরা কী করব?‌ হাত–‌পা গুটিয়ে নিশ্চয় বসে থাকব না।
প্রথম প্রয়োজন— আতঙ্কিত না হওয়া। প্রচুর গুজব রটছে, ওদিকে কান দেবেন না। বাঙালি এ–‌সব ব্যাপারে বড্ড কাতর। ডাঃ সুকুমার মুখার্জি থেকে শুরু করে একাধিক বিশেষজ্ঞ জানালেন, এখনই সাবধান হওয়া দরকার। প্রথম কাজ আউটব্রেক বা রোগের বিস্তার রোখা। কীভাবে বুঝবেন?‌ উপসর্গ সাধারণ সর্দি–‌কাশি–‌জ্বরে যা হয়, সেটাই। নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে ইনফ্লুয়েঞ্জার কথা ভাবুন। ঘনঘন হাঁচি‌, নাক দিয়ে জল পড়া, হালকা কাশিতে শুরু। তারপর, দিন দুয়েকের মধ্যে ধুম জ্বর। এখানেও ভাইরাস আক্রমণে তাই হয়। মুশকিল হল, সরাসরি কোনও চিকিৎসা নেই। গোটাটাই সিম্পটোম্যাটিক ট্রিটমেন্ট। উপসর্গ বুঝে ওষুধ। জ্বর, ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল। গার্গেল বা নাক বন্ধ থাকলে স্টিম নেওয়া। অনেকে অ্যান্টি–‌অ্যালার্জিক দেন। তেমন উপকার নেই। আরেক ভয়ঙ্কর দিক— প্রতিষেধক কোনও ভ্যাকসিন এখনও বিশ্বের কোথাও তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যদি প্রবল আক্রমণ করে নোভেল করোনা ভাইরাস, মৃত্যু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিবার্য। রেসপিরেটরি ফেলিওর দিয়ে শুরু হলেও ২–‌৩ দিনের মধ্যেই মাল্টিঅর্গান ফেলিওর হয়। তখন ডাক্তারের ভূমিকা নীরব দর্শকের! বাতাসবাহিত এই ভাইরাস ছড়ায় কীভাবে?‌ অবশ্যই মানুষ থেকে মানুষে। কিন্তু প্রথম সংক্রমণ কোনও জীবজন্তুতে। তার সঙ্গে সংস্পর্শে এসে ভাইরাস ট্রান্সমিশন এবং প্রোপাগেশন। মুরগির খামার, শুয়োরের খোঁয়াড় রোগের আখড়া হয়ে ওঠে।‌ বিশ্বের তাবড় ভাইরোলজিস্টরা জানাচ্ছেন‌ ইউহানে সংক্রমণ শুরু হয়ে থাকতে পারে পাতে পরিবেশিত মুরগির মাংস বা হিমায়িত সাপের মাংস থেকে। সুতরাং প্রাণিজ প্রোটিন যাঁরা নেন, অবশ্যই ভালভাবে মাংস, ডিম রান্না করে নিন। মাস্ক বাঁচায়? সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কারণ মারণ ভাইরাস‌ মুখোশের বেড়া সহজেই টপকায়। এটার একটাই উপকার। সরাসরি কারও হাঁচি বা কাশি থেকে রক্ষা পাওয়া। বাঙালির অন্যদিকে নিষ্কৃতি— মাছ থেকে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। ৫৫টি ইউনেস্কো চিহ্নিত হেরিটেজ সাইটের সবকটিই আপাতত বন্ধ চীনে। ইউহান শহরে ডাক্তারি পড়েন অনেক ভারতীয় ছাত্র, এমনকী বাঙালিও। এয়ারপোর্টের রাস্তা বা গোটা শহর শাট ডাউন হলেও ওটা যেহেতু কাশ্মীর হয়নি, ইন্টারনেট চালু আছে। দুয়েকজন তীব্র খাদ্য সঙ্কটের কথা বাড়িতে জানিয়েছেন কারণ অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ সারাদিন। ভারতে এবং বাংলায় এখনই তেমন সঙ্কট নেই। লেডি ম্যাকবেথের মতো ঘুম আর স্বপ্নের মধ্যে কাল্পনিক হাত ধোওয়া নয়, করোনা থেকে বাঁচার একটাই দাওয়াই। সত্যি সত্যি দিনের মধ্যে অসংখ্যবার হাত ধোওয়া। বিশেষত শিশু ও বৃদ্ধদের। মনে রাখবেন, তাদেরই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবচেয়ে কম।

জনপ্রিয়

Back To Top