ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক- বিষে বিষক্ষয়। ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা দুনিয়াভর তেমনই চান। যে কোনও ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের তুল্যমূল্য লড়াই করতে আসলে প্রয়োজন নিজের শরীরে সেই খলনায়ক ভাইরাসকে হার মানানোর মতো যথেষ্ট সংখ্যায় অ্যান্টিবডি। করোনার বিরুদ্ধে যে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে, তারও মূল উদ্দেশ্য সেটাই। ভ্যাকসিন ফুঁড়ে দিলেই রোগ রোখার জন্য আমাদের দেহে জন্ম নেবে অ্যান্টি–‌করোনা অ্যান্টিবডি। কিন্তু ততদিন কী হবে?‌ হাঁটু মুড়ে রোগটার সামনে বশ্যতা স্বীকার? তাই হয় নাকি? গবেষক এবং বিখ্যাত ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা অন্য পথ বের করেছেন। সেটা এই মৃত্যুমিছিল হয়তো রুখতে সক্ষম হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন অন্তত ৫০%‌ কমানো যাবে মৃত্যুহার।
ব্যাপারটা কী?‌ দুনিয়াভর যত মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, আক্রান্ত অবস্থাতেই তাঁদের দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হবে। এই চিকিৎসার নাম ‘‌কনভালেসেন্ট প্লাজমা’ থেরাপি।‌ কোভিড–‌১৯ সংক্রমণের পরই গবেষণা শুরু হয় উহানের ল্যাবে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। আমেরিকার বাল্টিমোরে জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন, নিউ ইয়র্কের অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অফ মেডিসিন এ ব্যাপারে দুরন্ত গতিতে কাজ করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সাংহাই–‌তে এক চীনা ডাক্তার স্পেশ্যাল ক্লিনিক চালু করে বহু করোনা–‌আক্রান্ত মানুষকে কনভালেসেন্ট প্লাজমা ইঞ্জেকশন দেন। ডাঃ মাইক রায়ানের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আপৎকালীন চিকিৎসা ও স্ট্র‌্যাটেজি হেড। ডাঃ রায়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, হু এ ব্যাপারটায় নজর রেখেছে। এটা রোগের ভয়াবহতা কমাতে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে চীন এবং বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে প্লাজমা–‌নির্ভর ট্রিটমেন্টের যথেষ্ট ডেটা আমাদের কাছে এখনও পৌঁছোয়নি।
আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে প্রতিষেধক তৈরি করে রোগ রোখার পন্থা প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন। ১৯১৮–‌তে স্প্যানিশ ফ্লু–‌র মতো মহামারী রুখতে এই পথ অবলম্বন করা হয়। ১৯৩৪ সালে পেনসিলভেনিয়াতে মিজলস্‌ আউটব্রেক রোখার ক্ষেত্রে এই থেরাপি বেশ কার্যকরী হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইবোলা এবং অ্যাভিয়ান ফ্লু মহামারী রুখতে রোগীর দেহের প্লাজমা ব্যবহার ম্যাজিকের মতো কাজ দেয়। মেয়ো ক্লিনিকের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ গ্রেগ পোল্যান্ড মনে করেন যত বেশি পথ বের করা যায়, মৃত্যুহার তত দ্রুত কমানো যাবে। কীভাবে চিকিৎসা সম্ভব?‌ করোনা রোগীর দেহে প্রচুর সংখ্যায় স্থায়ী অ্যান্টিবডি জন্ম নেয়। রোগীর দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তার তরল অংশ বা প্লাজমা আলাদা করতে হয়। তারপর পরীক্ষাগারে নানাধরনের শোধন এবং পরিমার্জনের পর শরীরের ইমিউন রেসপন্স বাড়ানোর জন্য উৎপন্ন অ্যান্টিবডি ছেঁকে বের করে নেওয়া হয়। সেটাই ঢোকানো হয় সদ্য কোভিড–‌১৯ সংক্রমিত রোগীর দেহে। বিদেশে এখন যাঁরা ফ্রন্টলাইনে থেকে চিকিৎসা করছেন সেই ডাক্তার, আইসিইউ নার্স এবং রোগীর সরাসরি সংস্পর্শে আসা আত্মীয়পরিজন বা স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এই প্লাজমা নিঃসৃত অ্যান্টিবডি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘‌হাইরিস্ক’ যে কেউ, চিকিৎসকের অনুমতিক্রমে এই ‘‌কনভালেসেন্ট প্লাজমা’ থেরাপি নিতে পারেন। জাপানের এক নামী ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা তো এই থেরাপি বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছে। তাদের দাবি, যথেষ্ট প্লাজমা তাদের ভাঁড়ারে মজুত। হু এখনও মানবশরীরে চটজলদি ইমিউনিটি তৈরি করার অ্যান্টিবডি ইঞ্জেকশন পদ্ধতিতে সরকারি সিলমোহর দেয়নি। তবে আমাদের সূত্র জানাচ্ছে, সম্মতি পাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। ভারতে আমরা কী করব?‌ জাপান এবং বাকি বিশ্বের মুখাপেক্ষী থাকব?‌ ভারতীয় বিজ্ঞানীরা বিশ্বে সর্বত্র আদৃত। এদেশে করোনা–‌আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। গবেষণা ও রক্তসংগ্রহের এটাই উপযুক্ত সময়।   ‌

জনপ্রিয়

Back To Top