ভোলানাথ ঘড়ই
আক্রমণে দরকার আধুনিকতম অস্ত্র। তা হাতের কাছে নেই বলে বসে থাকব?‌ আত্মশক্তি বাড়িয়ে শত্রুকে আটকে তো রাখতে পারি!‌ এই মানসিকতা নিয়ে আজকের করোনা–‌‌যুদ্ধে মডেল হয়ে উঠছে পুরুলিয়ার দুই জনজাতি গ্রাম— বনৌষধি ও অনাক্রাম্য। গোটা দুনিয়াকেই ওরা পথ দেখাতে চায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে অনেকই  ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে, আপাতত এই করোনা ভাইরাসকে সঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে আমাদের। প্রতিষেধক খুব শিগগির মিলছে না। তাই যদি হয় তাহলে নিজেকে ‘‌অনাক্রাম্য’‌ প্রতিরোধক করে তুলব না কেন?‌ বিশেষ করে প্রকৃতিই যখন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে প্রতিরোধের উপায়!‌ ইতিমধ্যেই এই কাজ পুরোদমে শুরু করে দিয়েছেন পুরুলিয়ার সিধো–‌‌কানহু–‌‌‌বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়। তারা আপাতত দুটি জনজাতি গ্রামকে চিহ্নিত করেছে। একটি পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের ভান্ডারতুয়ারা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বাড়াঘুটু। অন্যটি জয়পুর ব্লকের রোপা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার একদুয়ার
গ্রাম। প্রথম গ্রামটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘‌অনাক্রাম্য’‌। মানে ‘‌ইমিউনড’‌। আর দ্বিতীয় গ্রামটির নাম রাখা হয়েছে বনৌষধি। প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড.‌ নচিকেতা ব্যানার্জি প্রতিনিয়ত খোঁজ রাখছেন কাজের। আর মাঠে নেমে এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুব্রত রাহা। বাড়াঘুটু গ্রামে কাজ করছিলেন তিনি। ফোনে কথা বললেন।
বাড়াঘুটু গ্রামটিতে ২৫ ঘর জনজাতির বাস। লোকসংখ্যা ৯১। গ্রাম জুড়ে চাষ করছেন অশ্বগন্ধা, তুলসী, হলুদ। ২৫ বাড়িতেই মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সাবান, স্যানিটাইজার। খাদ্য তালিকায় আবশ্যিক করে দেওয়া হয়েছে লেবু ও রসুন। সুব্রতবাবুর সঙ্গে রয়েছে আয়ুষ বিভাগের তিনজন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ অমরনাথ কোলে, ডাঃ অর্ক মুখার্জি ও ডাঃ প্রদ্যোত দাস। রয়েছেন যোগাসন বিশেষজ্ঞ সহদেব প্রামাণিক। একদিকে এই দুই গ্রাম জুড়ে জনজাতি মানুষেরা ফলাচ্ছেন ভেষজ প্রতিরোধক। অন্যদিকে সচেতনতা, পরিষ্কার–‌পরিচ্ছন্নতা ও যোগাসনের মাধ্যমে বাড়িয়ে তুলছেন শরীরের প্রতিরোধ শক্তি।
 করোনা কোনওভাবে এলেও তা যেন মারণ না হয়ে ওঠে। অধ্যাপক সুব্রত রাহা জানালেন, এলাকায় একটি অনাথ শিশুদের আবাসিক বিদ্যালয় রয়েছে। সিধো-‌ কানহু-নিশান আবাসিক বিদ্যালয়। এই স্কুলটিকেও আমরা ‘‌অনাক্রাম্য’‌ করে তুলতে সমস্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। এই আবাসিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্ররাও হাত লাগিয়েছেন করোনা–‌যুদ্ধে। ড.‌ নচিকেতা ব্যানার্জি জানিয়েছেন, ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সহায়তায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনোভেশন হাব। প্রজেক্টের প্রধান অধ্যাপক সুব্রত রাহা। এই মুহূর্তে এই প্রজেক্টের মাধ্যমেই গ্রামগুলিতে কাজ চলছে। অধ্যাপক সুব্রত রাহা জানিয়েছেন, ২০টি জনজাতি অধ্যুষিত গ্রাম তাঁরা চিহ্নিত করেছেন। এগুলি এই প্রজেক্টের ‘‌অ্যাডপটেড ভিলেজ’‌। সারা বছরই এই গ্রামের মানুষের জনস্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। হঠাৎ করোনা পরিস্থিতির মুখে পড়ায় বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে নেমে পড়তে হয়েছে।
এই মুহূর্তে বিভিন্ন গ্রামে ত্রাণ সামগ্রীর পাশাপাশি জনজাতির মানুষদের দিয়েই মুখোশ তৈরি করাচ্ছেন সুব্রতবাবুরা। মানে নিজেদের মুখোশ নিজেরাই তৈরি করছেন। হুড়া ব্লকের তিলাইটাঁর গ্রামে দরিদ্র শবর জনজাতি মানুষের মধ্যেও কাজ চলছে করোনা প্রতিরোধের। বাঘমুন্ডি, ঝালদা–‌‌২ এলাকার আরও ৫টি গ্রামকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওঁদের স্বপ্ন, এই গ্রামগুলিও অচিরেই হয়ে উঠবে ‘‌অনাক্রাম্য’‌। তারপর তা ছড়িয়ে পড়বে,পাশের গ্রামে, পাশের পাশের গ্রামে, দূরে আরও দূরে। 

জনপ্রিয়

Back To Top