ডা. সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য
কনসালট‌্যান্ট বেরিয়াট্রিক ও অ‌্যাডভান্সড ল‌্যাপারোস্কোপিক সার্জন
এমএস (জেনারেল সার্জারি), ডিএনবি (জেনারেল সার্জারি), এফএনবি, এমএনএএমএস, এফএমএএস, এফএআইএস

মেদের চাপে বিকল হার্ট
হার্টের অসুখেই মানুষের সবচেয়ে বেশি মৃত‌্যু হয়। অনেকের ধারণা হার্ট অ‌্যাটাক বা হার্টের অন‌্যান‌্য অসুখ পুরুষের বেশি হয়, মহিলাদের কম হয়। এ ধারণা ভুল। ডেঞ্জার জোনের বাইরে আসলে কেউই নেই। ভারতীয়দের মধ‌্যে হার্টের অসুখের কারণ খুঁজতে গেলে আজকাল সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ওবেসিটি অর্থাৎ স্থূলতা। ভারতীয়রা আজকাল পশ্চিমি দেশের মতো নিজেদের খাদ‌্যাভ‌্যাস গড়ে তুলছে। রাস্তায় তৈরি ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুডের ওপর আসক্তির পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম কম করা ও মানসিক চাপের কারণে ঘুম কম হওয়ার জন‌্য বেশিরভাগ মানুষই অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাচ্ছেন। শরীরের অতিরিক্ত মেদ হার্টের অসুখ ডেকে আনে। কারণ বেশি মোটা হলে ব্লাড প্রেসার, ব্লাড সুগার ও কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। আর এগুলি বাড়লেই তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে হার্টের ওপরে। এই ওবেসিটির কারণেই ইদানীং আমাদের দেশে হার্টের অসুখে আক্রান্তদের সংখ‌্যা এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে। তাই হার্ট সবল রাখতে দ্রুত লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ভীষণ জরুরি। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দু-একজন করে হার্টের অসুখের রোগী আছেন। এটা কিন্তু বিপদসঙ্কেত। সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে সকলের হার্টের যত্ন নেওয়া উচিত। এর জন‌্য‌ প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে ওজন যেন মাত্রাতিরিক্ত না বেড়ে যায়।
ওজন কমাবেন কীভাবে?
রোগীর শারীরিক অবস্থা কতটা জটিল তার ওপর নির্ভর করছে ওবেসিটির ট্রিটমেন্ট। ওষুধ দিয়ে বা লাইফস্টাইল পরির্তন করেও ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ওবেসিটি রোগীদের প্রায় সকলেরই হাইপারটেনশন বা ডায়াবেটিস থাকেই। তাই এগুলির নিয়ন্ত্রণের জন‌্য ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি মেদ কমানোরও ওষুধ দেওয়া হয়। তার সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার অভ‌্যাস পরিবর্তন করে ডায়েট মেনে চলার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। অতিরিক্ত খেতে নিষেধ করা হয়। এই সব কিছু পালন করেও ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে তাতেও সুস্থ না হলে অতিরিক্ত মোটাদের হার্টের অসুখ এড়ানোর উপায় আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে আছে। রোগীরা নিশ্চিন্তে বেরিয়াট্রিক সার্জারি করিয়ে কয়েক মাসের মধ‌্যে ওজন কমাতে পারেন। একদম আগের মতো ফিট হয়ে ঝরঝরে শরীর ফিরে পাওয়া যায়।
বেরিয়াট্রিকে রোগা হয়ে সচল রাখুন জীবন
ওজন সেঞ্চুরি করেছে? না কি নব্বই নট আউট? ওষুধ খেয়ে, জীবনধারা পরিবর্তন করেও কিছুতেই পর্যাপ্ত ওজন কমাতে পারছেন না? চিন্তা করবেন না। এক্ষেত্রে ওজন কমানোর সবচেয়ে ভাল উপায় বেরিয়াট্রিক সার্জারি। কোনওরকম সাইড এফেক্ট, রক্তপাত ছাড়াই এই ল‌্যাপারোস্কোপিক অপারেশন করে মেদ কমে যায় চটপট। ‘ফ‌্যাট টু ফিট’ হতে বেশি সময়ও লাগে না। আর কিছু নিয়ম মেনে চললে এই নতুন ওজন আর অস্বাভাবিকভাবে বাড়েও না। অনেক ওবেসিটি রোগীর শরীরে উপচে পড়া মেদের কারণে আরও নানা রকম অসুখ থাকে। তার জন‌্য তাঁরা শরীরচর্চা করে রোগা হতে পারেন না। আবার অনেকে বয়স বেড়ে যাওয়ায় বেশি কায়িক পরিশ্রম করে ওজন ঝরাতে পারেন না। এঁদের জন‌্য আইডিয়াল বেরিয়াট্রিক সার্জারি। এছাড়া যাঁদের ওবেসিটির কারণে হার্টে প্রভাব পড়তে শুরু করে দিয়েছে, তাঁদের দ্রুত সুস্থ করতে বেরিয়াট্রিক করানোই ভাল। এই সার্জারির পরেই ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। কোলেস্টেরলের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। যার ফলে হার্টের অসুখের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। ওজন কমে যাওয়ায় রোগী আগের চেয়ে বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেত পারেন। যার ফলে হার্টও ভাল থাকে। আর আয়ুও বাড়ে।
অবশ‌্য শুধু হার্ট নয়, মোটা হওয়ার কারণে যে সব মহিলার বন্ধ‌্য‌াত্বের সমস‌্যা দেখা দেয়, তাঁরাও এই সার্জারিতে ওজন কমিয়ে সহজে মা হতে পারেন। আর্থারাইটিস, ফ‌্যাটি লিভারের অসুখ, ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির অসুখ থাকলেও, বেরিয়াট্রিক করিয়ে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব। এমনকী বেরিয়াট্রিক সার্জারি করে ক‌্যান্সারের প্রবণতা পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া যায়। এই সার্জারি করার পর ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশনের ওষুধ থেকে যেমন মুক্তি মেলে, তেমনই রোগী আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। ব‌্যক্তিগত জীবন, কর্মজীবন, সামাজিক জীবনে অনেক বেশি সক্রিয় ও খুশি থাকেন।  
চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ টিম 
প্রচণ্ড মোটা হয়ে যাওয়ার পিছনে অনেকগুলি কারণ থাকে। তাই হার্ট ব্লকেজ, হার্ট অ‌্যাটাক, হার্ট ফেলিওরের মতো অসুখ দেখা দিলে বা প্রবণতা থাকলে আগে ওজন কমাতে হবে। কোনও একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ওবেসিটির সমগ্র চিকিৎসা করেন না। এই ট্রিটমেন্টের জন‌্য ডায়াটিশিয়ান, ফিটনেস ট্রেনার বা যোগ-শিক্ষকের সাহায‌্য যেমন দরকার, তেমনই হরমোনের ভারসাম‌্য ঠিক রাখতে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, মনোবিদ ও বেরিয়াট্রিক সার্জনের।
ওবেসিটির ট্রিটমেন্ট করে হার্টের অসুখ এড়ানো যায়। চলুন, এই বিশ্ব হার্ট দিবসে সবাইমিলে ওবেসিটির বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার করি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top