অদিতি রায়: শিল্প আর অপরাধ যখন মিলেমিশে যায়, তখন একটা মারাত্মক কম্বিনেশন তৈরি হয়। সেই অপরাধকে ধাওয়া করতে লাগে মনস্তত্ত্বের জটিল চোরাপথে ভ্রমণের দক্ষতা। এভাবেই গড়ে উঠেছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের আগামী ছবি ‘‌ভিঞ্চিদা, দ্য আর্ট অফ রিভেঞ্জ, দ্য রিভেঞ্জ অফ আর্ট’‌-‌এর চিত্রনাট্য। চিত্রনাট্য বরাবরের মতোই পরিচালক নিজেই সাজিয়েছেন, তবে এই প্রতিশোধের গল্পবীজের ধারক অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ, ছবির নামভূমিকা অর্থাৎ ‘‌ভিঞ্চিদা’‌র চরিত্রে রয়েছেন যিনি। রুদ্রনীলের সঙ্গে ছবির অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় ঋত্বিক চক্রবর্তী। ছবির পোস্টার ও টিজার মুক্তি পেতেই বহুস্তরীয় রহস্যের আভাস মিলেছিল, ট্রেলারেই প্রমাণ হয়ে গেল ‘২২ শে শ্রাবণ‌’‌ এবং ‘চতুষ্কোণ‌’‌-‌এর পর আবার থ্রিলারে নিজস্ব সিগনেচার নিয়ে হাজির সৃজিত।
‘‌ভিঞ্চিদা’‌র গল্পটা কী?‌ কীভাবে মাথায় এল?‌ উত্তর দিলেন গল্পকার স্বয়ং। রুদ্রনীল জানাচ্ছেন, ‘‌বছর দুই আগে একটা ছবিতে বোমা বিস্ফোরণে আমার দেহটা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক দৃশ্য ছিল। প্রস্থেটিক মেকআপের দায়িত্বে ছিল আমার অনেকদিনের বন্ধু মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে নাওয়া খাওয়া ভুলে আমরা ওই বিস্ফোরণে ঝলসে যাওয়া রক্তাক্ত দেহের মেকআপ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের সেন্সর বোর্ডের তো কিছু নিয়মকানুন রয়েছে, কাজেই ওই সাংঘাতিক রিয়েলিস্টিক মেকআপ নিয়ে আমার দৃশ্যটা নেওয়া হল লং শটে। যাতে দুর্বলচিত্ত দর্শকদের শক না লাগে!‌ কিন্তু শক লাগল তো অন্য জায়গায়। অনেক দূর থেকে শট নেওয়া হয়ে যাওয়ার পর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে সোমনাথ আমার মেকআপ তুলতে তুলতে মৃদু স্বরে বলল, যখন দেখাবেই না, তখন কষ্ট করে কাজটা করতে বলল কেন?‌ আমি দেখেছিলাম মেকআপ শিল্পী সোমনাথের চোখে চিকচিকে জলবিন্দু। আমি নিজে একজন শিল্পী, তাই সোমনাথের শিল্পকর্ম দর্শকের কাছে না পৌঁছনোর যন্ত্রণাটা টের পেয়েছিলাম। সেদিন আমি ছিলাম ক্যানভাস, সোমনাথ ছিল পেইন্টার। কিন্তু শিল্পটা বিফলেই গেল সেদিন। তখনই আমার মনে হয়েছিল সোমনাথের এই অভিমানটা যদি কোনও অপরাধী ব্যবহার করে!‌ যদি শিল্প আর অপরাধ মিলেমিশে এক হয়ে যায়?‌ তাহলে কী অনর্থ ঘটতে পারে, সেটা অকল্পনীয়’‌।
তারপর ‘শিল্পী‌’‌ নামের এই গল্প সৃজিতের কাছে পৌঁছল কীভাবে?‌ বেশ কিছু বন্ধু পরিচালককে রুদ্রনীল গল্পটা শুনিয়েছিলেন। অনেকেই আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু রুদ্রনীলের কথায়, ‘‌শিল্প আর অপরাধকে একসঙ্গে সৃজিতের মতো হ্যান্ডেল করতে পারবেনা কেউ, এই বিশ্বাস আমার ছিল’‌। ‘উমা‌’‌র ডাবিংয়ের সময় সৃজিতকে গল্পটা শোনান, সৃজিতের পছন্দ হয়, তারপর গল্পটাকে একটা কাঠামো দিয়ে চিত্রনাট্যে ফেলেন সৃজিত।
ছবির ট্রেলারেই স্পষ্ট একজন সিরিয়াল কিলারের চরিত্রে রয়েছেন ঋত্বিক, যিনি পেশায় উকিল। সেই উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটছে মেকআপ শিল্পী ভিঞ্চিদা’‌র (‌রুদ্রনীল ঘোষ)‌। তিনি আবার শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ভক্ত। তাই সকলে তাঁকে ঠাট্টা করে ভিঞ্চিদা বলে। এক বদমেজাজী পুলিস অফিসারের ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং রুদ্রনীলের প্রেমিকার চরিত্রে রয়েছেন সোহিনী সরকার। রয়েছেন ঋদ্ধি সেন এবং আরিয়ানও। 
‘এই ছবিতে অভিনেতা নির্বাচনের সময় আমি গুরুত্ব দিয়েছি অভিনয় ক্ষমতার ওপর, আমার শিল্পী তালিকা দেখলেই সেটা টের পাবেন‌’‌— বলছেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ছবির ট্রেলরেই যে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঋত্বিকের চরিত্রটাই পরপর খুন করে যাচ্ছে, তবে কি ছবিটা ‘হু ডান ইট‌’‌ ফর্মে নয়?‌ ‘‌না, হাউ ডান ইট, হোয়াই ডান ইট। কে খুন করছে সেটা বিষয় নয়, কীভাবে করছে এবং কেন করছে, থ্রিলটা সেখানেই। এই ছবি প্রতিশোধের।’‌ স্পষ্ট জানালেন পরিচালক। 
অনুপম রায়ের সুরে সমৃদ্ধ ‘ভিঞ্চিদা‌’‌। এবং এই ছবিতে যেহেতু মেকআপই শিরদাঁড়া, তাই অবধারিত ভাবে মেকআপের দায়িত্বে রয়েছেন সোমনাথ কুণ্ডু, যিনি ‘এক যে ছিল রাজা‌’‌-‌তে যিশু সেনগুপ্তর মেকআপ করে এখন সর্বভারতীয় এক নাম। ছবি মুক্তি পাবে এপ্রিলেই। ছবির ট্রেলরের শেষ দিকে ঋদ্ধি সেনকে দেখা যায় বেশ ‘টারান্টিনো‌’‌ কায়দায় নির্মম ভাবে কাউকে ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে মারছেন, রক্ত ছিটে যাচ্ছে জামায় মুখে, তাঁর মুখের অভিব্যক্তি অবিচল, তারপর থানায় ফোন করে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলছেন, ‘‌আসলে একটা খুন হয়ে গেছে, জানেন’‌! হাড় হিম করা এই দৃশ্য সপাটে জানিয়ে দিচ্ছে সৃজিত মুখুজ্জে ফিরছেন তাঁর চিরাচরিত স্টাইলে।‌

‘‌ভিঞ্চিদা’‌র ট্রেলর লঞ্চে সোহিনী, ঋদ্ধি, অনির্বাণ, রুদ্রনীল, আরিয়ান ও সৃজিত। ছবি :‌ সুপ্রিয় নাগ 

জনপ্রিয়

Back To Top