বেশ কিছুদিন ধরে তাঁকে বলা হচ্ছে আয়ু্ষ্মান খুরানার নারী সংস্করণ। সিনেমা এবং চরিত্র নির্বাচন নিয়ে তিনি নাকি আয়ুষ্মানের পথেই হাঁটছেন!‌ ‘‌থাপ্পড়’‌ রিলিজের পরও একই ভাবনা জনমানসে জীবন্ত। তার মানে, ‘‌থাপ্পড়’‌ খেয়ে ‘‌থাপ্পড়’‌ মেরেও খুব একটা কাজের শিক্ষা দিতে পারলেন না তাপসী পান্নু। অথবা, ‘‌অমৃতা’‌র অবয়বে তাপসী শিক্ষা দিলেও আমাদের প্রথাগত শিক্ষিত মন সেই শিক্ষা হজম করে উঠতে পারল না। তাই নারীর যোগ্যতা, প্রতিভা, ক্ষমতার বিশ্লেষণে এখনও টেনে আনতে হচ্ছে এক পুরুষের নাম। বরং বলা যাক— ‌এই মেয়েটিই বলিউডের প্রথম তাপসী পান্নু।
প্রথমই বটে। বলিউডের বেড়াজাল যাঁকে আটকে রাখতে পারছে না, তিনি তো প্রথমই। এখনও পর্যন্ত পর্দা–‌উপস্থিতিতে যা বুঝিয়েছেন, তাতে এখন অপেক্ষা— ‘‌থাপ্পড়’‌–‌এর পর?‌ 
তাপসীর পরবর্তী রিলিজ ‘‌হাসিন দিলরুবা’‌। পরতে পরতে রোম্যান্স। পরিচালকের কথায়, ‘‌এটা একটা মার্ডার মিস্ট্রি। সঙ্গে টুইস্টেড লাভ স্টোরি।’‌ নিশ্চয়ই অন্যরকম কিছু হবে!‌ তাপসীর সিনেমা মানেই এখন এমন অপেক্ষা, এমন আগ্রহ, এমনই জল্পনা। 
পাঞ্জাবি পরিবারের অনেকেই এসেছেন হিন্দি ছবির দুনিয়ায়। স্বকীয় যোগ্যতায় সাফল্য পেয়েছেন। জনপ্রিয়তাও জুটেছে। কিন্তু বত্রিশ প্লাস বয়েসে (‌জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ আগস্ট)‌ আর কোন অভিনেত্রী এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছেন, যে তাঁর আগামী রিলিজ নিয়ে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে?‌ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘‌পিঙ্ক’‌ ছবিতে সেই ‘‌আগামীর আগ্রহ’‌ জন্ম নিয়েছিল। যে আগ্রহ সতেজ থাকল ‘‌সুরমা’‌, ‘‌মুলক’‌, ‘‌মনমরজিয়াঁ’‌, ‘‌বদলা’‌, ‘‌ষান্ড ‌কি আঁখ’‌ হয়ে ‘‌থাপ্পড়’‌ পর্যন্ত। এরপর তিনি ‘‌রানি’‌ হয়ে আসছেন ‘‌হাসিন দিলরুবা’‌য়। আসবেন ক্রিকেটার মিতালি রাজের বায়োপিক ‘‌রশমি রকেট’‌–‌এও। জার্মান মুভি ‘‌রান লোলা রান’‌–‌এর হিন্দি সংস্করণ ‘‌লুপ লপেটা’‌–‌তেও থাকছেন। মজার ব্যাপার, এই ‘‌লুপ লপেটা’‌র প্রযোজক তনুজ গর্গই প্রথম টুইট করেছিলেন, ‘‌তাপসী ইজ বলিউড’‌স ফিমেল ভার্সন অফ আয়ুষ্মান খুরানা’‌। টুইটারেই তাপসীর প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘‌হোয়াট অ্যাবাউট কলিং মি বলিউড কি পহলি তাপসী পান্নু?‌’‌ 
তনুজ–‌তাপসী বন্ধু। কিন্তু তাঁদের টুইট লড়াই মোটেও সুখকর ছিল না। পরে তাপসী বলেওছিলেন, ‘‌তনুজের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না।’‌ হয়ত উদ্দেশ্য ভালই ছিল। কিন্তু তনুজের প্রশংসার ধরন ও ভাষায় ছিল চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিকতার বিদঘুটে গন্ধ। আমির খান বা আয়ুষ্মান খুরানার পরবর্তী সিনেমা নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকে, সত্যি। যেমন এ–ও সত্যি যে, এখন তাপসী পান্নুর পরবর্তী ছবি নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে। 
অভিনয় জগৎ থেকে শত সহস্র ক্রোশ দূরে তাপসীর পরিবার। দিল্লিতে জন্ম। অশোক বিহারের ‘‌মাতা জয় কাউর পাবলিক স্কুল’‌–‌এ পড়াশোনা। কম্পিউটার সায়েন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র‌্যাজুয়েট। ‌এমবিএ করবেন বলে ‘‌ক্যাট’‌–‌এও বসেছিলেন। স্কোর ৯০–‌এ পৌঁছয়নি বলে বি–‌স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। জীবনের মোড় ঘুরে গেল বি–‌টাউনের দিকে। সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে হয়ে গেলেন ফুলটাইম মডেল। চ্যানেল ভি–‌র প্রতিভা অন্বেষণের শো ‘‌গেট গর্জাস’‌–‌এ যখন তাপসীর নাম চূড়ান্ত হল, তখন কি কেউ বুঝেছিলেন, ওই ‘‌গর্জাস লুক’‌ সত্ত্বেও তিনি দর্শকের মন জিতবেন ‘‌ডিগ্ল্যামারাইজড’‌ লুকে?‌ 
অভিনয়ে হাতেখড়ি তেলুগু ছবি ‘‌ঝুমন্ডি নাদম’‌ দিয়ে। সেটা ২০১০ সাল। ২০১১ জুড়ে তামিল, তেলুগু–‌সহ মালয়ালম ছবি ছুঁয়ে ফেললেন। সমালোচকদের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছিলেন প্রথম তামিল ছবি ‘‌আদুকালাম’‌–‌এ। হাফ ডজন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল সেই ছবি। তখনই অভিনয়ে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। বলিউডে প্রথম ছবি ২০১৩ সালে ‘‌চশমে বদ্দুর’‌। ১৯৮১ সালের বিখ্যাত কমেডির রিমেক। অনেকেরই নজর পড়েছিল তাপসীর ওপর। ২০১৫ সালে অক্ষয়কুমারের ‘‌আন্ডারকভার’‌ সঙ্গী হয়ে ‘‌বেবি’‌–‌তে শাবানা খান হয়েছিলেন অল্প সময়ের জন্য। পরের বছর অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরির পরিচালনায় ‘‌পিঙ্ক’‌–‌এ এমন খেল দেখালেন, যে ‘‌বেবি’‌র সিকয়েলের নামই হয়ে গেল ‘‌নাম শাবানা’‌। অর্থাৎ, তাপসীকে ভেবেই চরিত্র আঁকতে শুরু করলেন ছবি করিয়েরা। পরিচালক সুজয় ঘোষ যেমন ‘‌পিঙ্ক’‌ দেখেই স্থির করে ফেলেছিলেন, ‘‌বদলা’‌য় তাঁর তাপসীকেই চাই। অনুভব সিন্‌হা যেমন আগেই ভেবে নিয়েছিলেন, ‘‌মুলক’‌–‌এর আইনজীবীকে দিয়েই পুংশাসিত সমাজের গালে ‘‌থাপ্পড়’‌ কষাবেন। সিনেমা–‌সমাজের এমন অনেকেই এই মুহূর্তে ‘‌অমৃতা’‌কে নিয়ে ভাবছেন, লিখছেন। 
ভাবছেন সিনেমাপ্রেমী দর্শকও। তারা এখন মিনাল অরোরা, শাবানা খান, আরতি মালহোত্রা, নয়না শেঠি বা অমৃতার জন্য নয়, অপেক্ষা করে তাপসী পান্নুর জন্য। এর পর কোন চরিত্রে তিনি?‌ ‘‌থাপ্পড়’‌ যখন পুংসমাজের দিকে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে সগৌরবে চলছে মাল্টিপ্লেক্সে ও একাকী প্রেক্ষাগৃহে, তখন আরও পাঁচটা ছবি তাপসীর হাতে। 
অনেকে মনে করছেন, ‘‌থাপ্পড়’‌ হল ২০১৯–‌এর ব্লকবাস্টার ‘‌কবীর সিং’‌ ছবিটির বিরোধী প্রচার। সেই ছবিতে চড় মারামারিকে ভালবাসার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তাপসীর বক্তব্য— ‘‌থাপ্পড় সন্দীপ রেড্ডির কবীর সিং–‌এর বিরোধিতা করেনি। বিরোধিতা করেছে শারীরিক নিগ্রহের। তবে আমার কবীর সিং দেখতে অসুবিধে হয়েছে। এমন ছবিতে আমি কখনওই অভিনয় করতাম না। আমাদের দেশে লোকে শাহরুখ খানের ডায়লগ নিজের বলে চালায়, সলমন খানের হেয়ার স্টাইল আপন করে নেয়। কবীর সিং–‌এর মতো সিনেমা কী ছাপ ফেলল?‌ চড় মারা সাধারণ ব্যাপার?‌ যে কোনও সম্পর্কে–ভালবাসায় চড়–‌থাপ্পড় মারাটা বড় ব্যাপার নয়?‌ ভায়োলেন্সটা উদ্‌যাপন করার মতো ব্যাপার?‌ দুঃখিত, কোনও সিনেমা থেকে এমন শিক্ষা যেন কেউ না পায়।’
‘‌থাপ্পড়’‌–‌এর ওই কথাটাই মনে পড়ে— ‘‌হাঁ, বস্‌ এক থাপ্পড়! পর নহি মার সকতা। একবার ভি নহি মার সকতা।’‌
‘‌কবীর সিং’‌ যাঁরা ভালবেসেছেন, তাঁরা ‘‌থাপ্পড়’‌ দেখে কী বলবেন?‌ অমৃতা–‌র একটানা অবাক দৃষ্টি কতগুলো থাপ্পড় মারতে পারে তাঁদের মুখে?‌ অমৃতার নাগাড়ে নিস্তব্ধ মুখ কত জোরালো শব্দের উচ্চারণে তাঁদের কান ঝালাপালা করে দিতে পারে?‌ 
ঠিকই। তিনি ‘‌বলিউডের প্রথম তাপসী পান্নু’‌। তিনিই।

জনপ্রিয়

Back To Top