তরুণ ভট্টাচার্য, অনুলিখনে সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: সালটা ১৯৮২ হবে। দিল্লীর দড়িয়াগঞ্জে এচ এম ভির স্টুডিওতে আমার রেকর্ডিং চলছিল। একদিন হঠাৎ শুনলাম ঐ স্টুডিওতে সেদিন বিশ্ববন্দীত সেতার শিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্কর আসবেন, তাঁর এশিয়ান গেমসের থীম সং ‘‌শুভ স্বাগতম’‌-‌এর এডিটিং এর জন্য। আমার রেকর্ডিং কিছুক্ষণ বন্ধ রাখতে হবে। এটা শুনেই আমার আনন্দে মন ভরে গেল, এই ভেবে যে এত কাছ থেকে এমন একজন শিল্পী কে দেখতে পাব। পন্ডিতজি স্টুডিওতে আসতেই আমি প্রনাম করে আমার আনন্দের কথা জানালাম। আমি ওঁর সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছিলাম। উনি আমাকে থামিয়ে বলে উঠলেন ‘‌দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি তো ভট্টাচার্য বললে। তুমি তো বাঙালি, আমার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছ কেন’‌? আমি বললাম, ‘‌সকাল থেকে হিন্দি বলে বলে এবং আপনাকে এত কাছ থেকে দেখে উত্তেজনায় বলে ফেলেছি।’‌ আমার মনে আছে প্রথম দিনেই আমি ওঁর ছাত্র হতে চেয়েছিলাম। শুনে বললেন, ‘‌তুমি আমার কাছে কি শিখবে? তোমার নিজের এল পি রেকর্ড বের হচ্ছে।’‌
অনেক অনুরোধের পর রাজি হলেন। তবে শর্ত, কলকাতায় গেলে তোমার বাজনা শুনবো, তার পরে জানাবো। আমি অপেক্ষায় আছি কবে পন্ডিতজি ডাকবেন। এমনই এক শীত সকালে ওঁর ডাক এল। আমার কেন, আমার গোটা পরিবারের কাছে সেটা আনন্দের দিন। আমি তখন হাওড়াতে থাকি। সেখান থেকে বাবা, কাকা, দিদি সহ প্রায় আধ ঘণ্টা দেরি করে শ্রীধর লালার বাড়ি পৌচ্ছলাম (পন্ডিতজি কলকাতায় এলে এখানে উঠতেন)। উনি দেখে বললেন, ‘‌আমারতো অন্য কাজ আছে। আজকে তোমাকে আর শুনতে পারব না।’‌
আমার মনের অবস্থা বুঝুন!‌ বাবার অনুরোধে শুনতে রাজি হলেন। মনে আছে সেদিন আমি সকালে সন্ধ্যার রাগ ইমন বাজিয়ে ছিলাম। উনি আমার সেদিনের বাজনা শুনে ছাত্র করে নিতে রাজি হন। শুধু বললেন, ‘‌তুমিতো খুবই ভাল বাজাও, আমার কাছে কি স্ট্যাম্পের জন্য শিখবে?’‌ আমি বললাম, ‘‌আমি কিছুই জানিনা আপনার কাছে সব কিছু শিখতে চাই।’‌ 
দিনটি আজও আমার কাছে স্মরণীয়। আমার ওঁর কাছে গান্ডা বাঁধার অনুষ্ঠান হয়েছিল এলগীন রোডের জাহাজ বাড়িতে। সেদিন আমার সঙ্গে ছিলেন সেতার শিল্পী সুনীল কুমার দাস। তারপর থেকে ওঁর কাছে অনেক কিছু শিখেছি। কলকাতায় যখন আসতেন, দিল্লীতে ৯৫ লোদী রোডের বাড়িতে, বেনারস শিবপুরাতে তাঁর বাড়ি ‘‌হেমাঙ্গনা’‌, যখন যেখানে ডেকেছেন সেখানে ওঁর বাড়িতে থেকে তালিম পেয়েছি। সেই সব দিন আজও ভুলতে পারি না। সেই সময় আমরা— আমি, সমরেশ চৌধুরী, পার্থসারথি, বিশ্বমোহন ভাট, শিপ্রাদি (বসু), দয়াশঙ্কর সবাই একসঙ্গে তালিম পেতাম। ওঁর সিনিয়র শিষ্যদের মধ্যে দীপক চৌধুরী ছিলেন ছিলেন, বিজয় রাঘব রাও, কার্তিক কুমার, শামীম আহমেদ।
সেই সময় বেশির ভাগ অনুষ্ঠানে পন্ডিত রবিশঙ্কর মঞ্চে উঠতেন দীপকদা (সেতার) এবং তবলায় কুমারদা (বসু) কে নিয়ে। এখনও কলকাতার মার্বেল প্যালেসে সারা রাতের অনুষ্ঠানের কথা ভুলতে পারিনা। এছাড়াও কার্তিক কুমার, শামীম আহমেদ, পার্থসারথি, পরবর্তী কালে মেয়ে অনুষ্কা শঙ্করকে নিয়েও বহুবার মঞ্চে উঠেছেন। দেশে বিদেশে বিভিন্ন অর্কেস্ট্রার অনুষ্ঠানে একসঙ্গে গুরুজীর সঙ্গে মঞ্চে ওঠার সুযোগ হয়েছে, তখন বুঝেছি ওঁর জনপ্রিয়তা। সমস্ত জায়গায় প্যাকড হল হতো। গুরুজির সঙ্গে বিদেশে বহু সফরে আমায় নিয়ে গিয়েছেন। মনে আছে রাশিয়ায় ভারত উৎসবে ক্রেমলীনে বিশাল অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে গুরুজি আমাদের অনেককে নিয়ে গিয়েছিলেন— আমি, কুমার বসু, বিশ্বমোহন ভাট, রুনু মজুমদার, দয়াশঙ্কর প্রতেকেই ওনার অর্কেস্ট্রাতে বাজাতাম। এখান থেকে চার্টারড ফ্লাইটে রাশিয়ায় গিয়েছিলাম এবং এক মাস ছিলাম। এই অনুষ্ঠানটি পরে এল পি রেকর্ড হয়ে বেরিয়ে ছিল—‘‌ইনসাইড দ্য ক্রেমলীন’‌ নামে। রেকর্ডটি দেশে বিদেশে এখনও জনপ্রিয়। জর্জ হ্যারিসনের বাড়িতে গুরুজির সঙ্গে চারবার বাজিয়েছি। ওঁর বাড়িতেই রেকর্ড হয়েছিল আর একটি বিখ্যাত রেকর্ড ‘‌চ্যান্টস অব ইন্ডিয়া’‌। ‘‌তানাবানা’‌ রেকর্ডে গুরুজি আমাকে দিয়ে রাগ হংসধ্বনির উপর একটা পিস বাজিয়ে নিয়েছিলেন লক্ষী শঙ্করের গানের আগে। আরও একটি জনপ্রিয় আ্যলবাম ’‌নিউ অফারিং ফর্ম রবিশঙ্কর’‌-‌এও আমার সন্তুর আছে। লসএঞ্জলেসে একটি অনুষ্ঠানের শুরু হয়েছিল আমার সন্তুরের ঝালা দিয়ে, সেই অনুষ্ঠানে গুরুজির সঙ্গে তবলায় ছিলেন স্বপন চৌধুরী।
একবার গুরুজির সঙ্গে লন্ডন থেকে এক ফ্লাইটে কলকাতায় এসেছিলাম। এত মজার মজার কথা বলতেন যে কেমন করে সময় কেটে যেত বুঝতেই পারতাম না। বিদেশে গুরুজির সঙ্গে সিনেমা দেখারও অভিজ্ঞতা আছে আমার। একবার লন্ডনে ওঁর কোনও রেকর্ডিং চলছিল। আমায় সকালে ফোন করে বললেন, ‘‌তরুন তুমি কি একবার স্টুডিওতে আসতে পার? রেকর্ডিং এ তোমার সন্তুর নেই কিন্তু। তোমাদের দেখলেই মন ভাল লাগে।’‌ গুরুজির সঙ্গে শেষ দেখা ওঁর মৃত্যুর বছর খানেক আগে। উনি নিজেই আমদের দেখতে চেয়েছিলেন। দিল্লির বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছিলাম আমি ও সঞ্চিত দুজনেই। অনেক আশীর্বাদ করেছিলেন। আমার কাছে সব থেকে বড় পাওয়া, গুরুজি আমার বাড়িতে এসেছিলেন এবং সন্তুর আশ্রমের কথা শুনে আনন্দিত হয়েছিলেন। পন্ডিত রবিশঙ্কর শুধু যে আমার শিক্ষা গুরু, দীক্ষা গুরু, তা নয়, তিনি আমার জীবন দেবতা। 

পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে তরুণ ভট্টাচার্য

জনপ্রিয়

Back To Top