সম্রাট মুখোপাধ্যায়: দাদার কীর্তি
তাপস পালের ‘‌ম্যাগনাম ওপাস’‌। প্রথম ছবিতেই এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য উত্তমকুমার, অমিতাভ বচ্চনরাও পাননি। তাঁরা কেরিয়ার গড়েছেন ধাপে ধাপে। তাপস কিন্তু প্রথম ছবিতেই এলাম–‌দেখলাম–‌জয় করলাম। উত্তমকুমার তখন সদ্যপ্রয়াত। এ সময় দরকার ছিল এক একান্ত বাঙালি চরিত্রের নায়ক। যে ভালমানুষ, কিন্তু দৃঢ়, উদার এবং তুমুল প্রেমিক। আর যাকে দেখলে ‘‌পাশের বাড়ির ছেলেটি’‌ বলে মনে হয়। তাপসের চেহারার দোহারাপনায়, চোখের ভীরুতায়, কণ্ঠের মিষ্টত্ব কিন্তু কাঁপনে— ‌এর সবটুকু ধরা ছিল। কেদার— এক বোকা আর ‘‌কুৎসিত রাজহাঁস’‌, যে এক সরস্বতীতুল্য মেয়ের প্রেমের আঁচে পরিণত হল সুন্দর রাজপুত্রে। বাঙালি জীবনের অতুলনীয় এমন রূপকথায় তাপস পালকে বিকল্পহীন লেগেছিল। গানের দৃশ্যগুলোতে তাঁর অভিব্যক্তি ভোলা যায় না!‌
সাহেব
এ ছবি যখন সিনেমা হয়, তখন একটা ‘‌চোরা টেনশন’‌ ছিল। কারণ এ কাহিনি তার আগে অন্তত বছর পাঁচেক তুমুল জনপ্রিয় ছিল রেডিও নাটকে। বেতারের তখন সোনালি যুগ। গল্পটা বহু দর্শকই জানতেন। সঙ্গে নাটকের দুরন্ত অভিনয়ের স্মৃতি। একজন নবাগত, খ্যাতিহীন অভিনেতা এ চরিত্র কতটা টানতে পারবে, সে নিয়ে সংশয় ছিল প্রবল। সাহেব একজন ফুটবলার, যে পরিবারের জন্য নীরবে আত্মত্যাগ করছে। এমন চরিত্রে কি মানাবে সেই ছেলেকে, যে এর আগে চরিত্র বলতে করেছে একটাই— ‘‌দাদার কীর্তি’‌র কেদার। বোকাসোকা, রোগে ভোগা চরিত্র!‌ কিন্তু ‘‌সাহেব’‌ যখন পর্দায় এল, একবারের জন্যও তাপস পাল আর চিত্রনাট্যের ফুটবলার ছেলেটিকে আলাদা করা যায়নি। তা সে ম্যাচ খেলে আসার পরের হুঙ্কারে হোক বা কিডনি দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের নীরব দৃঢ় অভিব্যক্তিতে। তাপস প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন, গান এবং তরুণ মজুমদার— এই দুই উপকরণ ছাড়াও তিনি হিট। বিএফজেএ পুরস্কার পান এ ছবির জন্য।
গুরুদক্ষিণা
পর্দায় তাপস পাল এবং তাঁর লিপ‌–‌এ মজবুত গান— এ দুটি ব্যাপার একসঙ্গে ঘটা মানেই বক্স অফিসে ঝনঝনানি। ‘‌গুরুদক্ষিণা’‌য় যা অনিবার্যভাবেই ঘটেছিল। এই ছবি দিয়েই অঞ্জন চৌধুরি ক্যাম্পে তাপসের পা রাখা (‌যদিও এরপর ‘‌মঙ্গলদীপ’‌ আর ‘‌মহাজন’‌ ছাড়া সেরকম উল্লেখযোগ্য ছবি এই ক্যাম্পে তাপস আর করেননি)‌। অঞ্জনের নিজের পরিচালনায় এর আগের দুটি ছবিই প্রবল রাগী। ‘‌শত্রু’‌ আর ‘‌বিদ্রোহী’‌। তৃতীয় ছবি ‘‌গুরুদক্ষিণা‌’‌য় আর সেই ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি করতে চাইছিলেন না অঞ্জন। তাই রঞ্জিত মল্লিক থাকলেন ঠিকই, কিন্তু মজাদার এক রসিকতাপ্রিয় ‘‌মোর দ্যান হিরো’‌ চরিত্রে। যেমন চরিত্রে অতীতের বাংলা ছবিতে থাকতেন ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলিরা। তার পাশে দরকার ছিল এমন এক নায়কের, যাঁর ইমেজটা স্নিগ্ধ। আর গানে লিপ দিতে পারেন নিখুঁত বিশ্বস্ততায়। কারণ এই লিপ দেওয়া নিয়েই এক মজার দৃশ্য আছে যে। কঠিন সেই দৃশ্যে ‘‌লিপ’‌ দেওয়ার কৌশলকে দর্শকদের সামনে অনেকটা ‘‌আনফোল্ড’‌ করেছিলেন তাপস। বুঝিয়েছিলেন অভিনয়ের এই বিশেষ কলাটিতে বাংলা সিনেমায় তিনি উত্তমকুমারের সার্থক উত্তরসূরি।
পথভোলা
ইমেজ গড়ে দিয়েছিলেন তিনি। ইমেজ ভেঙেও দিয়েছিলেন তিনিই। তাপস পালের ‘‌মেন্টর’‌, ‘‌গডফাদার’‌ তিনি। তরুণ মজুমদার। তাপস পালের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তপোক্ত জুটি যাঁর। এ ব্যাপারে তাপসের যে কোনও সহ–‌নায়িকাকেও হারিয়ে দেবেন তিনি। তালিকাটা খালি দেখুন— ‘‌দাদার কীর্তি’‌, ‘‌ভালোবাসা ভালোবাসা’‌, ‘‌পথভোলা’‌, ‘‌পরশমণি’‌, ‘‌আগমন’‌, ‘‌আপন আমার আপন’‌, ‘‌কথা ছিল’‌, ‘‌অরণ্যের অধিকার’‌, ‘‌ভালোবাসার অনেক নাম’‌। ৯টা ছবি। যার মধ্যে হাফ ডজন হিট। কিন্তু এর ভেতর সবচেয়ে অন্যরকম ছবি ছিল ‘‌পথভোলা’, তাপসের চরিত্রায়নের পক্ষে। ছবিতে তাপস একজন পলাতক আসামি। যে শহর ছেড়ে নিজের গ্যাং নিয়ে পালিয়ে এসেছে এক গ্রামে। সেখানে আত্মগোপন করে আছে। যে দর্শকেরা পর্দায় নরমসরম তাপসকে দেখে অভ্যস্ত, তাদের পক্ষে এ চরিত্র এক ধাক্কা। রুক্ষ, আপাতনিষ্ঠুর, মুখ‌খারাপ আর মাথাগরম করা এক কাঁটাগাছের মতো ছেলে, যে ছবি যত এগোয়, আস্তে আস্তে বদলায়। প্রায় হলিউড স্টারদের মতো দাপুটে আর প্রথাসিদ্ধ অভিনয় করেছিলেন তাপস।
উত্তরা
চমকে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। যেভাবে পর্দায় এনেছিলেন নিমাইকে। এক মাথা কদম ছাঁট চুল!‌ খালি গা!‌ আর পরনে ছোট্ট ল্যাঙট!‌ প্রবল শরীরী আশ্লেষে কুস্তি লড়ে যাচ্ছে এক পুরুষ। তার যেন প্রেম নেই, মন নেই, মনন নেই!‌ আছে শুধু খিদে আর কুস্তি!‌ এমন এক ‘‌অ্যান্টি–‌রোমান্টিক’‌ চরিত্র বাংলা ছবিতে এসেছেই কম। তার ওপর আবার সে চরিত্রে কে?‌ না, তাপস পাল!‌ পর্দায় যাঁর ভীরু, নরম রোমান্স দেখে এক–‌দু প্রজন্মের প্রেমের ভাবনায় হাতেখড়ি। উল্টোদিকে শঙ্কর চক্রবর্তীর মতো দাপুটে অভিনেতা, পাশে জয়া শীল–‌এর মতো ‘‌বিপজ্জনক’‌ অভিনেত্রী। আবার পায়ের তলায় এমন এক অসমতল চরিত্রের অস্বস্তিকর খাদ। আর সামনে ক্যামেরা, যার পেছনে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো খুঁতখুঁতে পরিচালক। অদ্ভুত নৈপুণ্যে সামলেছিলেন তাপস। তখন সময়ের লক্ষণদুষ্ট হয়ে একের পর এক ফর্মুলা ছবির চাহিদা মিটিয়ে ক্লান্ত নায়ক, দেখিয়েছিলেন কেমন সুযোগ পেলে তিনিও হয়ে উঠতে পারেন বিকল্প পথের অভিযাত্রী!‌

জনপ্রিয়

Back To Top