অদিতি রায়: • সম্প্রতি আপনার ফটোগ্রাফির প্রদর্শনী হয়ে গেল, সবাই এতদিন জানতেন সঙ্গীত আপনার প্যাশন, তাহলে ফটোগ্রাফি কোথায় দাঁড়িয়ে?‌
•• আমার কাছে কোনও শিল্পই বিচ্ছিন্ন নয়। ছোট থেকে আমি ছবিও এঁকেছি। কবিতা লিখতাম, আবৃত্তি করতাম, তবলাও বাজাতাম। শিল্পের সব মাধ্যমই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি ভিসুয়াল আর্টে বরাবরই আগ্রহী। আমি হয়ত একজন গায়কের চোখ দিয়েই দুনিয়াটা দেখি, আমার ফটোগ্রাফি বা ছবিতে তারই প্রতিফলন ঘটে। হ্যাঁ, ঘটনা পরম্পরায় সঙ্গীতেই আগে আমার পরিচিতি হয়েছে, উল্টোটাও হতে পারত। আর কী জানেন তো, শিল্পচর্চা নিয়ে আমাকে মানুষের কাছে পৌঁছতেই হবে, এমন তাড়না আমার কোনওকালেই ছিলনা। আমি ভেসে যাই, আমার তরী যেখানে ভিড়বে ভিড়ুক, সেটা আমি ভাগ্যের ওপরেই ছেড়ে দিই।
• ছোট থেকে কী হতে চাইতেন?‌
•• (‌হাসি)‌ বাড়ি বাড়ি সার্ফ বিক্রি করতে আসতেন যে মহিলারা, তাঁদের আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগত। কারণ তাঁরা অনেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ান, কত নতুন মুখের সঙ্গে পরিচিত হন, কাজেই আমি ছোট থেকে সার্ফ বিক্রি করা সেলস গার্ল হতে চেয়েছিলাম!‌ ছোটবেলায় নানা প্যান্ডেলে ঘুরে ঠাকুর দেখার থেকে বেশি পছন্দ করতাম এক জায়গায় বসে নানান মানুষকে দেখা। এই দেখাটা, অবজার্ভেশনটাই ছিল আমার প্যাশন। তারই ফসল ছবি আঁকা বা ফটোগ্রাফি। আগে ছবি তুলতাম, কিন্তু সেগুলো দেখানোর ইচ্ছেটা জাগল আমার একটা ছোট্ট বেড়ালছানা পুয়ান আসার পর। পুয়ান ভীষণ মনোযোগ আকর্ষণ করতে জানে। ও বেশ ব্যতিক্রমী। মনে হয় ও আমার ভাষা বোঝে। ওই আমার প্রেরণা। আগে মোবাইলে ছবি তুলতাম, এখন নিকন ৯০০-‌তে তুলি (‌হাসি)‌।
• আপনি তো মাল্টি টাস্কিং করেন দেখছি!‌
•• জানেন তো আমি স্কুলে ডাকহরকরার কাজ করতাম। বন্ধুদের প্রেমপত্র বিলি করা, চিঠি চালাচালি, প্রেমিক যুগলকে মিলিয়ে দেওয়া ছিল আমার মস্ত কাজ (‌হাসি)‌!‌ আমার মিলিয়ে দিতে খুব ভাল লাগে। সেখান থেকেই পরবর্তীতে রামায়ণের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত, ভগবদ্গীতার সঙ্গে উপনিষদ, ৫১ টি শক্তিপীঠের সঙ্গে ৫১ টি কাজী নজরুলের মায়ের গান মিলিয়েছি। এখানেও আমার তোলা ছবির সঙ্গে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মিলন ঘটানোর চেষ্টা করেছি। আমার তোলা একটা সেল্ফ পোট্রের্টের ক্যাপশন ছিল ‘অভিশাপ নয় নয়, আনছে আমার জন্মান্তর‌’।
• ছোট থেকেই যে বিভিন্ন মানুষকে অবজার্ভ করতেন, কখনও অভিনেত্রী হওয়ার ইচ্ছে হয়নি?‌
•• আমি অভিনয় করেছি দুটো ছবিতে (‌হাসি)‌।‌ শঙ্খ ঘোষের ‘‌কথা’‌ এবং আর একটা ছবি ‘বিন্দাস প্রেম‌’‌, পরিচালকের নামটা পার্থ, পদবীটা মনে পড়ছেনা।

ব্যাস, এটুকুই। তাও অনেক অনুরোধে এদুটো করেছি। পুরোদস্তুর অভিনেত্রী হওয়ার সময় নেই। ছোটবেলায় নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘‌রাণুর প্রথম ভাগ’‌-‌এর জন্য আমাকে নির্বাচিত করেছিলেন। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মহড়াও দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা বেঁকে বসাতে আমার আর ‘‌রাণু’‌ হওয়া হয়নি।
• এবার একটু রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রসঙ্গে আসি। এখন যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া হচ্ছে, সিনেমা-‌টিভিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে, তাতে আপনার কী মতামত?‌
•• যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গানে ‘হু লা লা‌’‌ ঢুকে যাচ্ছে আমি তার ঘোরতর বিরোধী। এখনও কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত ভুলভাল গাইলে মানুষই তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। হয়ত কৌতুহলে প্রথমে শোনেন, কিন্তু পছন্দ না হলেই রে রে করে উঠতেও ভোলেন না। শ্রোতাদের দায়িত্ব এক্ষেত্রে অনেক বেশি। বাহ্যিক আড়ম্বর রবীন্দ্রসঙ্গীতে অপ্রয়োজনীয়। তাঁর একটা নিজস্ব ঘর আছে। প্রত্যেক ঘরের যেমন আলাদা চেহারা থাকে, তেমনই। তাকে সম্মান জানানো উচিত। আমি নামকরা অভিনেত্রী বলে যেমন তেমন করে কোনও ফাংশানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারিনা!‌ যেমন অভিনয় না জানলে যেমন তেমন ভাবে অভিনয় ক’‌রে অভিনয় শিল্পকে ঠাট্টা করা উচিত নয়, ঠিক তেমনই!‌ আমাকে এসব অস্থির করে তোলে।
• আপনার গায়কী নিয়ে যেরকম শ্রোতাদের মুগ্ধতা আছে, সেরকমই আপনার চেহারা, সাজগোজ, কাজল, লম্বা টিপ, এলো খোঁপা নিয়েও চর্চা আছে, বিশেষত পুরুষদের মধ্যে, এনজয় করেন?‌
•• (হো হো করে হেসে উঠলেন‌)‌ খুব এনজয় করি। এটা ভাল লাগতে তো বাধ্য!‌ অনুষ্ঠানের শেষে যখন সবাই ঘিরে ধরেন, তখন খালি পেটেও বিরক্তি আসেনা।
• এই ‘‌প্যাকেজ’‌টা কি সচেতন ভাবে তৈরি?
•• স্কুলে ছিল লম্বা দুই বিনুনি। ১৯৮৫-‌তে দিল্লি থেকে এসে রবীন্দ্রভারতীতে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন আমি জিনস আর পাঞ্জাবি পরতাম, চুলটা আবার ছিল এলিজাবেথ টেলরের মতো কপালে ছোট ছোট করে ছাঁটা, চাইনিজ ছাঁট বলা হত যেটাকে, আর বাকিটা কাঁধ পর্যন্ত (‌হাসি)‌।‌ তারপর চুল ছোট করে পার্ম করে ফেললাম। এলিজাবেথ টেলর থেকে পিনাজ মাসানি হয়ে গেলাম!‌ চুলের ওপর প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেছি (‌হাসি)‌। তারপর কপালে টিকা আর এলো খোঁপাটাই যেন কখন আমার সঙ্গীত যাপনের অঙ্গ হয়ে গেল। 

আত্মপ্রতিকৃতি : স্বাগতালক্ষ্মীর ক্যামেরায়‌, নিজের স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে, নন্দনে। ছবি :‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top