সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সিনেমার কলাকুশলীদের কাছে তিনি ছিলেন বেণুদি। উত্তমকুমারও তাঁকে ডাকতেন ‘‌বেণু’‌ বলেই। অথচ, একসময় পর্দায় তাঁর এই ‘‌বেণু’‌ নামটা কেড়ে নিয়েছিল সিনেমা জগৎ–‌ই। বেণুর বদলে সিনেমার নাম–‌লিপিতে তিনি হয়ে গিয়েছিলেন সুপ্রিয়া। ১৯৫২–‌য় প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘‌বসু পরিবার’‌ থেকেই। প্রযোজক সংস্থা এম পি পিকচার্স–‌এর স্টুডিও–‌য় দাঁড়িয়ে এই নামকরণটি করেছিলেন অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল।
আর নতুন নামের গোড়াতেই বাজিমাত। সুপারহিট হয়েছিল প্রথম ছবিই। আর দর্শকদের রীতিমতো নজরে পড়ে গিয়েছিলেন সুপ্রিয়া। এ’‌ছবিতে তিনি পুরোপুরি নায়িকা নন। বরং নায়কের বোন। তবু অভিনয়গুণে আলাদা করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। মজার কথা, এই ছবিতে তাঁর দাদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি, যাঁর সঙ্গে পরবর্তীতে তাঁর গড়ে উঠবে সুদীর্ঘ অন–‌স্ক্রিন, ‌অফ–‌স্ক্রিন রোমান্স। উত্তমকুমার এ’‌ছবিতে হয়েছিলেন সুপ্রিয়া ব্যানার্জির দাদা। এবং এটাই উত্তমের নায়ক কেরিয়ারেরও প্রথম হিট ছবি। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি তৈরি হতে তখনও পাক্কা এক বছর বাকি। বয়সে সুচিত্রা সেনের চেয়ে কিছুটা ছোট হলেও, সুপ্রিয়া সিনেমায় এসেছিলেন সুচিত্রার থেকে এক বছর আগে। তখন তাঁর ১৯ বছর বয়েস।
পর্দায় যতই পূর্ববঙ্গীয় মেয়ের চরিত্র ক’‌রে খ্যাতি পান না কেন সুপ্রিয়া, আদতে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা বর্মায়। জন্ম ১৯৩৩–‌এর ৮ জানুয়ারি। বাবা গোপালচন্দ্র ব্যানার্জি ছিলেন পেশায় আইনজীবী। মা কিরণবালা ব্যানার্জি ছিলেন ঢাকার মেয়ে। সেই সূত্রেই পূর্ববঙ্গীয় আদব–‌কায়দা, কথাবার্তার প্রচলন ছিল বাড়িতে। কলকাতার ল্যান্সডাউনে একটি বাড়ি ছিল গোপালবাবুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে এলেন তাঁরা। ইতিমধ্যে বেণুর ওপরের বোনেদের কয়েকজনের বিয়ে হয়ে গেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বড়দি লীলার বিয়ে হয়েছে লেখক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় ওরফে বনফুলের সঙ্গে।
সিনেমা জগতের সঙ্গে বেণুর যোগাযোগের সূত্র অভিনেত্রী চন্দ্রাবতী দেবী। তিনি থাকতেন গোপালবাবুদের বাড়ির কয়েকটি বাড়ি পরেই। তিনি বেণুর আগ্রহ দেখে পরিচালক নীরেন লাহিড়ীকে বলেন তাঁকে নেওয়ার কথা। ছবির নাম ‘‌নাগপাশ’‌। মাসিক ২০০০ টাকা চুক্তিতে বেণুকে এ’‌ছবির অন্যতম নায়িকা হিসেবে নেওয়া হয়। চরিত্রটি ছিল এক অন্ধ মেয়ের। এ’‌ছবি চার মাস শুটিং হওয়ার পরে প্রযোজকের অর্থাভাবের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর একই অঙ্কের অর্থের চুক্তিতে তৎকালীন নামী প্রযোজক সংস্থা এম পি প্রোডাকশন্স‌–‌এ কাজ করতে যান বেণু। আর সেটাই ‘‌বসু পরিবার’‌।
সিনেমায় আসার আগে থেকেই হাজরা সন্নিহিত অঞ্চলের ছেলে হিসেবে উত্তমকে চিনতেন বেণু। সামান্য আলাপও ছিল। সেই বোঝাপড়াটাই কাজে লেগেছিল। এমন অভিষেকের পরে আর পিছন ফিরে তাকানোর কথা নয় সুপ্রিয়ার। কিন্তু পারিবারিক আপত্তিতে সিনেমায় অভিনয় করা বন্ধ হয়ে গেল তাঁর। কলকাতায় ‘‌বসু পরিবার’‌ যখন মুক্তি পাচ্ছে, তখন সুপ্রিয়া বম্বেতে তাঁর দিদির কাছে!‌ কলকাতায় ফিরেই এরপর তাঁর বিয়ে হয়ে গেল নিজেরই পছন্দ করা পাত্র বিশ্বনাথ চৌধুরির সঙ্গে।
১৯৫৯ সালে সুপ্রিয়া দেবীর আবার অভিনয়ে ফিরে আসা সাড়া ফেলে দিয়েই। ছবির নাম ‘‌আম্রপালী’‌। অভিনীত চরিত্রের প্রতি এই ‘‌ডেডিকেশন’‌ মুগ্ধ করেছিল উত্তমকুমারকেও। পরে তিনি জানিয়েছিলেন সুপ্রিয়াকে। আর এই বছরেই দু’‌জন নায়ক–‌নায়িকা হয়ে করলেন‌ ‘‌সোনার হরিণ’‌। সুপ্রিয়ার চরিত্র এক ‘‌এয়ারহোস্টেস’‌–‌এর। সুপ্রিয়া দেবীর অভিনেত্রী জীবনের ভেতর থেকে উঠে আসা যে তারকা ইমেজ তার সবটা জুড়েই আছে এক তুমুল ‘‌আরবান’‌ আধুনিকার বিভা। কথায়–‌চাহনিতে–‌পোশাকে–‌চুলের কেতায়। আর সে ‘‌ফ্যাশনিস্তা’‌ ইমেজের জন্ম এই ১৯৫৯–‌এই। ঘোর–‌সুচিত্রা যুগের মধ্যে বসেই।
১৯৫৯ যদি ‘‌চোখ ধাঁধানো’‌ সুপ্রিয়াকে উপস্থিত করে থাকে, ১৯৬০ তবে প্রতিষ্ঠা দিল অভিনেত্রী সুপ্রিয়াকে। ঋত্বিক ঘটকের ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌ জন্ম দিল এক অশ্চর্য উজ্জ্বল তারার। তুমুল গ্ল্যামার–‌আইকনের পুরোপুরি গ্ল্যামার–‌হারা এক চরিত্রায়ন। কথায় আটপৌরে ভঙ্গি, স্বরে যথাসম্ভব নিচু তার বাঁধা, হাসিতে ঝরানো বিষাদ, ভগ্ন কণ্ঠের আশ্চর্য প্রয়োগ— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা–‌প্রতিমা। খ্রিস্টের আত্মত্যাগের এক নারী গরিমা যেন। তাঁর কণ্ঠে ‘‌‌দাদা, আমি বাঁচতে চাই’‌ প্রবাদ হয়ে গেল।
‘‌মেঘে ঢাকা তারা’–‌র পরেই ঋত্বিকের ‘‌কোমলগান্ধার’‌–‌এও তিনি দৃঢ়তায়–কোমলে অনুপম। ‘‌সুবর্ণরেখা’–‌র জন্যও ডাক পেয়েছিলেন।  কিন্তু ‌‘‌ডেট’‌ দিতে না পারায় সে ছবি করা হয়নি। তবে ততদিনে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি পোক্ত হয়ে গেছে পর্দায়। সুচিত্রার সঙ্গে সাময়িকভাবে জুটি ভেঙেছে উত্তমের। আর তখন মহানায়কের মহানায়িকা সুপ্রিয়াই। ‘‌উত্তরায়ন’‌, ‘‌সূর্যশিখা’‌, ‘‌লালপাথর’‌, ‘‌শুধু একটি বছর’‌, ‘‌কাল তুমি আলেয়া’‌, ‘‌জীবনমৃত্যু’‌, ‘‌চিরদিনের’‌, ‘‌মন নিয়ে’‌, ‘‌বিলম্বিত লয়’‌— ছয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে প্রতিষ্ঠা দিল এই জুটিকে। ‘‌লালপাথর’‌–‌এ চাবুক হাতে অত্যাচারী জমিদার হেমদাকান্তের সামনে অচঞ্চল মাধুরী (‌সুপ্রিয়া)‌। দীর্ঘ শটের এই দৃশ্য পরিণত অভিনেত্রীর দক্ষতার আর এক প্রকাশ। ‘‌চিরদিনের’‌ বা ‘‌বিলম্বিত লয়’‌–‌তে সুপ্রিয়ার অভিনয় দেখে অনেকেই তাঁর সঙ্গে তুলনা টেনেছিলেন সুচিত্রা সেনের। যেমন তাঁর অভিনয়–‌ভাবনার ভেতরে থাকা হলিউডি আভা সোফিয়া লোরেনের সঙ্গেও তাঁর তুলনা করতে বাধ্য করেছে ভক্তদের।
সাতের দশকে আবার আরও বদলে যাওয়া তিনি। ‘‌বনপলাশীর পদাবলী’–‌র গ্রাম্য তরুণী। এ’‌ছবির শেষে চোখ খুলে রেখে তাঁর মৃত্যুদৃশ্য ভোলার নয়। ‘‌সন্ন্যাসী‌ রাজা’‌। উত্তমের ওই বর্ণময় চরিত্রের সঙ্গে মানানসই কখনও দাপুটে, কখনও দ্বিধান্বিত রানি চরিত্র। ‘‌সব্যসাচী’–‌তে নারী বিপ্লবী। আর অনবদ্য ‘‌সিস্টার’‌।
বম্বেতেও সাফল্য পেয়েছিলেন ‘‌দূর গগন কি ছাঁও মে’‌ বা ‘‌বেগানা’–‌র মতো ছবিতে। উত্তমকুমারের মৃত্যু তাঁর অভিনয় জীবনে দীর্ঘ ছেদ আনে। আবার নয়ের দশকের মাঝামাঝি দূরদর্শনের ‘‌জননী’‌ ধারাবাহিক খ্যাতির কেন্দ্রে এনে দেয় তাঁকে। ‘‌কড়ি দিয়ে কিনলাম’‌ বা ‘‌আত্মীয়স্বজন’‌–‌এর মতো ছবিতে বয়স্ক চরিত্রেও তাঁর সাবলীলতা প্রমাণ করেন তিনি। একসময় ’‌বিশ্বরূপা’‌ মঞ্চে নিয়মিত পেশাদার নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। মঞ্চে তাঁর শেষ অভিনয় গত দশকের মাঝামাঝি ‘‌নিভা আর্টস’‌–‌এর ‘‌জননী’‌ নাটকে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top