অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: তিননম্বর ময়রা স্ট্রিটের সেই উত্তম-‌ময় বিখ্যাত বাড়িতে তিনি বহু বছরই থাকেন না। মাঝখানে বেশ কয়েকবছর ছিলেন লাউডন স্ট্রিটে। এখন দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত সরকারি আবাসনে সুপ্রিয়া দেবীর বসবাস। সৌজন্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবুও, সুপ্রিয়াদেবীর সঙ্গে দেখা করলে অবধারিতভাবে যেমন মনের মধ্যে উত্তমকুমারের নাম জেগে ওঠে, তেমনি জেগে ওঠে ময়রা স্ট্রিটের নাম। তাই নির্দিষ্ট সন্ধ্যায় যখন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে তাঁর কাছে গিয়ে বসি, তখন শুরুতেই ময়রা স্ট্রিটের প্রসঙ্গটাই উঠে আসে।
হালকা শীত। সামান্য জ্বর হয়েছিল আগের দিন। সুপ্রিয়া দেবী এলেন গায়ে একটা হালকা চাদর জড়িয়ে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকল ‘‌কোকো’‌। ভোডাফোন-‌খ্যাত কুকুর—পাগ। তারও গায়ে হালকা শীতের পোশাক পরানো। কোকো এসে এবাড়ির নতুন অতিথিকে শুঁকে শুঁকে গিয়ে বসল সোফায়, ঠিক সুপ্রিয়া দেবীর কোল ঘেঁসে। সুপ্রিয়া দেবী বললেন—বলো।
• ময়রা স্ট্রিটে থাকেন না বহু বছর। এখন তো নতুন বাসস্থান। ৩ নম্বর ময়রা স্ট্রিটের জন্যে মনখারাপ করে না?‌
•• মনখারাপ তো হয়-‌ই। কত কত দিন, কত বছর ওখানে থেকেছি তোমাদের দাদার সঙ্গে। (‌উত্তমকুমারকে তিনি তোমাদের দাদা বলাতেই অভ্যস্থ, এখনও। যদিও উত্তমকুমারকে দাদা বলার সুযোগ এই প্রতিবেদকের হয়নি।)‌ ময়রা স্ট্রিট বললেই তো বাঙালিদের উত্তমকুমারের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু সেই মানুষটাই নেই ৩৬ বছর হয়ে গেল। সেই মানুষটাকে নিয়েই তো ছিল আমাদের বাড়ি। মানুষটা যে কত দূরে চলে গেছে!‌ ভেতরটা শূন্য হয়ে আছে ৩৬ বছর।
(‌কথা বলতে বলতেই আঙ্গুল তুলে দেখালেন দেওয়ালের দিকে। ‘‌ওই দেখো, আমাদের বিয়ের ছবি’‌। দেখি, পেছনের দেওয়ালে টাঙানো সহাস্য যুগল ছবি। উত্তম-‌সুপ্রিয়া। দুজনের গলাতেই বিয়ের মালা।)‌
• উত্তমকুমারের নায়িকা হবেন বলেই কি সিনেমায় অভিনয় করতে এসেছিলেন?‌
•• আরে না, না। বাঁচার জন্যে এসেছিলাম (‌হাসতে হাসতে)‌। ওই যে ঋত্বিকদার ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌য় আমার একটা সংলাপ ছিল, ‘‌দাদা, আমি বাঁচতে চাই’‌, মনে আছে?‌
• মনে থাকবে না?‌ এই সংলাপ তো অমর হয়ে আছে। আজও অনেকেই আপনাকে ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র নীতা বলতেই ভালবাসেন।
•• শোনো, তোমাদের উত্তমকুমারকে আমি সিনেমায় আসার অনেক আগে থেকেই চিনি। আমরা তখন উত্তমের পাড়া গিরিশ মুখার্জি রোডে থাকি। আমার দুই দাদার বন্ধু ছিল উত্তম। ওদের সঙ্গে আমাদের বাড়ির লনে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসত তোমাদের দাদা। তখন থেকেই উত্তমকে চিনি। আর কী আশ্চর্য দেখো, তোমাকে যে ডায়লগটা বলছিলাম, ‘‌দাদা, আমি বাঁচতে চাই’‌, আমার প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি ‘‌বসু পরিবার’‌-‌এ উত্তম ছিল আমার দাদার ভূমিকায়।
• বাঁচার জন্যে সিনেমায় এসেছিলেন, এটা বললেন কেন?‌
•• আমরা তো বার্মায় (‌এখনকার মায়নমার)‌ থাকতাম। আমার বাবা ছিলেন অ্যাডভোকেট। ওখানে ভাল পসার, ভাল টাকা পয়সা উপার্জন করেছিলেন। নিজেদের সুন্দর বাড়ি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওখানে তাণ্ডব শুরু হল। সব ফেলে আমাদের নিয়ে বাবা চলে এলেন কলকাতায়। আমরা ভাইবোন তো কম ছিলাম না। আমরা ৮ বোন, তিন ভাই। আমি সবচেয়ে ছোট। কলকাতায় এসে গুছিয়ে নিতে বাবার একটু সময় লেগেছিল। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় আমরা থেকেছি। তার মধ্যে গিরিশ মুখার্জি রোডও আছে। আমার দিদিরা সবাই শিক্ষিত। কেউ এম এ, কেউ ডবল এম এ। আমরা চার বোন ছাড়া বাকি সব ভাইবোনকে বাবা শান্তিনিকেতনে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। অন্য দিদিরাও স্কুল, কলেজে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু আমি কখনও স্কুলে যাইনি।
• সে কী?‌ আপনি তো তাহলে রবীন্দ্রনাথের মতো স্কুলে না গিয়েও শিক্ষিত?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ এই বুড়ো বয়সে আর হাসিও না। আমি বাড়িতেই পড়াশোনা করেছি। বাবার ছিল প্রচুর বই। গল্প, উপন্যাস পড়তেই ভালবাসতাম। একবার বাবা চেয়েছিলেন প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ানোর। কিন্তু সেভাবে জোর করেননি। পরীক্ষাও দেওয়া হয়নি। বাবা তো আমার সাত দিদির ভালভাবে বিয়ে দেন। একদিন শুনতে পেলাম, মা-‌কে বাবা বলছেন, আর আমার টাকা নেই। কী করে বেনুর বিয়ে দেব?‌ এই কথা শুনে খুব ছোট মনে হল নিজেকে। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবই। ওই যে, বললাম, ‘‌আমি বাঁচতে চাই’‌—এটা তখনই ভেবেছিলাম।
• বাঁচার রাস্তাটা, মানে, সিনেমায় অভিনয়ের রাস্তাটা কীভাবে তৈরি করলেন?‌
•• আমার বড় জামাইবাবু সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মানে, বনফুল। ওঁর ভাই ঢুলুদা (‌অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়)‌ ছিলেন চিত্রপরিচালক। তাঁর সঙ্গেই প্রথম স্টুডিও-‌য় যাই। কিন্তু সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগটা করে দিয়েছিলেন চন্দ্রাবতী দেবী।

আমি স্কুলে পড়াশোনা না করলেও নাচটা শিখেছিলাম যত্ন করে। আর, স্বপ্ন দেখতাম নায়িকা হওয়ার।
• প্রথমেই কি ‘‌বসু পরিবার’‌-‌এ সুযোগ পেলেন?‌
•• প্রথমে ‘‌নাগপাশ’‌ বলে একটা ছবির শুটিং করেছিলাম টানা চারমাস। ওটা বন্ধ হয়ে গেল প্রোডাকশন কোম্পানিটাই উঠে যাওয়ায়। তারপর ‘‌বসু পরিবার’‌। এখানেই উত্তম আমার দাদার ভূমিকায় পার্ট করেছিল।
• আপনার আসল নাম ‘‌বেনু’‌, না, ‘‌সুপ্রিয়া’‌?‌
•• বেনু-‌ই আমার আসল নাম। আর এক বেনু, মানে বেনুদা, পরিচালক নীরেন লাহিড়ী আমার নাম রাখতে চেয়েছিলেন কাবেরী। পরে নিজেই বললেন, তুমি কৃষ্ণা নামে অভিনয় করবে। কিন্তু আমার দিদির মেয়ের নাম কৃষ্ণা শুনে উনি চিন্তায় পড়লেন। তখন সমস্যার সমাধান করে দিয়ে পাহাড়িদা (‌পাহাড়ি সান্যাল)‌ বলে উঠলেন, ‘‌শোন, তোর নাম দিলাম সুপ্রিয়া’‌। ব্যাস, আমি সুপ্রিয়া হয়ে গেলাম। আর, বেনুকে বাঁচার রাস্তা দেখিয়ে দিল ওই সুপ্রিয়া-‌ই।
• হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে, আপনি আর উত্তমকুমার যতগুলো ছবি করেছেন, সুচিত্রা সেন আর উত্তমকুমার জুটির ছবির সংখ্যাও প্রায় ততগুলোই। ৩০টা করে ছবি। তবুও, উত্তম-‌সুচিত্রা জুটি নিয়ে দর্শকদের যে আগ্রহ, উন্মাদনা, সেটা আপনাদের জুটি নিয়ে হয়নি। হিংসে হয়?‌
•• (‌সামান্য হেসে)‌ আজ তো একেবারেই হয় না। অভিনেত্রীরা সবাই বোধহয় সবার প্রতিযোগী-‌ই হয়। কিন্তু উত্তম-‌সুচিত্রা জুটি পৃথিবীতে বোধহয় একবারই হয়। আর হয়নি। হবেও না। ওটা ‘‌মিথ’‌ হয়ে গেছে।
• সম্প্রতি ‘‌মহানায়ক’‌ সিরিয়াল নিয়ে নানারকম আলোচনা হয়েছে। আপনি দেখেছেন?‌
•• এক-‌দু’‌দিন দেখেছি। লোকের মুখ থেকে শুনেছি অনেক বেশি। আমার মনে হয়েছে, এটা ঠিক কাজ হয়নি। রমাদি (‌সুচিত্রা সেন)‌ ছিলেন ভীষণ প্রাইভেট পার্সন। তাঁকেও ঠিকভাবে দেখানো হয়নি। আমার চরিত্রটাও কি ঠিকঠাক হয়েছে? মহানায়কের সংগ্রামটাই বা কোথায়?‌‌
• আপনার সঙ্গে উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরীদেবীর সম্পর্ক কেমন ছিল?‌
•• আমি ওঁকে ‘‌বড় গিন্নি’‌ বলে ডাকতাম, শ্রদ্ধা করতাম। আমার সঙ্গে উত্তমের বিয়ের পরেও ও কখনও বড়গিন্নিকে অবহেলা বা অসম্মান করেনি। গৌতম (‌উত্তমকুমারের ছেলে)‌ ছিল আমার ছেলের মতো। বড় অসময়ে চলে গেল গৌতম।
• কিছুদিন আগে ‘‌দাঙ্গা’‌ ছবিতে আপনি অভিনয় করলেন স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী যোগমায়া দেবীর চরিত্রে।
•• হ্যাঁ, ছোট চরিত্র, কিন্তু ভাল লেগেছে। এখনও অনেকে আসেন অভিনয়ের ‘‌অফার’‌ নিয়ে। কিন্তু অভিনয়ের সুযোগ না থাকলে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না। ভাল চরিত্র পেলে এখনও অশক্ত শরীরে উঠে দাঁড়াতে পারি ক্যামেরার সামনে।
• সারাদিন কীভাবে কাটান?‌
•• বই পড়ে। তোমাদের দাদাকে বই পড়ার নেশা কিন্তু আমিই ধরিয়েছিলাম।
• কী বই পড়েন?‌
•• আবার নতুন করে শরৎ-‌সাহিত্য পড়ছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও পড়ছি। কিন্তু আমাকে এখনও টানেন শরৎচন্দ্র।
• বন্ধুবান্ধব কেউ আছেন, যার সঙ্গে আড্ডা দিতে পারেন?‌
•• দেখো, ইন্ডাস্ট্রিতে আমার একজন-‌ই বন্ধু ছিলেন—উত্তমকুমার। তাঁর সঙ্গে ঘর করেছি। সে আমার ভেতরেই আছে। কিন্তু বাস্তব জগতে আমার এখন শুধুই একজন বন্ধু। আমার ১৪ বছর বয়স থেকে সে আমার প্রাণের বন্ধু। আগে ছিল সীমা রায়। এখন সে সীমা মৈত্র। ইচ্ছে হলে সে আমার বাড়ি আসে, আমিও তার হালতুর বাড়িতে যাই। আমার প্রাণের কথা তার সঙ্গেই। আর আমাকে একজন সঙ্গী দিয়ে গেছে তোমাদের উত্তমকুমার।
একথা বলার সময় আমাদের জন্যে জল আর চা নিয়ে এলেন এক প্রবীনা। তাঁর দিকে তাকিয়ে সুপ্রিয়া দেবী বললেন, এই হল আমার সেই সঙ্গী, তারা। তারাসুন্দরী। উত্তম বলেছিল, বেনু, তারাকে রেখে দিও সারাজীবন। দাদার কথা মেনে আমার সঙ্গেই থেকে গেছে তারা।
সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে। সুপ্রিয়া দেবী বললেন, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিয়মিত খোঁজখবর করেন। সম্মান দেন। ভালবাসেন। এই প্রাপ্তিটা কি কম?‌
অনেকক্ষণ কথা হল। বলি, এবার আপনি বিশ্রাম নিন।
সুপ্রিয়া দেবী বললেন, তোমাদের দাদার কাছে যেদিন যাব, সেদিন আমার পুরোপুরি বিশ্রাম মিলবে। কী বলিস তারা?‌
প্রবীনা তারাসুন্দরী বলে ওঠেন, ভর সন্ধ্যেবেলায় বাজে কথা বোলো না তো!‌
মেঘ সরিয়ে হেসে ওঠেন ঋত্বিক ঘটকের নীতা, উত্তমকুমারের বেনু, বাঙালি দর্শকদের প্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী। হ্যাঁ, তাঁর হাসিটা আজও অমলিন।‌

শুটিংয়ের আগে ফাইনাল টাচ। ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ। ‌‌সেই সাক্ষাৎকারের সময় কোকো‌র সঙ্গে।ছবি :‌ অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

জনপ্রিয়

Back To Top