অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’, এই সংলাপকে যিনি অমরত্ব দিয়েছেন, ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র সেই নীতা, তথা সুপ্রিয়া দেবী সত্যিই চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাংলা ছবির দর্শকের কাছে, বাঙালির কাছে। শুক্রবার সকালে বাংলা ছবির চির–উজ্জ্বল সেই অভিনেত্রী আচমকাই চলে গেলেন, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে। বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। বার্ধক্যজনিত অসুবিধে ছিল শরীরে। কয়েক বছর আগে প্রতিস্থাপিত হয়েছে হাঁটু। চলাফেরার জন্যে ব্যবহার করতেন ওয়াকার। সকালে সেই ওয়াকার নিয়ে গিয়েছিলেন বাথরুমে। বাথরুম থেকে ফেরার সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মেয়ে সোমাকে ডাকেন। তার পর বিছানায় শুয়ে পড়েন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন মেয়ে। ডাক্তারকে খবর দেওয়া হল। কিন্তু ডাক্তার আসার আগেই যেন নিজের শর্তেই এই জীবন ছেড়ে চলে গেলেন সুপ্রিয়া দেবী, যিনি জীবনে এবং অভিনয়ে বেঁচে থেকেছেন নিজের শর্তেই। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে জানালেন, ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।
গত ৮ জানুয়ারি নিজের ৮৫ বছরের জন্মদিন পালন করেছেন নাতি শনের সঙ্গে। ১৮ দিন পরে ছুটি নিলেন জীবন থেকে। কিছু দিন আগেই মহরত করেছেন ‘‌জীবনখাতা’‌ ছবির, যেখানে তাঁর সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন স্বর্ণযুগের আরও দুই অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী চক্রবর্তী। ‘জীবনখাতা’ অসম্পূর্ণ থেকে গেল সুপ্রিয়া দেবীর, কিন্তু জীবনে এবং অভিনয়ে সম্পূর্ণতাকে তিনি ছুঁয়েছেন নিজের শর্তেই। তাই সেই ১৯৫৯ সালে ‘‌আম্রপালী’‌ ছবিতে নগর–নটীর ‘‌সাহসী’‌ পোশাক পরে তৎকালীন সমাজে বিতর্ক তোলার পরের বছরেই তিনি আবিষ্কৃত হলেন ঋত্বিক ঘটকের ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র নিম্ন–মধ্যবিত্ত, গ্ল্যামার–বর্জিত নীতার চরিত্রে। যে চরিত্রের বাঁচতে চাওয়ার আর্তি সমস্ত বিতর্কে জল ঢেলে দর্শকদের চিনিয়ে দিয়েছিল এক গভীরতা–স্পর্শী অভিনেত্রীকে। শিল্পের কাছে যেমন, জীবনের কাছেও তিনি ছিলেন নিজের শর্তেই দায়বদ্ধ। তাই স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরিকে ডিভোর্স দিতে দ্বিধা করেননি। উত্তমকুমারের সঙ্গে নিজের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে যৌথ জীবন কাটাতে কোথাও কোনও সঙ্কোচ রাখেননি। বরং এই সম্পর্ককে সম্মান করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, উত্তমকুমার চলে যাওয়ার ৩৮ বছর পরেও।
এই অনন্য অভিনেত্রীকে সম্মান জানাতে অকুণ্ঠ ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ২০১১ সালে তাঁকে দিয়েছেন ‘‌বঙ্গবিভূষণ’‌ সম্মান। সেই বিখ্যাত ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল সুপ্রিয়া দেবীকে। তাঁকে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সরকারি আবাসনে সসম্মানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন মুখ্যমন্ত্রীই। শুক্রবার ছিল সাধারণতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠান শেষ করেই মুখ্যমন্ত্রী চলে আসেন সুপ্রিয়া দেবীর বাসভবনে। যেভাবে সুপ্রিয়া–কন্যা সোমার পাশে এসে দাঁড়ালেন, যেন নিজেও মেয়েরই ভূমিকা পালন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই উজ্জ্বল অভিনেত্রীর শেষ যাত্রার সব সুচারু পরিকল্পনাই মুখ্যমন্ত্রীর। বললেন, স্বর্ণযুগের স্বর্ণ–শিল্পী ছিলেন তিনি। শুধু বাসভবনেই নয়, যখন বিকেলে রবীন্দ্রসদনে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে রাখা হল সুপ্রিয়া দেবীর মরদেহ, তখনও এলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবং রবীন্দ্রসদন থেকে কেওড়াতলা শ্মশান পর্যন্ত শোকযাত্রার সামনেও সেই মুখ্যমন্ত্রী। সারাটা পথ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হেঁটে গেলেন তিনি। সুপ্রিয়া দেবীর জীবনখাতা সম্পূর্ণতা পেল শেষযাত্রায়, এমন বিনম্র শ্রদ্ধায়।
শুক্রবার সকালে সুপ্রিয়া দেবীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁর বাসভবনে আসেন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আসেন এই সময়ের সেরা জুটির দু’‌জনেই— প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন তো ছিলেনই, ছিলেন আরও মন্ত্রী শোভনদেব চ্যাটার্জি, শোভন চ্যাটার্জিও।
এলেন সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন। পাশে দাঁড়ালেন সুপ্রিয়া–কন্যা সোমার। সুচিত্রা সেন এবং সুপ্রিয়া দেবী— দু’‌জনেই উত্তমকুমারের সঙ্গে ৩০টি করে ছবি করেছেন। কিন্তু রোম্যান্টিক জুটিতে উত্তম–সুচিত্রাকে কেউ হারাতে পারেনি। সে কথা সুপ্রিয়া দেবীর চেয়ে ভাল কে–ই বা জানবেন!‌ ‘‌আজকাল’‌–এই এক সাক্ষাৎকারে গত বছর সুপ্রিয়া দেবী বলেন, ‘‌শুধু বাংলায় নয়, উত্তম–সুচিত্রা জুটি পৃথিবীতে বোধহয় একবারই হয়। আর হয়নি। হবেও না। ওটা মিথ হয়ে গেছে।’‌ অন্য অভিনেত্রীকে নিয়ে এমন অকপট সত্য বলছেন সমকালীন এক অভিনেত্রী, এই দৃষ্টান্তও বোধহয় সুপ্রিয়া দেবীই রাখতে পারেন। সুপ্রিয়া–কন্যার পাশে তাই তাঁর চলে যাওয়ার দিনে সবচেয়ে আগে এসে দাঁড়ান সুচিত্রা–‌কন্যা। সঙ্গে ছিলেন সুচিত্রা সেনের নাতনি রাইমাও।
সুপ্রিয়া দেবী কন্যা সোমা–সহ রেখে গেলেন তিন নাতি–নাতনি শন, নীল ও তুলিকে। রেখে গেলেন অসংখ্য অনুরাগীকেও, যাঁরা ভুলবেন না সেই ‘‌বসু পরিবার’‌ থেকে যাত্রা শুরু করা এক অনন্য অভিনেত্রীকে, যিনি ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌, ‘‌কোমল গান্ধার’‌, ‘‌মন নিয়ে’‌, ‘‌জীবন জিজ্ঞাসা’‌, ‘‌বনপলাশীর পদাবলী’–সহ একের পর এক ছবিতে আলো ছড়িয়েছেন দর্শকদের কাছে।
রবীন্দ্রসদনে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অনুরাগীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানে ৩ ঘণ্টা রাখা হয় তাঁর মরদেহ। বাড়িতে, রবীন্দ্রসদনে বা শ্মশানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নানা ক্ষেত্রের বিশিষ্টরা। বর্ষীয়ান ললিতা চট্টোপাধ্যায় থেকে দেবশ্রী রায়, অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় থেকে লকেট চট্টোপাধ্যায় এলেন শ্রদ্ধা জানাতে। গৌতম ঘোষ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর চক্রবর্তী, চৈতি ঘোষাল, দেবিকা মুখার্জি, দেবদূত ঘোষ এলেন। ছিলেন মন্ত্রী অরূপ রায়। উত্তমকুমারের নাতি–নাতনি গৌরব, নবমিতা এসে প্রণাম জানালেন। আর্টিস্টস ফোরামের হয়ে শ্রদ্ধা জানালেন অরিন্দম গাঙ্গুলি, শিল্পী সংসদের পক্ষে সাধন বাগচী।
কেওড়াতলা শ্মশানে গান স্যালুট দিয়ে সম্মান জানানো হল প্রয়াত অভিনেত্রীকে। আর রবীন্দ্রসদন থেকে কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে সুপ্রিয়া দেবীর শেষযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর পাশে বহু মানুষ। ছিলেন ইন্দ্রনীল সেন, অরিন্দম গাঙ্গুলি। হাঁটতে হাঁটতে মুখ্যমন্ত্রী গাইছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান। গলা মেলালেন সবাই— আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।
বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গেল পথের দু’‌ধারে দাঁড়ানো মানুষজনকে। বিদায়, বেণুদি।

 

 

সুপ্রিয়া দেবী। জন্ম: ৮ জানুয়ারি ১৯৩৩
মৃত্যু: ২৬ জানুয়ারি ২০১৮

জনপ্রিয়

Back To Top