অদিতি রায়: • কেমন আছেন, কোন কাজে ব্যস্ত?‌
•• এক্সেলেন্ট আছি। থিয়েটার এবং ধারাবাহিক চলছে। অঞ্জন দত্তর সঙ্গে ‘সেলসম্যানের সংসার’‌ নাটক নিয়ে খুব ব্যস্ত। আর ‘দেবী চৌধুরানি‌’‌ ধারাবাহিকটা তো আছেই। সেখানে ‘‌গোবরার মা’‌ বলে যে চরিত্রে আছি, সেটা সাহিত্যে সেভাবে নেই। কিন্তু আনন্দ মঠের ‘‌শান্তা’‌ চরিত্রটা নিয়ে এটা ক্রিয়েট করা হয়েছে। যে ইউনিটটায় কাজ করছি সেটা চমৎকার।
• আপনি ‘‌দেবী চৌধুরানি’‌-‌তে নিশি হয়েছিলেন না?
•• হ্যাঁ, সে তো বহুদিন আগে দূরদর্শনের জন্য করেছিলাম। মুনমুন (সেন‌)‌ করেছিল প্রফুল্ল, দেবরাজ রায় ভবানী পাঠক।‌
• এই যে আপনি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছেন, কী ফারাক টের পান?‌
•• পুরোটাই অন্যরকম। কারণ এখন প্রচুর কাজ হয়, আর খারাপ কাজ হয়!‌ তখন অনেক যত্ন নিয়ে কাজ হত, সময়টাও অনেক বেশি পেতাম। যদিও এখন বুম্বাদার (‌প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়)‌ হস্তক্ষেপে ১২ ঘণ্টার মধ্যে কাজ হচ্ছে। মাঝখানে তো ২০ ঘণ্টা কাজ হত, তাতে গুণগত মান বজায় রাখা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু আমি তো চলতি হাওয়ার পন্থী। সময়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারি। আমি যে এখনও টিকে আছি, এটা ভাবতে ভাল লাগে, এনজয়ও করি।
• কাজের পরিবেশ বদলেছে?‌
•• পরিবেশ এখন একটাই, ভারচুয়াল পৃথিবীতেই সবাই বাস করে। মাথা নিচু, মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ, হাতের আঙুল সক্রিয় স্ক্রিন প্যাডে। আমি স্মার্টফোন ব্যবহার করিনা, তাই কাজের ফাঁকে আমার সঙ্গী বই। ‘এক আকাশের নিচে‌’‌ যখন করতাম, তখন সেটে যাওয়ার জন্য একটা আগ্রহ থাকত, নিজের পরিবারে যাওয়ার জন্য যেমন থাকে। বিকেলে কলটাইম থাকলেও দুপুরে পৌঁছে যেতাম, সবাই একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করব বলে। আর এখন ১-‌টার পর কলটাইম থাকলে, বলেই দেওয়া হয়— ‘‌লাঞ্চ করে আসবেন’‌। গল্প করার মত লোকজন কোথায়?‌ বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আছে, ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আছে ঠিকই, তবে ওরা ওদের মত থাকে, আমি একটা একলা ঘরে আমার মতো খাইদাই, বই পড়ি।
• আপনি তো থিয়েটার পরিচালনাও করলেন.‌.‌.‌‌
•• হ্যাঁ, ‘কন্টিনিউটি‌’‌। তবে এখন ওটার শো আর হচ্ছেনা, হবে কী করে?‌ আমি ভীষণ ভাবে বরণীয়দের মধ্যে একজন, ‘‌ব্রাত্য’‌ নই (হাসি‌)‌!‌ কাজেই আমার পক্ষে থিয়েটার-‌হল পাওয়া খুব কঠিন। তবে ইন্টিমেট স্পেসে আবার নতুন কাজ শুরুর কথা ভাবছি। আপাতত অঞ্জন দত্তর সঙ্গে কাজ করছি, খুব ভাল লাগছে। যিনি আমার গুরু, এই বয়সে এসে তাঁর থিয়েটারে ‘লিন্ডা‌’‌র মতো একটা চরিত্র পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের বিষয়।
• অঞ্জন দত্ত আপনার গুরু?‌
•• আমার অভিনয় শুরুই ওঁর হাতে। ’‌৯৩-‌’‌৯৪ হবে সময়টা। ‘‌ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’‌র অ্যাডাপ্টেশন করছিলেন উনি। আমি ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছিলাম। সেই আমার সিরিয়াস থিয়েটারে হাতেখড়ি। তারপর অঞ্জনদাই আমাকে মেঘনাদ ভট্টাচার্যর কাছে নিয়ে যান। শুরু হয় ‘বাসভূমি‌’‌-‌তে কাজ। তখন আমি তাজবেঙ্গলে হাউস কিপিং সুপারভাইজারের চাকরি করতাম। বেশ ভাল স্যালারি পেতাম। মেঘনাদদা বললেন ‘বাসভূমি‌’‌র এই চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে তোমাকে চাকরিটা ছাড়তে হবে। দিলাম ছেড়ে !‌
• একবারও ভাবেননি?‌
•• নাঃ। তখন আমার বড়জোর ২৪। ওই বয়সটাই তো ভুল করার বয়স, ঝুঁকি নেওয়ার বয়স। এখনও পারি। সেইজন্যই ধারাবাহিকে এত কম কাজ করি। ফিতে কাটিনা বা মাচা করিনা। কম পয়সাতে চলে যায়, স্বস্তিতে থাকা অনেক জরুরি। 
• এখনকার ধারাবাহিক নিয়ে আপনার কী বক্তব্য?‌
•• এত দেব দেবী ছিল আমরা জানতাম?‌ হিন্দুত্বে ম ম করছে চতুর্দিক। আমি নিজে পুজোআচ্চা করি, কিন্তু এগুলো সহ্য হচ্ছেনা, খুব খারাপ দিন আসছে। বাংলা ছবির অবস্থা এর থেকে অনেক ভাল।
• এখন সিনেমাতে একদম দেখা যায় না কেন আপনাকে?‌
•• ডাকেনা তো!‌ সবাই বলে আমার মতো চরিত্রই নাকি নেই। তারা খুঁজেই পায়না। শিবপ্রসাদ থেকে কৌশিক গাঙ্গুলি সবাই লজ্জিত হয়ে আছে, কিন্তু পার্ট দিচ্ছেনা। সৌকর্য (ঘোষাল‌)‌ যেমন কাজ দিল, প্রতীম ডি গুপ্তার সঙ্গেও কাজ করলাম। আর সমস্ত চরিত্রে অপরাজিতা আঢ্য যদি অভিনয় করে আমি কী করব বলুন!‌ মা, মাসি, ননদ, দেওর, বৌদি— সব চরিত্রেই অপরাজিতা!‌ একসময় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ছিল, আর্ট, কমার্শিয়াল, সেমি, প্যারালাল, কমেডি, অ্যাকশন, হাসি, কান্না, সব ঋতুপর্ণা, আর সেই করতে করতে আজ ‘শাহজাহান রিজেন্সি‌’‌-‌তে এসে বীণা বাজাচ্ছে!‌ বরং ইদানীং স্বস্তিকার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ। ‘শাহজাহান রিজেন্সি‌’‌-‌তে খুব ভাল করেছে।
• বাংলা ছবিতে একদম হাতে গোনা আর্টিস্ট, যাঁরা বেশিরভাগ ছবিতে কাজ করছেন, এ নিয়ে কোনও বক্তব্য?‌
•• বিশেষ একটি প্রযোজনা সংস্থার  প্রভুত্ব স্বীকার করার কারণেই একটা গ্রুপ বেশি কাজ পাচ্ছে। এছাড়া আদান-‌প্রদান আর অন্যান্য আপোস তো আছেই। এখানে যোগ্যতার বিচারে কাজ পাওয়া যায়না। 
• আপনার এই কথাবার্তায় তো সবাই চটে যাবে!‌
•• একটা সময় জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমার প্রিয় পুরুষ কে, সবাই বলেছে ‘বাবা‌’‌!‌ প্রিয় পুরুষ নাকি বাবা!‌ (‌হাসতে হাসতে)‌ হতে পারে কখনও?‌ আমার এত দুরবস্থা হয়েছে?‌ আমি বলেছিলাম বেহিসাবী প্রতিভাবান পুরুষ। জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রিয় নেশা কী?‌ ডোনা গাঙ্গুলি বলেছিল নৃত্য, আমি বলেছিলাম মদ্যপান!‌ তাতে আমার কী এসে যায়!‌
• সুদীপা বসুর বেপরোয়া জীবন যাপন, বিয়ে, ডিভোর্স, একাধিক প্রেম— কত বিতর্ক। ‘‌আজকে যে বেপরোয়া বিচ্ছু/‌ শান্ত সুবোধ হবে কাল সে’‌— এই কথাটা তো আপনার ক্ষেত্রে মোটেও খাটেনা দেখছি!‌
•• শান্ত-‌সুবোধ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আজও নেই। লোকনাথ বাবার জীবনী পড়িনা, অবসরে ‘‌লোলিটা’‌ পড়ি। প্রেম তো এখনও করি, তবে অতটা সোচ্চারে নয়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডিগনিটিটাও তো রাখতে হয়। কিন্তু সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই বাঁচি। আর হ্যাঁ, কোনও রকম লুকোছাপা করবেন না, যা বলেছি সব লিখবেন (‌হাসি)‌। 

ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top