অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে বোকা বাক্সতে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, বহু বছর আগে ‘‌মহীনের ঘোড়াগুলি’‌র গানে লিখেছিলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায়। আর এখন, লকডাউনের চাপে, তিন মাসের দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে শ্বাস নেওয়ার জন্যে, বাংলা থিয়েটার মুক্তির সাময়িক পথ খুঁজে নিয়েছে ফেসবুকে, ইউটিউবে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। বাংলা থিয়েটার যেন এই তিন মাসে হয়ে উঠল সিনেমার মতো, যা বড় পর্দায় নয়, দেখা যাচ্ছে হাতে ধরে রাখা স্মার্টফোনে। দর্শক যদি এতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন, তাহলে, যখন আবার খুলবে থিয়েটার হল, তখন কি দর্শকরা যেতে চাইবেন না আকাদেমি, মধুসূদন, তপন কি গিরিশ মঞ্চে?‌
একদা চপলরানী হিসেবে জনপ্রিয় চপল ভাদুড়ী অভিনীত নাটক ‘‌সুন্দর বিবির পালা’‌ দেখানো শুরু হয়েছে ‘‌মাই সিনেমাহল ডট কম’‌–‌এ। ৫০ টাকার টিকিট কেটে মোবাইল ফোনে দেখা যাবে শেখর সমাদ্দার নির্দেশিত ‘‌আভাষ কলকাতা’‌র এই নাটক। কলকাতার মঞ্চে বহুবার অভিনীত হয়েছে এই নাটক। এখনও চপল ভাদুড়ীর টানে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে দেবেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু থমকে থাকা এই সময়ে ইন্টারনেটে এই নাটকটি দেখানোর ব্যবস্থা করে কিছুটা স্বস্তিই যেন পেলেন পরিচালক। শেখর বললেন, দর্শকরা যদি বেশি করে দেখেন এই নাটক, তাহলে এরপর রবীন্দ্রনাথের ‘‌গোরা’‌কে তঁারা এভাবেই ইন্টারনেটে পৌঁছে দেবেন, যেখানে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দেবশঙ্কর হালদার।
বাংলা মঞ্চের অতি জনপ্রিয় নাট্যকার, পরিচালক ও অভিনেতা ব্রাত্য বসুর লেখা অন্তত ৬টি নাটক এই লকডাউনের মধ্যে ব্রাত্যজনের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে দেখানো শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্রাত্য বসুর পরিচালনায় ‘‌বোমা’‌, ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌ এবং ‘‌কে?‌’‌ এছাড়া পৃথ্বীশ রানার পরিচালনায় ‘‌গ্যাঙ’‌। এই চারটি নাটকই কালিন্দী ব্রাত্যজনের। এছাড়া আছে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘‌আয়ন্দা’‌র প্রযোজনা ‘‌অনুশোচনা’‌, দেবাশিস পরিচালিত থিয়েটার প্ল্যাটফর্মের ‘‌ইলা গূঢ়ৈষা’‌। এই দুটি নাটক ব্রাত্য বসুর লেখা।
আজ রবিবার, রবীন্দ্রনাথের ‘‌ডাকঘর’‌কে মিউজিক্যাল নাটকের আঙ্গিকে অফবিট সিসিইউ ডট কমে নিয়ে আসছেন পরিচালক অভ্রজিৎ সেন। এখানে প্রধান দুটি চরিত্রে আছেন অভিনেতা পিতা–‌পুত্র শান্তিলাল ও ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়।
কলকাতা ও জেলার অনেক নাট্যদলই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেই ব্যবহার করছেন থিয়েটারের দর্শকদের জন্য। অশোকনগর নাট্যমুখ ইউটিউবে নিয়ে এসেছে তাদের ‘‌তিতলি’‌ এবং স্বপনকুমার অবলম্বনে তাদের জনপ্রিয় নাটক ‘‌রাতবিরেতের রক্তপিশাচ’‌। দলের পরিচালক অভি চক্রবর্তী ভাবছেন দলের অন্য নাটকও ইউটিউবে দেওয়ার কথা।
নাটক যখন সিনেমার মতো হয়ে ঢুকে পড়ছে মোবাইলের পর্দায়, তখন নিজেই একটা থিয়েটারের অ্যাপ খোলার কথা ভাবছেন হাওড়ার নটধা নাট্যদলের অর্ণ মুখোপাধ্যায়। এই অ্যাপের নাম দেওয়া হয়েছে ‘‌থিয়েপ্লেক্স’‌। অর্ণ জানালেন, এখানে বহু নাট্যদলের জনপ্রিয় প্রযোজনা আপলোড করা হবে। অনেকেই রাজি হয়েছেন। ব্রাত্য বসুর ‘‌তিস্তা’‌ নাটকটিও এখানে দেওয়া হবে, যেখানে অর্ণ অভিনয় করেছেন শতাব্দী রায়ের সঙ্গে।
অনেক জনপ্রিয় নাটক এই তিন মাসে চলে এল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। লকডাউনের অনেক আগেই এইসব নাটকের ভিডিও করে রাখা ছিল। নাটকের ভিডিও করা হয় মূলত ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় (‌এনএসডি)‌ পাঠানোর জন্যে। ভিডিও দেখে বিবেচিত হলে এনএসডি–‌র উৎসবে আমন্ত্রিত হয় ওই নাটক। এ ছাড়া, ‘রংরূপ’‌ নাট্যদলের পরিচালক সীমা মুখোপাধ্যায় বললেন, অনুদান পাওয়ার জন্যেও নাটকের এই ভিডিও সরকারের কাছে পাঠাতে হয়। কিন্তু তিনি ইউটিউবে নাটক দেওয়ার পক্ষপাতী নন। কারণ, ‌সীমা মনে করেন, থিয়েটার ইউটিউবে দেখলে খাটো হয়ে যায় থিয়েটারের মাপ। একই মত মেঘনাদ ভট্টাচার্যের। যিনি একই সঙ্গে পনেরো–‌কুড়িটা থিয়েটারের প্রধান অভিনেতা হিসেবে মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ান, সেই দেবশঙ্কর হালদার মনে করেন, এটা একটা আপৎকালীন ব্যবস্থা। যে সব নাটক ইউটিউবে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সবই দর্শকরা দেখেছেন। যাঁরা সেসব দেখেননি, যাঁরা ইউটিউবেই প্রথম দেখবেন, তাঁরা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবেন। তিন মাস নাটকের মঞ্চ থেকে দূরে থেকে হাঁফিয়ে উঠেছেন দেবশঙ্কর। কবে পাটাতনের ওপর উঠে, দর্শকদের শ্বাস–‌প্রশ্বাসের শব্দ পেতে পেতে আবার সংলাপ বলবেন তিনি, এখন তারই অপেক্ষা।
ব্রাত্য বসুও মনে করেন, দুধের স্বাদ কখনও ঘোলে মেটে না। বললেন,‘‌যদিও আমাদের নাটকগুলো প্রায় সিনেমার মতো প্রযুক্তি দক্ষতা দিয়েই শুট করা হয়েছে। নাটকের ভিডিও করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার মধ্যে সংরক্ষণের ব্যাপারটাই মুখ্য। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যে সব নাটকের শো হবে, যেমন ‘‌মীরজাফর’‌, বা ‘‌সিনেমার মতো’‌, যেগুলো ইউটিউবে দেওয়া হয়নি। বোমা–‌র সেট আমরা ভেঙে ফেলেছি, আর শো হবে না। তাই ইউটিউবে দিয়েছি।’‌
ইউটিউবে দেখলে কি মোহভঙ্গ হবে না দর্শকদের?‌ তারা যদি আর থিয়েটার হলে আসতে না চান?‌
ব্রাত্যর সোজাসাপটা উত্তর— ইউটিউবে দেখে যাদের সাধ মিটবে বা মোহভঙ্গ হবে, তারা যদি থিয়েটার হলে না যান, তাহলে বুঝতে হবে, তারা কোনও কালেই থিয়েটার দেখতে যেতেন না। তাদের নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই।
আর, এই পরিস্থিতি তো বিশ্বে প্রথম, জন্মে প্রথম। একই অভিমত মেঘনাদ থেকে সীমা থেকে ব্রাত্য, দেবশঙ্কর, নবীন, প্রবীণ সবারই। সকলেই মনে করেন, ইউটিউব কিস্যু ক্ষতি করতে পারবে না থিয়েটারের। নাটকের ভাইব্রেশন পেতে, জীবনের স্পন্দন পেতে মানুষকে থিয়েটারে আসতেই হবে। থিয়েটার যে এখন কিছুটা সিনেমার মতো, এটা থিয়েটারের লকডাউন স্ট্র‌্যাটেজি।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top