ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তির চাকুরে। হয়ে গেলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা। ভিকি কৌশলের রুমাল থেকে বেড়ালে রূপান্তরের সেই কাহিনি লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত।

চার বছর। মাত্রই চার বছর আগে বলিউডে আগমন ভিকি কৌশলের। মাত্র চার বছরেই ‘‌ভিনি ভিডি ভিসি’‌ মুহূর্ত ঢুকে গেল তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। এলেন–দেখলেন–জয় করলেন। একেবারে ঝড়ের গতিতে। কেরিয়ার দেখলেই স্পষ্ট যে, সংক্ষিপ্ত অভিনয় জীবনে অভিনয় করেছেন মেপেজুপে। তবে যেটাই করেছেন সেটাতেই নজর কেড়েছেন আপাতত বছর একত্রিশের ভিকি। ‘‌উরি’‌ ছবির সুবাদে সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরষ্কার প্রাপক হিসেবে নাম ঘোষণার পর আরও একবার খবরে তিনি।
বলিপাড়ায় ভিকি নেহাতই অজ্ঞাতকুলশীল নন। বাবা বিখ্যাত স্টান্ট ডিরেক্টর শ্যাম কৌশল। তা বলে হিন্দি ছবির জগতে হালে স্বজনতোষণের পক্ষে–বিপক্ষে আমরা–‌ওরার যে বিভাজন চলছে, তার একটিতেও ভিকিকে ফেলা যায় না। ছবির জগতে আসা তো দূরঅস্ত, দুই ছেলে ভিকি এবং সানি বলিউডের ত্রিসীমানায় থাকুক, সেটাই চাননি কঠোর পিতা শ্যাম কৌশল। যদিও জীবনের ঘটনাচক্রে ভিকি এবং সানি দু’‌জনেই অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ভিকির জন্ম এবং বেড়ে–ওঠা সবই খুব সাদামাঠা। মুম্বই শহরতলির এক চওলে। মুম্বইয়ে‌‌‌র এক–‌দু’‌কামরার ওইসব আটপৌরে পাড়ায় নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের বাস। যে কোনও সাধারণ বাড়ির ছেলের মতোই ক্রিকেট খেলে, সিনেমা দেখে বড় হচ্ছিলেন ভিকি। তাঁর বয়স যখন ১০–‌১২ বছর, শ্যামের অবস্থা ফেরে। চওলের আস্তানা গুটিয়ে সপরিবার উঠে আলেন আন্ধেরির অভিজাত লোখান্ডওয়ালায়। 
তবে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধে চিড় ধরেনি শ্যামের। তাই কলেজপড়ুয়া ভিকিকে কখনও গাড়ি চড়ে ঠাটবাট দেখাতে দেননি। কলেজে হাতখরচও ছিল যৎসামান্য। মাসে ৬০০ টাকা মাত্র। এমনকী, বাসের বদলে কখনও অটোতে চড়লেও বাবা প্রশ্ন করতেন!‌ ছেলেকে প্র‌য়োজন এবং বিলাসিতার ফারাক করতে শিখিয়েছিলেন শ্যাম কৌশল। তাই বলিউডের নামী–‌দামি অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও ডিজাইনার লেবেলের জামা–জুতো পরতে বাধোবাধো ঠেকে ভিকির। এখনও লোখান্ডওয়ালার চেনা দোকানের জুতোই কেনেন। ছোটবেলার চাটওয়ালার দোকানে পানিপুরি খান। এবং এখনও বাজার করে বাড়ি ফেরেন। 
কস্মিনকালে অভিনয় করবেন না, মনে মনে একরকম নিশ্চিত হয়েই বাবার ইচ্ছেপূরণ করতে বেরিয়েছিলেন ভিকি। ইলেকট্রনিক্স এবং টেলি–কমিউনিকেশনে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় চাকরি করেছেন কয়েক বছর। একদিন হঠাৎই অফিস ট্যুরে বেরিয়ে সব এত একঘেয়ে লাগল, যে চাকরিটাই ছেড়ে দিলেন! সেই অখণ্ড অবসরে বাবার সঙ্গে সিনেমার সেট–এ যাওয়া শুরু সময় কাটাতে। তখনই একদিন ঠিক করলেন, অভিনেতা হবেন। তবে সুপারিশে নয়। নিজের যোগ্যতায়। ভর্তি হয়ে গেলেন কিশোর নমিত কাপুরের অভিনয়ের আকাদেমিতে। সেখানে প্রশিক্ষণের পর ছবির জগতের সঙ্গে হাতেকলমে পরিচিতির জন্য জুটে গেলেন অনুরাগ কাশ্যপের জনপ্রিয় ছবি ‘‌গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’‌–‌এ। অনুরাগের সহকারী হিসেবে। অভিনয়ের দরজা খুলল। তবে একেবারে হাট করে নয়। খানিকটা আলগোছে। 
প্রথম ব্রেক অনুরাগেরই প্রযোজিত ‘‌লভ শভ তে চিকেন খুরানা’‌ এবং ‘‌বম্বে ভেলভেট’‌ ছবিতে। ছোট ছোট ভূমিকা। বিগ ব্রেক বলতে যা বোঝায়, সেটা তাঁকে দিয়েছিল ‘‌মসান’‌। ২০১৫–‌র ওই ছবিতে বেনারসের এক শ্মশানের ডোমের চরিত্রে জোরালো অভিনয় করেছিলেন ভিকি। দিন–আনা দিন–খাওয়া চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে বেনারসে একা কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। ঘাটে ঘাটে ঘুরে স্থানীয় ভাষা রপ্ত করেছেন। ছবি মুক্তির পর জনপ্রিয় হয়েছিল সেই ডোমের সংলাপ, ‘‌ইয়ে দুখ কাহে খতম নহি হোতা!‌’‌ ততোধিক জনপ্রিয় হয়েছিলেন তখন নেহাতই অখ্যাত ভিকি কৌশল। সেবার ২০১৫–‌এ কান চলচ্চিত্র উৎসবে দু’‌টি পুরস্কার পেয়েছিল ‘‌মসান’‌। 
সেই শুরু। তারপর ‘‌সঞ্জু’‌,‌ ‘‌রাজি’‌–‌র মতো ছবিতে একটু একটু করে বলিউডে নিজের পায়ের মাটি শক্ত করেছেন এই তুখোড় অভিনেতা। অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের জীবনাশ্রিত ‘‌সঞ্জু’‌–‌তে নামভূমিকার অভিনেতা রণবীর কাপুরের পাশাপাশি এক ফ্রেমে তাঁর প্রিয় বন্ধু কমলি ওরফে কমলেশের চরিত্রে সমান উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল ভিকির। ‘‌রাজি’‌ ছবিটি আদতে আলিয়া ভাটের। মহিলাপ্রধান ছবিটিতে উচ্চকিত নয়, বরং সংযত এবং শিষ্ট অভিনয়ের ঘরানা দেখিয়েছেন ভিকি। স্ত্রী ভারতের চর। ‘‌র’‌–‌এর এজেন্ট। তাঁর সঙ্গে আগাগোড়া বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন জেনে পাকিস্তানি সেনা আধিকারিকের চরিত্রের অস্ফুট বেদনা স্মরণীয় হয়ে থাকবে ভিকির অভিব্যক্তিতে। ‘‌মনমর্জিয়াঁ’‌–‌য়ে ভিকি অভিনীত ছন্নছাড়া ছেলেটিকে ভোলা যায়?‌ বা ‘‌রাঘব রামন ২.‌০’‌–‌র মাদকাসক্ত তদন্তকারী অফিসার?‌ নেটফ্লিক্সে ভারতের প্রথম ছবি ‘‌লভ পার স্কোয়্যার ফুট’‌–‌এও স্বমহিমায় দৃপ্ত ভিকি। 
তবে সব ছাপিয়ে গেছে ‘‌উরি’‌। ২০১৬–‌র সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ছবির উপপাদ্য (উপরে ছবির পোস্টার)। সত্য ও কল্পনাআশ্রিত। ছবিতে মেজর বিহান সিং শেরগিলের চরিত্রে অনায়াসে মিশে গিয়েছেন ভিকি। এমন চরিত্র যিনি সেনাবাহিনীর সক্রিয় অভিযান থেকে ছুটি চেয়েছিলেন অসুস্থ মায়ের শুশ্রূষা করার জন্য। সেনার দপ্তরে বসে কাজে নিজেকে অভ্যস্ত করতে করতে বাহিনীর নির্দেশে সীমান্তের ওপারে গিয়ে জঙ্গি ঘাঁটি নিকেশ করার অভিযোগের নেতৃত্বে জড়িয়ে পড়েন। ছবির একটি সংলাপ বহু ব্যবহার সত্ত্বেও তরতাজা। অভিযানের আগে বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করতে প্যারা এস এফ লিডার মেজর বিভান সিং শেরগিল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন, ‘‌হাউ ইজ দ্য জোশ?‌’‌ বাহিনী সমস্বরে উত্তর দিচ্ছে— ‘‌হাই স্যার!‌’‌ 
জাতীয় পুরষ্কার ঘোষণার পর সেরা অভিনেতা ভিকির কাছে জনৈক সাংবাদিকের একইও প্রশ্ন ছিল। সহাস্যে ভিকি বলেছিলেন, ‘‌দ্য জোশ ইজ ভেরি হাই স্যর‌!‌’‌ ‌

জনপ্রিয়

Back To Top