তিনি সুন্দরী। তিনি সফল। তিনি সংসারী। সেই তিনিই এখন মারণ ক্যান্সারে আক্রান্ত। ভয় না পেয়ে লড়ছেন সোনালি বেন্দ্রে। লেখায় সেলাম জানালেন অদিতি রায়।

‘‌সাওন বরসে তরসে দিল
কিউঁ না নিকলে ঘর সে দিল.‌.‌.‌’‌
নয়ের দশকের সেই বৃষ্টিভেজা দিন, প্রেমের তাড়সে ঘরে থাকাই দায়। হাওয়ায় ছাতা উড়ে গেছে, বর্ষার তীব্র ধারা শরীরে নিয়ে সলজ্জ হাসিতে প্রেমিকের দিকে এগিয়ে আসছে দীর্ঘাঙ্গী শ্যামলা মেয়ে। মুম্বইয়ের বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা ভরা জোয়ারের সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো হৃদয় উথালপাথাল তামাম ভারতীয় যুবকের।
এ দৃশ্য চেনা। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘দহেক‌’‌। সেই একই বছরে ‘সরফরোশ‌’‌ও মুক্তি পেয়েছিল। রাতারাতি হট প্রপার্টি হয়ে উঠেছিলেন দু’টি ছবির নায়িকা। 
ডোন্ট মাইন্ড!‌
নয়ের দশকের শেষে আমির খান অভিনীত ‘সরফরোশ’ ছবিতে কারণে–অকারণে তাঁর মুখনিঃসৃত এই শব্দবন্ধ তখন মুখে–মুখে। কে জানত, মধ্যবয়সে মারণরোগে আক্রান্ত হয়েও তিনি যে অ্যাটিটিউড দেখাবেন, তা–ও ভেতরে ভেতরে সেই— ‘ডোন্ট মাইন্ড’।  
তিনি সোনালি বেন্দ্রে। নিজের জীবন নিয়ে যিনি অক্লেশে বলেন, ‘বাড়িতে আমার নিজের বোন থেকে শুরু করে তুতো বোনেরা সকলেই দারুণ সুন্দরী। মাঝখান থেকে আমিই ছন্নছাড়া। একে তো কালো রং, তার ওপর অকারণ এত্ত লম্বা। আমার লম্বা লম্বা ঠ্যাং দেখে বাড়িতে কালো ঘোড়া বলা হত। আমি যে কখনও হিরোইন হব, বাড়ির লোকজন দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।’‌ কেরিয়ারের শুরুর দিকের এক ইন্টারভিউতে হাসতে হাসতে বলা এই বাক্য তাঁর যে পরিচয় দিয়েছিল, তা হল— তিনি এক আশ্চর্য ফ্রি স্পিরিট। ঘটনা। নইলে কি আর এত সহজে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করে দেন তাঁর কালান্তক রোগের কথা!
১৯৭৫ সালের পয়লা জানুয়ারি মুম্বইয়ের মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল মারাঠি পরিবারে জন্ম। বেঙ্গালুরুর মালেশ্বরমে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা। তারপর থানের হোলি ক্রস কনভেন্ট হাইস্কুল এবং দেরাদুনের ওয়েলহ্যাম গার্লস স্কুল। পড়াশোনায় সোনালি বরাবরই মনোযোগী। বাবা-‌মা ভেবেছিলেন শিক্ষকতা বা সরকারি চাকরিবাকরি করবে তাঁদের মেয়ে। সবাইকে চমকে দিয়ে টুকটাক মডেলিং করতে করতে একদিন ‘‌স্টারডাস্ট ট্যালেন্ট সার্চ’‌-‌এ নির্বাচিত হয়ে বসলেন সোনালি। শুরু হল তাঁর হিন্দি ছবিতে নায়িকা হওয়ার ট্রেনিং। লম্বা লম্বা সুঠাম ছিপছিপে দুই পায়ের কারণে তাঁকে সকলে ডাকতে শুরু করল ‘লং লেগ বিউটি‌’‌ বলে। 
১৯৯৪ সালে গোবিন্দার বিপরীতে ‘‌আগ’‌ ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় প্রথম দেখা গেল সোনালিকে। ছবি ফ্লপ। কিন্তু সোনালি নজরে। ‘‌নিউ ফেস অফ দ্য ইয়ার’-‌এর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ‘মোস্ট প্রমিসিং নিউকামার‌’‌-‌এর স্টার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েও গেলেন। আবার সেই বছরই ‘‌নারাজ’‌, ‘গদ্দার‌’‌‌-‌এর মতো কিছু ফ্লপ ছবিতেও নায়িকার চরিত্রে দেখা গেল তাঁকে। ফলে তাঁর অভিনয় ক্ষমতা এবং পর্দার উপস্থিতি তখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে। 
কিন্তু ১৯৯৫ সালে ‘‌টক্কর’‌ কিছুটা সাফল্য পেল। মণিরত্নমের ‘বম্বে‌’‌ ছবিতে ‘হাম্মা হাম্মা‌’‌ গানের সঙ্গে নাচে ঝলসে উঠলেন তামাম ভারতবর্ষে। ১৯৯৬ সালে ‘রক্ষক‌’‌, ‘দিলজলে‌’‌ এবং শাহরুখের বিপরীতে ‘ইংলিশ বাবু দেশি মেম‌’‌। 
আর ফিরে তাকাতে হয়নি সোনালিকে।
‘‌সপুত’‌, ‘ভাই‌’‌, ‘‌ডুপ্লিকেট’‌, ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়‌’‌, ‘‌সরফরোশ’‌, ‘চল মেরে ভাই‌’‌— একের পর এক ছবিতে সোনালি–সৌন্দর্যের স্নিগ্ধ উপস্থিতি বলিউডে তাঁর জায়গাটা পাকা করে দিল। আমির, শাহরুখ, সলমন— তিন খানের নায়িকা হিসেবে কাজ করার বিরল কৃতিত্বের অধিকারীও হলেন দীর্ঘাঙ্গী শ্যামলবরণী কন্যা।
২০০২ সালে প্রযোজক গোল্ডি বহেলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন সোনালি (যিনি এখন আমেরিকার হাসপাতালে তাঁর পাশে। বিপদের দিনে সঙ্গ দিতে উড়ে গেছেন বন্ধু অভিষেক বচ্চন)। ২০০৫ সালে মা হলেন পুত্রসন্তানের। মায়ানগরী থেকে বিরতি নিয়ে তখন সোনালি আচ্ছন্ন সংসারের মায়ায়। 
তারপরও ফিরেছিলেন আলোকবৃত্তে। কখনও থিয়েটার, কখনও সিনেমা, কখনও টেলিভিশন.‌.‌.‌। সাফল্য তাঁর অধরা ছিল না। ‘‌কাল হো না হো’‌ ছবিতে মারণরোগে আক্রান্ত শাহরুখের ডাক্তার প্রিয়ার ভূমিকায় হাস্যময়ী সোনালিকে দেখে অর্ধেক রোগ সেরে গিয়েছিল। 
নিয়তির পরিহাস?‌ 
জুলাইয়ের এক সকালে লাখো অনুরাগী চমকে গেলেন সোনালির টুইটে— ‘কখনও কখনও প্রত্যাশার বাইরে গিয়েই জীবন তোমাকে এক–একটা বাঁকে দাঁড় করায়। সম্প্রতি ডাক্তার জানিয়েছেন, আমি হাইগ্রেড ক্যানসারে আক্রান্ত। সত্যি বলতে কি, এমন কিছু যে ঘটতে চলেছে ভাবতেই পারিনি। সামান্য ব্যথা থেকে পরীক্ষা। তারপরেই এই অপ্রত্যাশিত নিয়তি। পরিবার এবং কাছের বন্ধুরা আমার সাপোর্ট সিস্টেম। আমি কৃতজ্ঞ। এই রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের একমাত্র উপায় খুব তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা। ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী আমি এখন নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন। আমি আশাবাদী এবং লড়াই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’‌‌‌।‌
সিডনি শেলডনের ‘‌স্কাই ইজ ফলিং’‌ উপন্যাসে র‌্যাচেলের কথা মনে পড়ে। সুপারমডেল। ক্যানসারে আক্রান্ত। কেমোথেরাপির জেরে চুল উঠে যাবে, দেখতে কুৎসিত হয়ে যাবে—  এই আশঙ্কায় তার জীবনের ক্ষয় দ্রুততর হয়ে উঠেছিল। লোকচক্ষুর আড়ালে, আত্মীয়-‌বন্ধুদের অগ্রাহ্য করে জীবনের শেষ কয়েকটা দিন একাই কাটিয়েছিল র‌্যাচেল। 
সোনালি এমনটা ভাবেননি। সৌন্দর্যহানির আশঙ্কায় ভক্তদের থেকে দূরে চলে যাননি আচমকা। বরং উল্টে প্রকাশ্যে জগৎকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি লড়বেন। তাঁকে ঘিরে রয়েছেন তাঁর আপনজনেরা। উল্টে পুত্র রণবীর আর স্বামী গোল্ডিকে সাহস যোগাচ্ছেন তিনিই। সঙ্গে অনুচ্চারিত থাকছে তাঁর বিখ্যাত শব্দবন্ধ— ডোন্ট মাইন্ড। 
অর্থ থাকলে ক্যান্সার–যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়, এমন উদাহরণ এদেশে আছে। কিন্তু সোনালি বেন্দ্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যহানির শঙ্কাকে উপেক্ষা করে ভয়কে জয় করেছেন।  
অমর হোক তাঁর শব্দবন্ধ। ডোন্ট মাইন্ড।

জনপ্রিয়

Back To Top