প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী। প্রতিবাদী। কন্যাসন্তানের জননী। সমুদ্রতটে বিকিনিতে বয়সকে হার মানিয়ে দুনিয়া উত্তালকারিনী। তিনি সালমা হায়েক। লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত।

ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল সেই ছবি। ফিরোজা রঙা বিকিনিতে ‌‌‌মেক্সিকোর সমুদ্রসৈকতে উচ্ছ্বল সালমা হায়েক। হাস্যে–লাস্যে মোহময়ী। কে বলবে হলিউডের ডাকসাইটে অভিনেত্রী এখন ৫৩!‌ ঠিকই পড়ছেন। তিপ্পান্ন। সালমা ‘‌ফ্রিডা’‌ হায়েক তাঁর ৫৩ তম জন্মদিনে স্বদেশ মেক্সিকোতে অবসরযাপনের এই নজরকাড়া ছবি পোস্ট করেছেন। এবং দেখিয়ে দিয়েছেন, এই তিপ্পান্নতেও খবরে তিনি। তিনিই। 
নিন্দুকে বলে থাকে, মেয়েরা নাকি বয়স লুকোয়। তাদের আচ্ছা করে জবাব দিয়ে ছবির সঙ্গে সালমার টুইট, ‘‌হ্যাঁ, কাল আমার ৫৩ হবে। তো?‌’‌ 
এখনও হলিউডের প্রথমসারির অভিনেত্রীদের অন্যতম, ফ্রান্সের ধনকুবের ফ্রাঁসোয়া অঁরি পিনোর ঘরণী, কন্যা ভ্যালেন্টিনার মা সালমা বরাবর ছকভাঙা। তাই কেরিয়ারের মধ্যগগনে থেকে মেক্সিকোর কিংবদন্তি মুরাল শিল্পী ফ্রিডা কাহলোর জীবনগাথা সেলুলয়েডে জীবন্ত করতে যেমন সর্বস্ব বাজি ধরতে পারেন, তেমনই ‘‌নিউ ইয়র্ক টাইমস’‌–‌এর উত্তর সম্পাদকীয় কলামে হলিউডের একদা নম্বর প্রযোজক ধারাবাহিক হেনস্থাকারী, ধর্ষক হার্ভে ওয়েনস্টাইনের মুখোশ খুলতে পারেন অনায়াসে। 
‘‌ডেসপারেডো’‌, ‘‌ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’‌, ‘‌ওয়ান্‌স আপ্‌ন আ টাইম ইন মেক্সিকো’‌, ‘‌ফ্রম ডাস্ক টিল ডন’‌ এবং অবশ্যই ‘‌ফ্রিডা’‌ খ্যাত অভিনেত্রী যে আগলখোলা প্রতিবাদী, তা গতবছর  হলিউড ছাড়িয়ে মার্কিন মুলুক হয়ে জেনে গেছে তাবৎ বিশ্ব। আমেরিকায় তখন ‘‌#মিটু’‌ বড় আন্দোলনের আকার নিয়েছে। তনুশ্রী দত্তের মারফত এদেশে আসতে তখনও কিছু বাকি। ওয়েনস্টাইনের সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিত তৎকালীন ‘‌মিরাম্যাক্স’‌ প্রযোজনা সংস্থা যে আসলে এক নারীলোলুপ, বিকারগ্রস্তের ডেরা এবং সেখানে ধারাবাহিকভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছেন এক সে এক নামজাদা থেকে শুরু করে স্বল্পখ্যাত অভিনেত্রীরা, তা তখন একটু একটু করে জানছে আমেরিকা। 
তখনই কলম ধরেছিলেন সালমা। জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন তাঁর জীবনের দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়। দুঃস্বপ্নের সেই সময় সালমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল ১৪ বছর। একটা ছবির মতো ছবি করবেন বলে মেক্সিকোর মহীয়সী শিল্পী ফ্রিডা কাহলোর গল্প সারা বিশ্বকে শোনাবেন বলে সালমার বিবরণে ‘‌রাক্ষস’‌ ওয়েনস্টাইনের কাছে বাঁধা পড়েছিলেন। ছবির খাতিরে প্রকাশ্যে সেই ‘‌রাক্ষসের’‌ সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ও করেছেন। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন কোনও বাধাই আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। যখন ঘুরে দাঁড়াতেই হয়। ‘‌নিউ ইয়র্ক টাইমস’‌–‌এ তাঁর জবানবন্দি লিখে ওয়েনস্টাইনকে, ওয়েনস্টাইনদের স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন সালমা। তাঁর কথায়, সেইসব কোটিকোটি মেয়ের কণ্ঠস্বর হয়েছিলেন, যাঁরা কোনও না কোনও ওয়েনস্টাইনের লালসার শিকার হয়েছেন।
তখন নয়ের দশকের শেষ। মেক্সিকোয় ছোট পর্দা উতরে হলিউডে পাড়ি দিয়ে ‘‌ফুল্‌স রাশ ইন’‌, ‘‌ডেসপারেডো’‌–‌র মতো কিছু ছবি সম্বল সালমার। পরিচালক রবার্ট রডরিগস এবং তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ অ্যাভেলানের মারফত ওয়েস্টাইনের সঙ্গে পরিচয় হয়। ‘‌ফ্রিডা’‌–‌র চিত্রনাট্য পড়ে উৎসাহ দেখান তৎকালীন ‘‌মিরাম্যাক্স’‌ সংস্থার হর্তাকর্তা। চুক্তি হয়, অভিনয়ের পারিশ্রমিক পাবেন সালমা। ছবির ব্যবসার টাকা ঘরে তুলবেন ওয়েস্টাইন। তবে তা শর্তসাপেক্ষ। সালমা ‘‌মিরাম্যাক্স’‌–‌এর সঙ্গে আরও কিছু ছবির জন্য চুক্তিবদ্ধ হলে তবেই দিনের আলো দেখবে ‘‌ফ্রিডা’‌। রাজি হয়ে যান সালমা। আসলে ফাঁদে পা দেন। এরপর যখন যেখানে শুটিং হয়েছে, অনবরত তঁাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন ওয়েস্টাইন। যাঁকে আদ্যান্ত পারিবারিক মানুষ, ভাল স্বামী, ভাল বাবা হিসেবে দেখত হলিউড।
প্রতিবারই ‘‌না’‌ বলেছিলেন সালমা। সেটা ওয়েস্টাইনকে আরও ক্রুদ্ধ করেছিল। ইচ্ছে করে সবার সামনে সালমার অভিনয়ের খুঁত ধরতেন। নতুন করে চিত্রনাট্য লিখতে বাধ্য করেন। আবদার করেন, ছবিতে মুখ দেখানোর মতো অকিঞ্চিৎকর চরিত্রে নামী অভিনেতা–‌অভিনেত্রীদের নিতে হবে। সালমা লিখেছিলেন, ‘‌ভাগ্য ভাল আমার সহকর্মী বন্ধু আন্তোনিও বান্দেরাস, এডওয়ার্ড নর্টন, অ্যাশলি জুডরা রাজি হয়েছিলেন’‌। শুধু রাজিই হননি। ওই কঠিন সময়ে সালমাকে আগলে রেখেছিলেন। মনোবল জুগিয়েছিলেন। চুক্তিরক্ষা করতে ১৪ বছর ওয়েস্টাইনের ‘‌হাতের মুঠোয়‌’‌ ছিলেন সালমা। তাঁকে আদৌ কোনও শিল্পীই মনে করতেন না ওয়েস্টাইন। মানুষও না! সালমা লিখেছেন, তিনি বা অন্য কোনও মহিলা ওই প্রযোজকের কাছে নেহাত মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। 
চুক্তি শেষ হতে ‘‌জীবন’‌ ফিরে পেয়েছেন। অভিনয়ে পেয়েছেন একের পর এক সাফল্য। যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘‌খলিল গিব্রান’‌স প্রফেট’‌। পাশাপাশি ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন। শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে কাজ করতে পৌঁছে গিয়েছেন সিয়েরা লিওন–সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে। মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসা নিয়ে সরব হতে মার্কিন সেনেট কমিটিতে ‘‌ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন্স অ্যাক্ট’‌ আনতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। আফগানিস্তানে মহিলাদের ন্যূনতম অধিকার না থাকায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনােল লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 
নিজের প্রসাধনী সংস্থা ‘‌নুয়্যান্স’‌ শুরু করেছেন। ব্যক্তিজীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটিয়েছেন ২০০৯ সালে। ফরাসি শিল্পোদ্যোগী ‘‌কেরিং’‌ সংস্থার সিইও ফ্রাঁসোয়া অঁরি পিনোকে বিয়ে করে। তাঁদের কন্যা ভ্যালেন্টিনা এখন ১০। এতটাই সাব্যস্ত যে, মায়ের জন্মদিনের পার্টির আয়োজন করতে পারে একার খুদে হাতে। জন্মদিনের যত ছবি আর ভিডিও পোস্ট করেছেন সালমা, তার মধ্যে উজ্জ্বলতম মা–‌মেয়ের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে নাচার দৃশ্য। আর সালমার কথায় ‘‌প্রচুর বেসুরো গান’‌ গাওয়ার। 
হলেনই বা তিপ্পান্ন। তো?

জনপ্রিয়

Back To Top