আমাদের দেশের কাগজে কোনও সেলিব্রিটি মারা গেলে তাঁর ওপর মহত্ত্বের পোঁচ বোলানো হয়। আর তাঁর দোষ (যদি থাকে) তা সত্বর কার্পেটের নীচে লুকিয়ে ফেলা হয়। তাপস পালের ক্ষেত্রে এমনটাই হচ্ছে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। তবে, প্রায় ২০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ওঁকে নিয়ে যত না আলোচনা হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি লেখালেখি এই ক’দিনে তাঁকে নিয়ে হল বা হচ্ছে। 
উনি যখন অভিনেতা ছিলেন তখন আমি ওঁকে চিনতামই না বলা যায়। এই ‘বলা যায়’ প্রসঙ্গে দ্রুত আসব। দাদার কীর্তি ছাড়া আমি ওঁর আর কোনও ছবি দেখিনি। রাজনীতিবিদ হিসেবেও আমি যে ওঁকে খুব বেশি চিনতাম, তা নয়। বিধায়ক থাকার সময় বিধানসভায় তাঁর সঙ্গে কথা হত। অল্পস্বল্প। কারণ, এ কথা বলতে লজ্জা নেই, যে রাজনীতিক ‘খবর’ দেন না, বা ভবিষ্যতেও তা দেওয়ার সম্ভাবনা নেই, রিপোর্টাররা তাঁদের সঙ্গে ‘বেশি ভাব’ জমাতে আগ্রহী হন না। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। সুব্রত মুখার্জি, সৌগত রায় বা জয়ন্ত বিশ্বাসের মতো নেতারা যখন বিধানসভার লবিতে এসে বসতেন, তখন রিপোর্টাররা তাঁদের ঘিরে ধরতেন। আড্ডা চলত। হাসিঠাট্টা চলত। রিপোর্টার থাকার সময়, তৃণমূল বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল নেতাদের নকল করে দেখিয়ে হাসির ছররা তুলত। সৌগত রায় বা জয়নাল আবেদিন খবর না দিয়েও আড্ডা মাতিয়ে রাখতেন। সুব্রতদার এখন আড্ডার মেজাজটা কিঞ্চিৎ ফিকে হয়েছে। তাপস পাল সেই খবর না দেওয়া বা দিতে না পারার গোত্রে পড়তেন। আর আড্ডা জমাতেও তিনি যে বিশেষ পটুত্ব দেখাতে পেরেছিলেন, তা নয়। 
বলা যায়, আমি ওঁকে মাত্র দিন তিনেকের জন্যে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাকে একবার কলকাতা থেকে ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ড বা সেন্সর বোর্ডের সদস্য করা হয়। তখন সেন্সর বোর্ডের প্রধান ছিলেন আশা পারেখ। তিনি চেন্নাইয়ে মিটিং ডাকলেন। দেশের সব জায়গা থেকে সদস্যরা এলেন। সেই বোর্ডে কলকাতা থেকে অন্যতম সদস্য ছিলেন তাপস পাল। এয়ারপোর্টে এসে তাপস পালকে দেখে নিজের পরিচয় দিয়ে আলাপ করলাম। চেন্নাইয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হল। মনে আছে, ওই গেস্ট হাউসে রাত দশটায় ডিনার শেষ। তখনও খবরের কাগজে কম্পিউটার চালু হয়নি। এখন রাত দশটা মানে খবরের কাগজে কপি-টপি সব লেখা শেষ। বাকি, অন্য কাজ। তখন রাত এগারোটাতেও কপি দেওয়া চলত। ফলে, রাত দশটা মানে, নাইট ইজ টু...‌ ইয়ং। সেই সময় ডিনার? কভি নেহি। তাপস পালেরও একই বক্তব্য। আমরা বললাম, ডিনার চাই না।
বেরিয়ে পড়লাম। তাপস পালের সঙ্গে। তখন কিন্তু তিনি একজন স্টার। কোনও স্টারের সঙ্গে বেরনো, আমার সেই প্রথম। বেশ অবাক হচ্ছিলাম। উনি বললেন, ‘চলুন, বিচে যাই।’ 
আমাদের জন্যে কোনও গাড়ি নেই। তখন রাত আটটা-সাড়ে আটটা বাজে। গেস্ট হাউসের চারদিকে বেশ অন্ধকার। রাজনৈতিক কভারেজে দক্ষিণ ভারতে বহুবার গিয়েছি। দক্ষিণের সব রাজ্যই খুব নিরাপদ। আমি বললাম, ‘কোনও ভয় নেই।’  
উনি দিব্যি বেরিয়ে পড়লেন, এক অখ্যাত মেয়ের সঙ্গে। তখন আমার যা বয়স ছিল, তাতে মেয়ে বলা চলে। তবে, সে মেয়ের বয়স অল্প হলে কী হয়, তার কোনও অংশে কোনও রূপের ছোঁয়া ছিল না! তাপস পালের কাছে, সেটা অন্তত সেই সন্ধেয় কোনও বিচার্য বিষয় ছিল না। আমি হলফ করে বলতে পারি। একটু হেঁটে আমরা অটোয় উঠলাম। সত্যিই। উনি বললেন, 'আমাকে আর কে চেনে এখানে' বলে অটোয় উঠে পড়লেন। অটোয় চললেন বাংলার অন্যতম স্টার।
মেরিনা বিচে বড় বড় ঢেউ উঠছে। তিনি জুতো খুলে তট ধরে একটু একটু করে এগোতে লাগলেন। এবার ঢেউ এসে তাঁর পা ভিজিয়ে দিল। ঢেউ সরে গেল। ভিজে নোনা বালিতে দাঁড়িয়ে তাঁর উচ্চকিত হাসি আমাকে চমকে দিয়েছে। এর আগে, আমি রুপোলি পর্দার জগতের কয়েকজনকে দেখেছি, কেবলমাত্র সরকারি অনুষ্ঠানে। তাঁদের কাউকে পাইনি এমন খোলামেলা পরিবেশে। সেই সন্ধে-রাতে তাপস পরতে পরতে দিয়ে গেছেন ব্যক্তিগত ছোঁয়া-মাখানো বিস্ময়।
দক্ষিণ ভারত শুধু নয়, লখনউ বা ওইরকম নিরামিষ-প্রবণ জায়গায় গেলে আমি নিরামিষ খেতেই পছন্দ করি। কারণ, আমিষ রান্নায় ওঁদের হাতের ‘গুণ’! তাপস আমার কথা মানলেন না। উনি নাকি মোটেই নিরামিষ খেতে পারেন না! বাইরে থেকে দেখতে বেশ ঝাঁ–চকচকে, এমন একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। মেন ফুডের অর্ডার দিয়ে হাতে ফ্রেশ লাইম নিয়ে আমরা টুকটাক গল্প করছি। আমার উল্টোদিকে চারজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ বসে পানাহার করছিলেন। মনের ভুল কিনা জানি না, তাঁরা আমার দিকে যেভাবে চেয়েছিলেন, তা আমার খুব একটা ভাল লাগছিল না। আমার একটু ভয় করছিল। হঠাৎ তাপস বললেন,‘ওদের দিকে তাকানোর দরকার নেই।’    
এ কি বাংলা ফিল্ম নাকি?
কলকাতা ফিরে আবার রাজনীতি আর প্রশাসনের খবরাখবর নিয়ে মেতে গেলাম। তাপসের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ পোক্ত করার সময় পেলাম না। পরে তিনি যখন রাজনীতিতে এলেন, তখন একদিন বিধানসভায় তাঁকে চেন্নাইয়ের মিটিংয়ের কথা বলেছিলাম। উনি বললেন, ‘আপনি তো আর যোগাযোগ রাখলেন না, খোঁজখবরও নিলেন না।’  
কী বলি! সাধারণ বা বলা উচিত, হেঁজিপেজি এক মেয়ে আমি। এমন মেয়ে কোন সাহসে ভর করে কোনও তারকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে? কিন্তু তাপস এমনই ছিলেন। চেন্নাই সফর আমাকে যেসব ছোট ছোট মধুর বিস্ময় উপহার দিয়েছিল, তা থেকে মনে হয়, তারাদের ‘মেকি’ আলো তাপসের মুখ ঢাকতে পারেনি। এমন এক সহজতা ছিল তাঁর মধ্যে। তাই বোধহয়, রাজনীতির জটিল রাস্তায় নেমে তিনি পথ গুলিয়ে ফেলেছিলেন। সঠিক পথ চিনে উঠতে পারেননি। 
সে কত মধুর বিস্ময় উপহার দিয়েছিল! 

জনপ্রিয়

Back To Top