যাঁদের ছবি দেখে, পড়ে শিখেছেন, তাঁদের হারিয়ে অস্কারের মঞ্চে ঝলমলে বং জুন–হো। কোথায় শুরু তাঁর যাত্রার? অতীত অ্যালবাম দেখে নিলেন দেবাশিস পোদ্দার।

সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে জননী যেভাবে চেয়ে থাকেন, সেভাবেই জীবনের প্রথম অস্কার ট্রফিটি হাতে নিয়ে সেটির দিকে চেয়েছিলেন বং জুন‌–হো। সহ–চিত্রনাট্যকার তখন কৃতজ্ঞতা স্বীকারে ব্যস্ত। বংয়ের চোখে বিশ্বজয়ের বিস্ময় আর মুখে শিশুসুলভ হাসি। 
বিশ্বজয় তো বটেই। ৯২তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে শ্রেষ্ঠ স্বকীয় চিত্রনাট্য, শ্রেষ্ঠ বিদেশি ছবি, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ ছবি–সহ সর্বসাকুল্যে ১৭৪টি আন্তর্জাতিক খেতাব রয়েছে বং পরিচালিত ‘‌প্যারাসাইট’‌–এর ঝুলিতে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে দীর্ঘ ৮ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে এই ছবিকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন দর্শকরা।
বিশ্বব্যাপী একটা বিপুল সমান্তরাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘‌প্যারাসাইট’‌। কিন্তু কেন?‌ এক সাক্ষাৎকারে বং জানিয়েছেন, ‘‌এই সিনেমা একটি ক্লাউনবিহীন কমেডি, একটি ভিলেনবিহীন ট্র‌্যাজেডি। প্রাচুর্য আর অভাবের বৈপরীত্যের এই গল্পে বাস্তবটাকে তুলে ধরতে এতটুকু কার্পণ্য করিনি। এ গল্প সকলের।’‌ সমাজে শ্রেণিবিভাজন ও শ্রেণিবৈষম্য এতটাই প্রকট যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ভারত সফরে এলে ঝাঁ–চকচকে রাস্তা আর নোংরা, এঁদো বস্তির মাঝে উঠে দাঁড়ায় এক অনতিক্রম্য পাঁচিল। এই আর্থ–সামাজিক পরিস্থিতি, শ্রেণিগুলির আন্তঃক্রিয়া এবং পরজৈবিক নির্ভরশীলতা ‘‌প্যারাসাইট’–এর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু। এভাবেই দক্ষিণ কোরিয়ার এই ছবি হয়ে উঠেছে বিশ্বসিনেমা।
স্কুলে থাকতেই এই জীবনদর্শনের বীজ বপন হয়েছিল বং জুন–হোর মধ্যে। আর্থিকভাবে দুর্বল সহপাঠীদের বাড়িতে এনে তাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নিতেন তিনি। কোরিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গল্প শোনা ও বলার সহজপাঠ দিয়েছিলেন দাদু ঔপন্যাসিক পার্ক তেই–ওন। সউল শহরে মিড্‌ল স্কুলে পড়ার সময়েই বং ঠিক করেন সিনেমা বানাবেন। স্কুলের ক্যাফেটেরিয়ায় ডোনাট বিক্রি করে সেই টাকায় কিনে ফেলেন তাঁর প্রথম ভিডিও ক্যামেরা। স্মৃতিচারণে বং জুন–হো বলছিলেন, ‘রাতে হিতাচির ওই ক্যামেরাটা জড়িয়ে যেভাবে শুয়ে থাকতাম, সেটা আমার আজও মনে পড়ে।’‌
১৯৮৮ সালে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে ইয়নসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন বং। এক ছাত্র খুনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তখন সামরিক বর্বরতা ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু। ক্যাম্পাস পত্রিকায় প্রতিবাদী কার্টুন এঁকে প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র আন্দোলনে নাম লেখান বং। তাঁকে থামাতে পারেনি কাঁদানে গ্যাসও। প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজে হাত লাগানো থেকে শুরু করে গরমের ছুটিতে দুঃস্থদের পড়ানো, শ্রমিকদের হয়ে লড়াইয়েও নেমে পড়েন তিনি। বং জুন–হোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাঁর প্রথম ২টি ছবি ‘বার্কিং ডগ্‌স নেভার বাইট’‌ ও ‘‌মেমোরিজ অফ মার্ডার’‌–এর প্রযোজক চা সাং–জেই। তিনি বলেছেন, ‘‌কলেজের দিনগুলিই বংয়ের কাছে পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। সেই সময় থেকেই সমাজের বিভিন্ন সমস্যার প্রতি এত সংবেদনশীল বং।’‌
সরকারি নির্দেশ মেনে সামরিক বাহিনীতে ২ বছর কাটিয়ে ১৯৯২ সালে কলেজে ফেরেন বং। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের সঙ্গে খোলেন ‘‌ইয়েলো ডোর’ নামে ফিল্ম ক্লাব।‌ দেখতে শুরু করেন যাবতীয় সব হলিউড ক্লাসিক। বানিয়ে ফেলেন কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিও। ইতিমধ্যে সিনেমা বানানোর পাঠ নিয়েছেন কোরিয়ান অ্যাকাডেমি অফ ফিল্ম আর্টস থেকে। সময় তখন খানিকটা প্রতিকূল। খরচ চালাতে বিয়ের অনুষ্ঠানের ভিডিও তোলার কাজ শুরু করেন বং। সউলের এক উচ্চবিত্ত পরিবারে গৃহশিক্ষকতাও করতেন (‌তখনই মাথায় আসে ‘‌প্যারাসাইট’‌–এর আইডিয়া)‌। সেই কঠিন সময়ে দেশের ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় প্রান্তিক মানুষজনের প্রতি সহমর্মিতার অভাব আরও সামনে থেকে দেখেছিলেন বং। সাক্ষী হয়েছিলেন অমানবিক পুলিশি কাজকর্ম এবং সীমাহীন আর্থিক বৈষম্যের। যার প্রতিফলন তাঁর প্রথম ২টি ছবিতেই স্পষ্ট।
‌বাম‌পন্থী। আমেরিকা–বিরোধী। রাজনৈতিক প্রচারক। এসব তকমা ততদিনে এঁটে গিয়েছে বংয়ের গায়ে। সে সব ঝেড়ে না ফেলে কল্পবিজ্ঞানে ভর দিয়ে বং এর জবাব দিয়েছিলেন ‘‌দ্য হোস্ট’‌ সিনেমায়। যেখানে এক মার্কিন বিজ্ঞানীর বেপরোয়া সিদ্ধান্তে এক দক্ষিণ কোরীয় বিজ্ঞানী অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন এবং তার ফল ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। এভাবেই হালকা চালে আমেরিকার ওপর দেশের নির্ভরতা নিয়ে আবছা অথচ পরিষ্কার প্রশ্ন তুলেছিলেন বং। সমাজের অগণতান্ত্রিক আর্থ–সামাজিক স্তরবিন্যাস চোখে পড়ে তাঁর ‘‌স্নোপিয়ার্সার’‌ সিনেমাতেও। বিষয়বস্তু গুরুগম্ভীর হলেও কৌতুকরস মিশিয়ে বা গল্পের মোড় অপ্রত্যাশিতভাবে ঘুরিয়ে দিয়ে ছবি পরিবেশনে সিদ্ধহস্ত বং। তাঁর ছবি ‘‌মাদার’‌ ও ‘‌ওকজা’‌ চোখে জল আনে।
তবে দর্শকদের কাছে বং জুন–হোর আবদার, ‘‌আমি চাই, ট্রেনে সফর করতে করতেও কল্পবিজ্ঞানের রহস্যে মোড়া আমার সিনেমাগুলো মানুষ উপভোগ করুক। আর আমি এটাও চাই যে, দিনের শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তারা সিনেমায় অন্তর্নিহিত সামাজিক বার্তাটি অন্তত এক মুহূর্তের জন্য ভাবুক।’‌
ফেরা যাক অস্কারের মঞ্চে। গুরু মার্টিন স্করসেসি, কোয়েন্টিন ট্যারেন্টিনোকে হারিয়ে শিষ্য বং জুন–হোর হাতে উঠল সেরা পরিচালকের সোনালী ট্রফি। আবেগে বং বলে উঠলেন, ‘‌এতদিন ওঁদের সিনেমা দেখে, পড়ে শিখেছি। মনোনীত হওয়াটাই বড় ব্যাপার। ছোট থেকে মার্টিন স্করসেসির এই কথাটি গুরুমন্ত্রের মতো মানি— যা একান্ত ব্যক্তিগত, তা–ই সবচেয়ে সৃজনশীল।’‌ 
সত্যিই তো!‌ পরগাছা হয়ে বাঁচেননি। বরং ব্যক্তিজীবনে যা সব চাক্ষুষ করেছেন বং, সেই চরম বাস্তবতাই আজকের সমাজে অনবরত প্রশ্ন তুলছে। উত্তর খুঁজছে বিশ্বের দরবারে।‌‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top