সম্রাট মুখোপাধ্যায়: এম এ পড়ছেন তখন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সালটা ১৯৫৬। একদিন বন্ধুর অভিনেত্রী মা শেফালিকা দেবীর সৌজন্যে পৌঁছে গেলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর কাছে। সন্ধেটি ছিল ঐতিহাসিক। কারণ সেদিনই ‘‌শ্রীরঙ্গম’‌ মঞ্চে শিশিরবাবুর শেষ অভিনয়। ছবি বিশ্বাসকে পাশে নিয়ে করলেন ‘‌প্রফুল্ল’‌। থমথমে গ্রিন রুমে সৌমিত্রকে আশ্বস্ত করে জানালেন শিশিরবাবু, তাঁর থিয়েটার বন্ধ হল না। ওই মঞ্চ তিনি ছেড়ে দিলেন। না, এরপর অবশ্য আর সেভাবে সাধারণ রঙ্গালয়ে ফেরেননি শিশিরবাবু। কিছু আমন্ত্রিত অভিনয় করেছেন মাত্র। তারই একটিতে সুযোগ মিলল সৌমিত্রর। নাটক ওই ‘‌প্রফুল্ল’‌ই। মার্কাস স্কোয়্যারে রঙ্গ সংস্কৃতি উৎসবে হবে। আর সৌমিত্রকে করতে হবে সুরেশের চরিত্র। বড় ভাই যোগেশ শিশিরবাবু। নিজেই খবর দিয়ে‌ সৌমিত্রকে ডেকে পাঠালেন শিশিরবাবু। পুরো রিহার্সাল দেওয়ার সুযোগ নেই। বললেন ‘‌প্রফুল্ল’‌ বইটা কিনে আনতে। তিনি প্রয়োজন মতো সম্পাদনা করে দেবেন। একটি মোক্ষম পরামর্শ পেলেন সেদিন সৌমিত্র, ‘‌কেমনভাবে তৈরি হব’‌, এ প্রশ্নের উত্তরে শিশিরবাবুর কাছ থেকে ‘‌বইটা তন্নতন্ন করে পড়বে, গোয়েন্দার মতো। তাতেই হদিশ পাবে চরিত্রের।’‌ এই শিশির সান্নিধ্যই হয়তো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আকৃষ্ট করেছিল সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রতি। বামপন্থার সঙ্গে প্রবল ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও তাই প্রথম জীবনে গ্রুপ থিয়েটারের অন্তর্ভুক্ত হননি তিনি। পেশাদার রঙ্গমঞ্চে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৬৩ সালে। ‘‌তাপসী’‌ নাটকে। স্টার থিয়েটারে এ নাটক চলেছিল ৪৬৭টি শো। তবে এ নাটকের রচয়িতা বা নির্দেশক ছিলেন না সৌমিত্র। সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন দেবনারায়ণ গুপ্ত।
স্তানিস্লাভস্কি পড়তে হয়েছিল
সত্যজিৎ রায়ের কাছে পৌঁছেছিলেন ‘‌অপরাজিত’‌ হওয়ার সময়েই। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখে মনে হয়েছিল সত্যজিতের। বলেওছিলেন সে কথা। যে বয়সটা একটু বেশি হয়ে গেল। আশ্বাস দিয়েছিলেন, দরকার পড়লে ডেকে পাঠাবেন। সে ডাক এল ১৯৫৭–‌এর শুরুতে। সবে চিকেন পক্স সারিয়ে সৌমিত্র সুস্থ হয়েছেন। বন্ধু সুবীর হাজরা মারফত খবর এল, মানিকবাবু দেখা করতে চান। গেলেন সৌমিত্র। তাঁকে দেখে প্রথমে যে ব্যাপারটায় নিশ্চিন্ত হলেন সত্যজিৎ তা হল মুখে বসন্তের দাগ বিশেষ ছাপ ফেলে যায়নি। জানালেন, ‘‌অপরাজিত’‌র পরের অংশ করবেন। আর  সৌমিত্রকে লাগবে সেখানে। কিন্তু আকাশবাণীর চাকরির শিডিউল?‌ সেটা যদি শুটিংয়ে বাধা হয়?‌ নিঃসঙ্কোচে সৌমিত্র জানালেন, ‘‌চাকরি ছেড়ে দেব।’‌ পরে করেছিলেনও তাই, তখন সত্যজিৎ একসঙ্গে ‘‌পরশপাথর’‌ আর ‘‌জলসাঘর’‌ দুটো ছবি করছেন। তার শুটিং দেখতে ডাকলেন সৌমিত্রকে। উদ্দেশ্য নিজের কাজের ঘরানার সঙ্গে তাঁকে পরিচিত করা। ‘‌জলসাঘর’‌–‌এর সেটেই একদিন ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ করাতে গিয়ে সত্যজিৎবাবু বললেন, ‘‌এর নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমার পরের ছবি ‘‌অপুর সংসার’‌–‌এর অপু। সেই প্রথম সৌমিত্রও জানলেন কোন চরিত্রে তাঁকে ভাবছেন সত্যজিৎ। এরপর একদিন সত্যজিৎবাবু পড়তে দিলেন স্তানিস্লাভস্কির ‘‌অ্যান অ্যাক্টর প্রিপেয়ার্স’‌। নিয়ে গেলেন বিলি ওয়াইল্ডারের ‘‌লস্ট উইক এন্ড’‌। ‘‌ভয়েস টেস্ট’‌–‌এর দিন সৌমিত্র আবৃত্তি করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘‌বাঁশি’‌। ১৯৫৮–‌য় শুটিং শুরু। ছবি মুক্তি পেল ১৯৫৯–‌এ।
 

জনপ্রিয়

Back To Top