উদ্দালক ভট্টাচার্য
• রেডিও জকি, তাও সাঁওতালি ভাষায়, কী করে হল পুরো ব্যাপারটা?‌
❏‌ আসলে আমিও এখন ভাবি, কীভাবে যে কী হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে রেডিওর প্রতি আমার একটা আসক্তি ছিল। ভাল লাগত রেডিও শুনতে। তাই রেডিও জকি হওয়ার শখও ছিল আগাগোড়া। কিন্তু বাড়িতে বলতে পারিনি। আমার বাড়ির লোক কোনও কিছুতে কোনওদিন আটকাননি। কিন্তু তবু, রেডিও জকি হব কথাটা বলতে পারতাম না। আর রেডিও জকি হওয়ার জন্য যা পড়াশোনা করতে হয়, সেটাও আমার জেঠুর পক্ষে করানো সম্ভব ছিল না। তাই আশা একসময় ছেড়ে দিয়েছিলাম। এর মধ্যেই একসময় দেখলাম, রেডিও মিলনের বিজ্ঞাপন। সেখানে সাঁওতালি ভাষার আর জে চাইছিলেন ওরা। আমি বায়োডেটা পাঠিয়ে দিলাম। আমাকে পছন্দ করলেন ওঁরা। সমস্যা এখানেই মিটে যেত যদি ট্রেনিংয়ের সময়ে আমার পরীক্ষা না থাকত। বাড়ির লোকেদের না জানিয়ে আমি পরীক্ষা না দিয়ে রেডিওর ট্রেনিংয়ে গেলাম। তারপর সবই যেন ঠিকঠাক হয়ে গেল। তবু শিওর ছিলাম না, অন্য অনেকেই তো ছিলেন ওই পদের জন্য। শেষ পর্যন্ত আমাকেই ওরা পছন্দ করলেন। তারপর কাজ করতে শুরু করে দিলাম।
• আপনার বাড়ি কী ওখানেই, নাকি কলকাতায় থাকেন?‌
❏‌ আমার বাড়ি ঝাড়গ্রামে। কলকাতায় আমি জেঠুর কাছে থাকতাম। ঝাড়গ্রামে আমার মা–বাবা থাকেন। ছোটবেলা থেকে ওই পরিবেশে বড় হয়েছি বলেই সাঁওতালি সংস্কৃতির যতটুকু পাওয়ার পেয়েছি। এক্কেবারে কলকাতায় থাকলে সেসব বোধহয় পেতাম না। 
• সাঁওতালি, আপনার মাতৃভাষা। প্রান্তিক ভাষাও বলা চলে, তাতেই আপনি আর জে, কেমন লাগে?‌
❏‌ খুব গর্ববোধ করি। এমন করে নিজের মায়ের ভাষাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারব, ভাবিনি। সাধারণত মানুষ সাঁওতাল বললেই ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ। যাদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছয়নি। সেই ভাষাই যে একটি প্রচার মাধ্যমের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তা অনেকেই তো ভাবতে পারতেন না। আমি সেই স্বপ্নটাকে সত্যি করেছি। আমার মাতৃভাষাকে নিয়ে আমার সত্যিই গর্ব হয়। 
• আচ্ছা, আপনার বাড়ির প্রতিক্রিয়া কী ছিল?‌
❏‌ ওই যে বললাম, প্রথমে তেমন করে সাপোর্ট পাইনি। কিন্তু একটা দিনের কথা মনে পড়ে। তখন এই পেশায় বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে আমার। এখানে একটা স্থানীয় ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড হয়। আমায় সেখানে ডাকা হয়েছিল সঞ্চালনা করার জন্য। সেদিন বাড়ি থেকে একটি মেসেজ পেয়েছিলাম, ‘‌এভাবেই তুমি এগিয়ে যাও।’‌ সেটা পড়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। বলতে পারেন, একটা বৃত্ত পূর্ণ হল সেদিনের মেসেজের পর। প্রথম দিকে, যখন আমাকে সবে লোকে চিনছে একজন রেডিও জকি হিসাবে, তখন তো বাড়ির লোকেরাই আমাকে বলতেন, ‘‌এত ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী সাঁওতাল সমাজকে সবার সামনে উপস্থাপনা করা যায় না। তার জন্য জ্ঞান প্রয়োজন।’‌ আমি বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিলাম। তারপর থেকে অনেক কিছু শিখেছি সাঁওতাল সংস্কৃতি নিয়ে। জানতে চেষ্টা করেছি অনেক কিছু। ভাষা, সংস্কৃতি না জানলে সত্যিই তো একটি জাতিকে উপস্থাপনা করা যায় না।
• আপনার অনুষ্ঠানটা কী নিয়ে হয়, কত লোকে শোনে?‌
❏‌ তেমন কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। আমাদের এখানে অনেক রকম পরব হয়। আমি সময়ে সময়ে সেগুলো নিয়ে কথা বলি। এছাড়া, কোনও বিশেষ দিনে বিশেষ বিষয় নিয়েও অনুষ্ঠান হয়। কখনও নিজের খেয়ালে স্ক্রিপ্ট তৈরি করে সেই মতো অনুষ্ঠান করি। একেক সময়ে একেক রকম আর কি। আর রেডিওর শ্রোতা এভাবে মাপা যায় কি না, তা আমি জানি না। তবে বছর খানেক আগে একবার এই রেডিও চ্যানেলের শ্রোতার সংখ্যা মাপা হয়েছিল। তখন শুনেছিলাম ৫ থেকে ৬ লক্ষ লোক আমাদের চ্যানেল শোনেন। আশা করি আমার অনুষ্ঠানও তাঁদের কাছে পৌঁছে যায়। 
• বাড়ির সবাই শোনে অনুষ্ঠান?‌
❏‌ আমি তো রবিবার বাদে প্রতিদিন অনুষ্ঠান করি। তাই হয়ত সবসময় শুনতে পারে না। আর কলকাতায় জেঠুরা থাকেন, ওদের কাছে এই চ্যানেল পৌঁছয় না। কিন্তু বাড়িতে সবাই মাঝে মাঝে শোনে। যখন কাজকর্ম থাকে না, অবসর থাকে।
• শিখা, আপনার মতো অনেক নতুন প্রজন্মের সাঁওতাল সমাজের ছেলেমেয়েরাই স্বপ্ন দেখে নতুন ধরণের পেশায় যাওয়ার। শহুরে সমাজ, যাঁরা নিজেদের মূলস্রোতের অংশ বলে মনে করে, তাঁরা তো কেমন ভাবে যেন দেখে সাঁওতালদের, সেই বাধা নতুন প্রজন্ম পেরোবে কী করে?‌
❏‌ আমি কিন্তু তেমন কোনও বাধার সামনে পড়িনি কোনওদিন। আমার বাড়ির লোকেরাই হয়ত তেমন কিছু আমার সামনে আনতে দেননি। কিন্তু হ্যাঁ, আমি দেখি আমাদের ওখানে আমার থেকে অনেক কম বয়সের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আমাকে কেউ কোনওদিন সেই বিষয়ে চাপ দেননি। কিন্তু আমাদের সমাজের সত্যিটা তো পাল্টায়নি। তাই নতুন প্রজন্মের বুক ভরা সাহস চাই। তাঁদের আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের প্রতি। তাহলেই অনেক বাধা বিঘ্ন কেটে যাবে। লক্ষ্যে যদি স্থির থাকা যায়, তাহলে আর কোনও কিছুই তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। 
• পেশায় আসার পর থেকে একটা ভাল অভিজ্ঞতা আর একটা খারাপ অভিজ্ঞতা, এটাই শেষ প্রশ্ন।
❏‌ অসংখ্য ভাল অভিজ্ঞতা আছে। তাই আগে খারাপটাই বলি। আমি তো কলকাতায় ছিলাম অনেকদিন। তাই তেমন করে সাঁওতালি ভাষার গভীরে গিয়ে চর্চা করা হয়নি। বাড়িতে বলতাম আর ছোটবেলায় যা শুনেছি, সেটুকুই ছিল শিক্ষা। তাই শো শুরু করার পর থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমি দেহাতিদের মতো করে সাঁওতালি বলতে পারি না বলে আমাকে অনেকে খোঁটা দিতেন। তাই আমি শিখতে শুরু করলাম। এখানে এসে অলচিকি বর্ণ শিখলাম। ভাষা ভাল করে রপ্ত করলাম। কিন্তু তখন নিজের মাতৃভাষা নিজেই ঠিকমতো বলতে পারি না শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আর ভাল অভিজ্ঞতার মধ্যে একটা এখনই মনে পড়ছে। নারী দিবসে নিজের লেখা একটি স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমি অনুষ্ঠান করেছিলাম। কী জানি কী হল, সেদিন পড়তে পড়তে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানটা আবার দিল্লির একটি অনুষ্ঠানে শোনানোও হয়েছিল। আমার খুব গর্ব হয়েছিল সেদিন। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top