অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • ছবির নাম যদিও সন্দীপ রায় করেছেন ‘‌প্রোফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো’‌, কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের গল্পের নাম তো ‘‌নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’‌।
•• হ্যাঁ, হ্যাঁ, গল্পের নাম ‘‌নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’‌।
• তাহলে এই ছবির নায়ক তো আপনিই?‌
•• একেবারেই। আমিই এছবির নায়ক। এটা কিন্তু ঠিক। আমিই নায়ক।
• তাহলে, ছবির যে নামটা পাল্টে গেল, তার জন্যে কি দুঃখ হচ্ছে?‌
•• না, একেবারেই দুঃখ হচ্ছে না। কারণ, এই সব গল্পগুলোই কিন্তু শঙ্কু কাহিনী। প্রফেসর শঙ্কুর লেখা ডায়েরি। শঙ্কুর নানান ইন্টারেস্টিং কাহিনী লিখেছেন সত্যজিৎ রায়। তারই একটা গল্পের নায়ক নকুড়বাবু, যেটা ছবিতে আমি করছি। এই সব গল্প কিন্তু আসলে প্রফেসর শঙ্কুরই গল্প। ফেলুদার গল্পে তোপসে বা জটায়ু যেমন খুব ‘‌ভাইটাল’ অংশ, কিন্তু ফেলুদার ছবিকে তো কখনও ‘‌তোপসে অ্যান্ড কোং’‌ বা ‘‌জটায়ু অ্যান্ড কোং’‌ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। আর, যদি ছবির নামও ‘‌নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’‌ হয়, তাহলে অনেকের বুঝতে অসুবিধে হতে পারে এটা প্রোফেসর শঙ্কুর কাহিনী কিনা। যারা শঙ্কুর কাহিনী পড়েননি, কিন্তু নাম শুনেছেন, তাঁরা তো নকুড়বাবুর নাম শুনে বুঝতে পারবেন না।
• আপনি তাহলে নায়ক হয়েই খুশি, ছবির নাম যাই হোক না কেন?‌
•• অবশ্যই খুশি। শঙ্কুকে নিয়ে প্রথম সিনেমা আসছে, সেই কাহিনীর আমি নায়ক, এর জন্যে আমি গর্বিত। বাবুদা (‌সন্দীপ রায়)‌ সেই সম্মানটা আমাকে দিয়েছেন।
• সন্দীপ রায়ের কাছ থেকে এই ছবির অফার পেয়ে কি চমকে গিয়েছিলেন?‌
•• চমকে গিয়েছিলাম বলাই যায়। আসলে, ব্যাপক আনন্দ হয়েছিল। উনি তো প্রথমে আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমি এই গল্পটা পড়েছি কিনা। আমি জানালাম, অনেক আগে পড়েছি। সবটা পরিষ্কার মনে নেই। তখন বাবুদা বইটা এনে বললেন, ‘‌দেখো, নকুড়বাবুর যে ছবিটা বাবা এঁকেছেন, সেটা তো তোমাকে দেখেই আঁকা বলে মনে হচ্ছে।’‌ আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে সত্যিই বিস্মিত হয়ে যাই। সত্যজিৎ রায়ের নকুড়বাবুকে তো আমারই মতন দেখতে। আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারিনি।
• ছবিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন তো?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। এটাও সম্ভব?‌ নকুড়বাবু আমারই মতন দেখতে?‌ একটু চুপ হয়ে গেলাম দেখে বাবুদা বললেন, তুমি নকুড়বাবু না করলে আমি এই ছবিটা করব না।
• এটা তো বিরাট পাওনা।
•• বিরাট পাওনা। বিরাট সম্মান। না করার কোনও কারণই ছিল না। আমি তো ছবিটা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে গিয়েছিলাম। বাবুদাই বললেন, প্রোফেসর শঙ্কু করবেন সুন্দরদা (‌ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়)‌।
• আপনি তো সন্দীপ রায়ের ‘‌গোরস্থানে সাবধান’‌-‌এ অভিনয় করেছেন।
•• হ্যাঁ, বাবুদার সঙ্গে বড়পর্দায় ওটাই আমার প্রথম কাজ। আমি যখন বাংলা ছবিতে কমেডিয়ানের ছাপ নিয়ে অভিনয় করে চলেছি, তখন আমাকে গিরিন বিশ্বাসের মতো নেগেটিভ চরিত্রে কাস্ট করাটা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই ছবিতে আমি দুই ভাইয়ের চরিত্রেই অভিনয় করেছিলাম। গিরিন আর নরেন। তাছাড়া, টেলিভিশনে ‘‌সত্যজিৎ রায় প্রেজেন্টস’ সিরিজে বাবুদার সঙ্গে ‘‌গোঁসাইপুর সরগরম’‌ আর ‘‌জাহাঙ্গিরের স্বর্ণমুদ্রা’‌ করেছি এবং ‘‌জাহাঙ্গিরের‌‌ স্বর্ণমুদ্রা’‌য় বাবুদা আমাকে রঞ্জিত মল্লিকের বন্ধুর চরিত্র দিয়েছিলেন। রঞ্জিতদা অনেক সিনিয়র। তবুও বাবুদা ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, চিন্তা কোরোনা, মেক-‌আপ দিয়ে তোমাকে রঞ্জিতবাবুর সমবয়সী করে দেব।
• বাংলা সিনেমায় লাগাতর কমেডি করতে করতে ক্লান্ত লাগত না?‌ অনেক সময় চিত্রনাট্য ও পরিচালকের দোষে তো কমেডি প্রায় ভাঁড়ামোর পর্যায়ে চলে যায়?‌
• তা তো যায়ই। কমেডি তো আর ভাঁড়ামি নয়। আর, সারা পৃথিবীতে কমেডির সম্রাট তো চার্লি চ্যাপলিন, যিনি হাসাতে হাসাতে মানুষকে কাঁদাতে পারেন। তবুও, প্রাণপন চেষ্টা করি কমেডি যাতে ভাঁড়ামো না হয়। কিন্তু ছবির সিচ্যুয়েশন, ছবির সংলাপ তো একজন অভিনেতা লেখেন না।
• ক্লান্ত লাগে?‌
•• লাগে তো। তখন এই ধরনের ছবি ক্লান্তি দূর করে চাঙ্গা করে দেয়।
• এই যে চাঙ্গা করার ছবি, তার সূচনা কি বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌শিল্পান্তর’‌-‌এ?‌
•• একদম ঠিক। সেই সময় যখন শুধুই কমেডি করে যাই বাংলা ছবিতে, তখন অন্যরকমের একটা প্রধান চরিত্রে আমাকে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন বাপ্পাদিত্য। আমি পরিচালকের আস্থার মর্যাদা রেখেছিলাম, এই ছবিটা দেখার পরে অনেকেই বলেছেন। বাপ্পাদিত্যও খুব খুশি হয়েছিলেন। খুব অসময়ে চলে গেছেন বাপ্পাদিত্য। মন খারাপ হয়ে যায়।
• তারপরও কিন্তু সিরিয়াস চরিত্রে আপনাকে খুব কম পরিচালকই নিয়েছেন।‌
•• সেটা তো ঠিকই। আমি কিন্তু অন্যরকম চরিত্রের জন্যে পরিচালকদের বলতে কসুর করি না। পার্ট চাইতে আমার কোনও লজ্জা নেই। এবার তো সেটা পরিচালকের ব্যাপার।
• সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘‌হারবার্ট’‌ তো একটা অন্যরকম কাজ আপনার কেরিয়ারে?‌
•• অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। লাল বা সুমন সেই বিরল পরিচালকদের একজন যে অন্যরকম একটা চরিত্রে আমাকে ভেবেছে। তারপর, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌য় আমাকে বিজন ভট্টাচার্যের চরিত্র দিয়েছেন।
• বিজন ভট্টাচার্যের চরিত্রে তো নাটকেও আপনাকে নিয়েছেন ব্রাত্য বসু?‌
•• অবশ্যই। ঋত্বিক ঘটকের ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌য় বিজন ভট্টাচার্য যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, ব্রাত্য আমাকে মঞ্চে সেই চরিত্র দিয়েছেন। কমলেশ্বরের ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌য় অবশ্য আমিই বিজন ভট্টাচার্য। ওঁর সঙ্গে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গেছে। ওঁর ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা ‘‌হারবার্ট’‌-‌এই তো আমি প্রধান চরিত্র করি সুমনের ছবিতে।
• শঙ্কুর শুটিং করতে তো আপনার ব্রাজিল ঘোরাও হয়ে গেল?‌
•• হ্যাঁ, একবার নয়, দু’‌বার। সুন্দরদার (‌ধৃতিমান)‌ শরীর খারাপ হওয়ায় একবার ফিরে আসতে হয়েছিল। পরে আবার গিয়ে শুটিং হল সাওপাওলোয়, আমাজনে। এ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা।
• সিনেমায় মূলত কমেডি অভিনেতা হিসেবে চিহ্নিত হলেও গ্রুপ থিয়েটারের নাটকে কিন্তু আপনি সিরিয়াস চরিত্রেই অভিনয় করেন।
•• তবে, হাতিবাগানের বোর্ড থিয়েটারে কমেডি-‌ই করতে হত। ‘‌সম্রাট ও সুন্দরী’‌তে অবশ্য একবার নায়কের চরিত্রে সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারে আমার অভিনেতা সত্ত্বাকে অনেক বেশি করে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছি। ব্রাত্য বসুর নির্দেশনায় ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌ তো করেইছি। এছাড়া, বেশ কিছু ভাল নাটকে সিরিয়াস চরিত্র করার সুযোগ পেয়েছি। সম্প্রতি গণকৃষ্টির ‘‌কীরিটীর নোটবুক’‌ করেছি অমিতাভ দত্তর নির্দেশনায়, আর উষ্ণিক-‌এর ‘‌বাবাই’‌তে করছি ঈশিতা মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়।
• স্ত্রীর পরিচালনায় ‘‌বাবাই’‌। স্ত্রী তাহলে ঠিকঠাক চরিত্র দিচ্ছে থিয়েটারে?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ অন্তত, ভাবছে, এটা বলা যায়। আমিও চেষ্টা করি আস্থার মর্যাদা দিতে।
• দর্জিপাড়ার ছেলে আপনি। অভিনয়ের হাতে খড়ি কি ওখানেই?
•• হ্যাঁ। তখন নানান গ্রুপে অভিনয় করে খিদে মেটাই। আর জানেন, ওখানে দেবনারায়ণ গুপ্তর ‘‌শতমিতা’‌ গ্রুপেও তাঁর পরিচালনায় হয়েছিল ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌। সেখানে অবশ্য বিজন ভট্টাচার্যর চরিত্র করার মতো বয়স হয়নি আমার। ছোটভাইয়ের চরিত্র করেছিলাম।
• এবছর দু’‌দুটো ছবির নায়ক আপনি। ‘‌মহালয়া’য় করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, এবার আসছেন নকুড়বাবু হয়ে।
•• হ্যাঁ, আমার কেরিয়ারে এটা একটা উল্লেখযোগ্য বছর। দু’‌দুটো ছবিতে নায়ক। (‌হাসতে হাসতে)‌ ভাবা যাচ্ছে না!‌
• প্রসেনজিতের সঙ্গে সিনেমায় আপনার জুটি তো রেকর্ড ছুঁয়েছে?‌
•• তা ছুঁয়েছে। আমরা দুজনে একসঙ্গে এত ছবি করেছি যে প্রসেনজিতের কোনও নায়িকাও সেটা করেনি।
• ‘‌মহালয়া’‌র প্রযোজক তো প্রসেনজিৎ। এটাও নতুন জুটির সূচনা?‌
•• হ্যাঁ, প্রযোজক, অভিনেতা জুটি। তবে, আর একটা জুটিও আছে প্রসেনজিতের সঙ্গে। পরিচালক প্রসেনজিতের প্রথম ছবি ‘‌আমি সেই মেয়ে’‌তেও আমি অভিনয় করেছি।
• এখন তো আবার টিভিতে সিরিয়াল করছেন?‌
•• হ্যাঁ, ‘‌কলের বউ’‌ আর ‘‌কণক কাঁকন’‌। স্নেহাশিস চক্রবর্তীর ধারাবাহিক।
• যাত্রা এখন বন্ধ?‌
•• বছর পাঁচেক আর যাত্রা করছি না। আমি ছবির কাজ ছেড়ে যাত্রা করতে গিয়েছিলাম। পুরো সময়টাই যাত্রাকে দিয়েছিলাম। যেটা করি, সেটা আমি মন দিয়ে করতে চাই। এখন যাত্রায় সেই সময়টা দিতে পারব না।
• এখন অন্য যাত্রা শুরু?‌ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ থেকে নকুড়বাবু?‌ তারপর?‌
•• অভিনয় জীবনের এই পর্বে যাত্রাটা যদি আবার নতুন বাঁক নেয়, খুব খুশি হব। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর আশীর্বাদ আর নকুড়বাবু ও প্রোফেসর শঙ্কুর শুভেচ্ছা চাই।
শুভেচ্ছা আমাদেরও। যাত্রা শুভ হোক।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top