আজকালের প্রতিবেদন: যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। সেই মানুষের ভিড় কখনও লোখান্ডওয়ালার সেলিব্রেশন স্পোর্টস ক্লাবের সামনের রাস্তায়, সেই ভিড় কখনও উপচে পড়েছে কাছাকাছি গাছগুলোতে, উপচে পড়েছে গ্রিলের গেটের মাথায়। অর্জুন কাপুর হাতজোড় করে বারবার অনুরোধ করছেন সেই ভিড়কে, যাতে কোনও অঘটন না ঘটে। কিন্তু সেই অনুরোধের কোনও প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তা ছিল যথেষ্ট সংযত ও শান্ত। ভারতীয় সিনেমার প্রথম মহিলা সুপারস্টারের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে শেষ সেলাম জানিয়ে নিচ্ছিলেন সবাই।
আর হলের ভেতরে তখন শান্তিতে শুয়েছিলেন শ্রীদেবী। পরনে টকটকে লাল কাঞ্জিভরম, কপালে মানানসই টিপ, ঠোঁট দুটো একটু খোলা। মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছেন। একটু পরেই জেগে উঠবেন। কিন্তু সেই ঘুম যে আর কোনওদিন ভাঙবে না, সেই চিরসত্য নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছিলেন সবাই। একটা শোক গুমরে গুমরে উঠছিল প্রত্যেকের মনেই। সেই চাপা শোকের ছাপ পড়েছিল তাঁদের চোখে-‌মুখে।
গত শনিবারই দুবাইতে আকস্মিক প্রয়াণ ঘটেছিল ৫৪ বছরের এই অভিনেত্রীর। দুবাই পুলিসের ছাড়পত্র নিয়ে মঙ্গলবার মুম্বইতে ফিরে আসে তাঁর দেহ। সঙ্গে ছিলেন স্বামী বনি কাপুর ও বনি-‌পুত্র অর্জুন কাপুর। বুধবার তাঁর মরদেহ শেষ দর্শনের জন্যে সকাল ৯টায় নিয়ে আসা হয় লোখান্ডওয়ালার সেলিব্রেশন স্পোর্টস ক্লাবে। 
সেখান থেকেই জাতীয় পতাকায় মুড়ে, গান স্যালিউটে সম্মান জানিয়ে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হল শেষ যাত্রায় ভিলে পার্লেতে। তাঁর এই শেষযাত্রায় সঙ্গ নিলেন তাঁর পরিবার, বন্ধু ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী। তার আগে হাতে ফুল নিয়ে অভিনেত্রীর শেষ যাত্রার জন্যে প্রার্থনা করলেন সবাই।
শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী এদিন তাঁর দেহ সাজানো হয়েছিল লিলি, জুঁই আর লাল গোলাপ দিয়ে। হলের ভেতর তখন হাজির তাঁর স্বামী বনি কাপুর, দুই দেওর অনিল কাপুর ও সঞ্জয় কাপুর। ছিলেন হর্ষবর্ধন কাপুর, অর্জুন কাপুর, সোনম কাপুর, রিয়া কাপুর প্রমুখ পারিবারিক সদস্য। একটু পেছনে হলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রীদেবীর দুই মেয়ে জাহ্নবী ও খুশি। কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের চোখ তখন ফুলে গেছে। কিন্তু চোখের জল তখনও বাঁধ মানেনি। 
শেষ যাত্রায় তাঁকে দেখতে এসেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন ফ্যাশন ডিজাইনার মণীশ মালহোত্রা। তাঁকে তখন সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন করণ জোহর। কিন্তু তাঁরও তখন একই অবস্থা। শ্রীদেবীর মরদেহের পাশেই বসেছিলেন রানী মুখার্জি। সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন কান্নায় ভেঙে–‌পড়া সোনম কাপুরকে।
এই হলে ঢোকার জন্যে ছিল তিনটি দরজা। একটি ভি আই পি-‌দের জন্যে, একটি সংবাদ মাধ্যমের জন্যে অন্যটি সাধারণ মানুষের জন্যে। তবে এই গেটটি খোলা হয় সকাল ১০টায়। উৎসাহী মানুষের ভিড় সামাল দেওয়ার জন্যে ছিলেন প্রায় ২০০ পুলিসকর্মী। ঘোষণা করা হয়, এই শেষ যাত্রার ছবি যেন কেউ মোবাইলে না তোলেন।
সারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে তাঁকে শেষ সম্মান জানানোর জন্যে হাজির হয়েছিলেন অসংখ্য অনুরাগী। কেউ এসেছিলেন কর্ণাটক থেকে কেউ বা চেন্নাই থেকে। দলে দলে। বুধবার সকাল ৬টা থেকেই এই ভিড়টা হাজির হয়ে গিয়েছিল সেলিব্রেশন স্পোর্টস ক্লাবের সামনে। গত দু’‌দিন থেকেই এঁরা ছিলেন মুম্বইতে। অভিনেত্রীকে শেষ দেখার জন্যে এঁরা ভিড় জমিয়েছিলেন অনিল কাপুরের বাড়ির সামনে। সেখানে বিনিদ্র দুটি রাত কাটাবার পর এঁরা বুধবার সাত সকালেই চলে এসেছিলেন লোখান্ডওয়ালায় নায়িকার শেষ যাত্রার সঙ্গী হওয়ার জন্যে। জানালেন, ‘‌আমরা ঠিক করেছিলাম ওঁকে শেষ সম্মান না জানিয়ে মুম্বই ছাড়ব না।’‌
১২টার পরে স্পোর্টস ক্লাব থেকে ভিলে পার্লে অভিমুখে অন্তিম যাত্রা শুরু করলেন শ্রীদেবী। তাঁর সেই যাত্রায় সঙ্গী হলেন তাঁর সহশিল্পীরা। কে ছিলেন না সেই যাত্রায়?‌ ছিলেন রেখা, জয়া বচ্চন, ঐশ্বর্য রাই, হেমামালিনী, মাধুরী দীক্ষিত থেকে শুরু করে সঞ্জয় দত্ত, অজয় দেবগণ, কাজল, বিদ্যা বালন, ইমতিয়াজ আলি, সাজিদ খান, আদিত্য রায় কাপুর প্রমুখ। ছিলেন জন আব্রাহাম, চিরঞ্জীবী, রবিনা ট্যান্ডন, জয়াপ্রদা, টাবু, সুস্মিতা সেন। ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা আর হাজার হাজার অনুরাগী। ভিলে পার্লের শ্মশানে হয়ত তাঁর নশ্বর দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু তিনি উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন তাঁর ৩০০ ছবিতে আর অসংখ্য ভারতবাসীর হৃদয়ে।  ‌

জনপ্রিয়

Back To Top