অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী, হয়ে গেলেন বাংলার প্রথম টিভি চ্যানেলের ঘোষিকা, সঞ্চালিকা। ভাবনা-‌চিন্তা করেই কি পথ পাল্টালেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ না, না। আমি জীবনে কোনও সিদ্ধান্তই ভেবে-‌চিন্তে প্ল্যান করে নিইনি। জীবনে অনেক অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। অনেক ভাল কিছু। অনেক দুর্যোগও। স্রোতের মতো এসেছে। আমি তাদের অ্যাকসেপ্ট করেছি। গ্রহণ করেছি। তবে, হ্যঁা, রবীন্দ্রসঙ্গীতটা মন দিয়েই শিখেছিলাম ‘‌দক্ষিণী’‌তে। পুরো ১১ বছর। বাঙালি পরিবারে যেমন নাচ, গান শেখার রেওয়াজ ছিল, আমিও সেভাবেই বড় হয়েছি। আমি তখন আকাশবাণীর রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী। রেডিও অফিসে যাচ্ছিলাম মিনিবাসে করে, রেকর্ডিং ছিল। একজন বন্ধু ছিল সঙ্গে। সে বলল, জানিস এখানে দূরদর্শন আসছে। রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে তোড়জোড় চলছে। একদিন দেখতে যাবি?‌
• দূরদর্শনের স্টুডিও দেখতে গিয়েই কি আগ্রহ তৈরি হল?‌
•• না, না। বন্ধুরা মিলে দেখতে গিয়েছিলাম। আমি তখন শান্তিনিকেতনে গ্র‌্যাজুয়েশন করে এসে যাদবপুর থেকে এম এ-‌ও করে ফেলেছি। এমনিই গিয়েছিলাম দেখতে। তখন কিছু কিছু অনুষ্ঠান তুলে রাখা হচ্ছে। মানে, ব্যাঙ্কিং করা হচ্ছে। ক্যান্টিনে গিয়ে চা খেলাম। আড্ডা দিলাম। আমার এক বন্ধু ইন্দ্রজিৎ নিয়ে গিয়েছিল আমাদের। আমরা আড্ডা দিচ্ছি, হাসছি, কথা বলছি। আমাকে লক্ষ্য করেছিলেন কলকাতা দূরদর্শনের তখনকার ডিরেক্টর মীরা মজুমদার। উনি আমাকে ডেকে বললেন, তুমি আমাদের অ্যানাউন্সার হবে?‌ আমি বললাম, আমি তো গান করি। উনি হেসে বললেন, অ্যানাউন্সার হলে গান গাইতে তো বাধা নেই।
• সেদিনই কি হ্যঁা বলে দিলেন?‌
•• না, না। তখন তো আমার বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ির অনুমতি তো নিতে হবে। আমি বললাম, বাড়িতে কথা বলে জানাব।
• আপনি তো ‘‌দক্ষিণী’‌র প্রতিষ্ঠাতা শুভ গুহঠাকুরতার ছেলে ভীষ্ম গুহঠাকুরতাকে বিয়ে করেন। প্রেমটা কি দক্ষিণী-‌কানেকশন?‌
•• সেটা কিছুটা তো বটেই। তবে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ভূমিকা ছিল। আমি শান্তিনিকেতনে যখন পড়তাম, তখন বেশ কিছুদিন মোহরদির (‌কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়)‌‌ বাড়িতেই ছিলাম। মোহরদি কলকাতায় এলে আমার শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। আমার শাশুড়ি মা (‌মঞ্জুলা গুহঠাকুরতা) আর মোহরদি মিলেও প্ল্যান করেছিলেন আমার আর ভীষ্মর বিয়ের।
• দূরদর্শনের ঘোষিকা হওয়ার জন্যে শ্বশুরবাড়ির অনুমতি পেতে নিশ্চয়ই অসুবিধে হয়নি?‌
•• হয়নি আবার?‌ আমার শ্বশুরমশাইয়ের আপত্তি ছিল। বাড়ির বউ আবার চাকরি করবে কী?‌ এটাই ছিল ওঁর যুক্তি। কিন্তু আমার শাশুড়ি-‌মা আমাকে কাজটা করতে বলেছিলেন। সমর্থন করেছিলেন আমার বড় ভাসুর (‌সুদেব গুহঠাকুরতা)‌। শেষ পর্যন্ত আমার বন্ধুদের চাপে আমি ইন্টারভিউ এবং অডিশন  দিয়েছিলাম। এবং ঘোষিকা সঞ্চালিকা হয়ে গেলাম কলকাতা দূরদর্শনের। সেই ৭৫ এর আগস্টে।
• এবং তখনই শুরু হল বাংলা দূরদর্শনের প্রথম তারকা-‌জুটির উত্থান—শাশ্বতী গুহঠাকুরতা আর চৈতালি দাশগুপ্ত।
•• দর্শকরা আমাদের ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। আসলে, সেই তো প্রথম টেলিভিশন এল কলকাতায়। এটা একটা বড় কারণ। তারপর, সত্যিই আমাদের একটা অদ্ভুত জুটি তৈরি হয়ে গেল। আমি হয়ে গেলাম চৈতালির রানি, আর ও হয়ে গেল আমার কেয়া। দুজনের ডাকনামেই আমাদের যত ডাকাডাকি। কত মানুষ ‘‌দর্শকের দরবারে’-‌তে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছেন, আমরা দুই বোন কী না। আসলে, আমরা বোধহয় দুই বোনেরও অধিক।
• এত বন্ধুত্ব, এমন জুটি, কিন্তু একই পেশায়‌‌, একই টেলিভিশনে। কখনও প্রতিযোগী বলে মনে হয়নি পরস্পরকে?‌
•• না, প্রতিযোগী বলে কখনও আমাদের মনে হয়নি পরস্পরকে। কখনও কেয়ার অনুষ্ঠান দেখে এত ভাল লেগেছে, যে, এরকম মনে হয়েছে, পরের অনুষ্ঠানটা আমাকে আরও ভাল করতে হবে। এটা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু দুজনের ভাল-‌কে আমরা উচ্ছ্বসিতভাবে ভাল বলতে পেরেছি। আমরা পরস্পরের সুখে, দুঃখে সবসময় পাশে থেকেছি। আমরা তো বলি, আমাদের ৪৪ বছরের ঘর-‌সংসার। আমাদের নিজস্ব সামাজিক পরিসরে অনেক ঝড়-‌ঝাপটা এসেছে, কখনও দুরত্ব হয়েছে, কিন্তু শাশ্বতী-‌ চৈতালির সংসারে কোনও দূরত্ব কখনও তৈরি হয়নি।
• সংসারে দূরত্ব হয়েছে বলেই কি আপনি গুহঠাকুরতা পরিবার থেকে দূরে থাকেন, একা?‌ ভীষ্ম গুহঠাকুরতার সঙ্গেও কোনও যোগাযোগ নেই?‌
•• আমার পরিবার তো ওটাই, গুহঠাকুরতা পরিবার। কোনও একটা আদর্শের সংঘাতে আমি ভীষ্মর থেকে আলাদা থাকি। কিন্তু ওটাই আমার পরিবার। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার একটা বড় আবহ আছে আমাদের গুহঠাকুরতা পরিবারে। আমার মেয়ে (‌শ্রেয়া)‌ এবং ছেলে (শৌনক)‌ দুজনেই বিদেশে থাকে। কিন্তু সব মিলিয়েই তো আমাদের গুহঠাকুরতা পরিবার। আর, ভীষ্ম-‌র সঙ্গেও আমার কোনও তিক্ততা নেই। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে আড্ডা মারি, বেড়াতে যাই। আমার জীবন, আমার শান্তিনিকেতন পর্ব, আমার কর্মজীবন, আমার আর চৈতালির বন্ধুত্ব, আমাদের গুহঠাকুরতা পরিবার—সবটাই আমার জীবনে ওতোপ্রোতভাবে আছে।
• সঞ্চালিকা হিসেবে জনপ্রিয়। অভিনয়ের সিদ্ধান্ত কবে নিলেন?‌
•• ওই যে বললাম, ভেবে-‌চিন্তে প্ল্যান করে কিছু করিনি। প্রথমে কৌশিক গাঙ্গুলির একটা টেলিফিল্ম করেছিলাম। ‘‌অমানিশা’‌। সেই শুরু। তবে, চিরকালই বেছে অভিনয় করার চেষ্টা করেছি।
• মঞ্চেও তো অভিনয় করেছেন?‌
•• হ্যঁা, কৌশিক সেনের পরিচালনায় করেছি ‘‌কলকাতার ইলেকট্রা’‌, ‘‌ভাল রাক্ষসের গল্প’‌। মনীশ মিত্রর সঙ্গে ‘‌ডাকঘর’‌, ‘‌মেঘনাদবধ কাব্য’‌ করেছি।
• সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘‌আবহমান’‌?‌
•• অবশ্যই ‘‌আবহমান’‌ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরির ‘‌অন্তহীন’‌ও আমার খুব প্রিয়। বড়পর্দায় যে খুব ডাক পাই তা নয়। সম্প্রতি হরনাথ চক্রবর্তীর একটা ছবি করলাম। ছবির নামটা এখনও ঠিক হয়নি।
• কিন্তু আপনি তো নিয়মিত সিরিয়াল করছেন। এখন ‘‌বকুলকথা’‌য়। ধারাবাহিক করতে উৎসাহ পান?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ টাকা তো রোজগার করতে হবে?‌ তবে, ধারাবাহিকে এখন দিনে একটা করে এপিসোড তুলতেই হয়। ফলে, চাপ থাকে। সেই চাপটা নিতেই হয়। তবে, আমি তো একসঙ্গে একাধিক সিরিয়াল করি না। কিন্তু, যখন করি, মন দিয়েই অভিনয়টা করি। হেলা-‌ফেলা করি না।
• কিন্তু কোন মাধ্যমে অভিনয় করতে সবচেয়ে ভাল লাগে?‌
•• অবশ্যই থিয়েটার। এর মতো আনন্দ কিছুতেই নেই। অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ জায়গা হল মঞ্চ।
• সঞ্চালনা, অভিনয় করতে করতে রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে যে অনেকটা দূরে চলে গেছেন, কষ্ট হয় না?‌
•• খুব কষ্ট হয়। আমার মা বলতেন, গানটা ছেড়ো না। এটাই চিরকাল তোমার সঙ্গে থাকবে। কিন্তু, আমিই বোধহয় রাখতে পারলাম না। এখন গাইতে গিয়ে যখন দেখি, মনের মতো গাইতে পারছি না, কষ্ট হয়। তবে, আমার মেয়ে (‌শ্রেয়া গুহঠাকুরতা)‌ তো গায়। ওর গানেই এখন আমি শান্তি খুঁজে পাই। জীবন ঠিক কোনও-‌না-‌কোনওভাবে সুর পৌঁছে দেয়। আমাকেও দিয়েছে।
• শাশ্বতী-‌চৈতালি জুটির ৪৫ বছর উদযাপন করবেন নাকি, কোনও অনুষ্ঠানে?‌
•• এভাবে তো ভাবিনি। আপনি বললেন, ভাবনাটা ভেতরে নিলাম। দেখি, কেয়ার সঙ্গে কথা বলি। অবশ্য, আমাদের বন্ধুত্বের উদযাপন চলতেই থাকে, সারা বছর।

‘‌দর্শকের দরবারে’‌ অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রোডাকশনের সহকর্মীদের সঙ্গে চৈতালি, শাশ্বতী।

জনপ্রিয়

Back To Top