অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌ঘুনপোকা’‌, ‘‌পারাপার’‌, ‘‌মানবজমিন’‌-‌এর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে তাঁর শবর কাহিনীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। লেখক স্বয়ংই চেয়েছেন অন্য একটা পথে ‘‌শবর’‌-‌এ হাঁটতে। সংলাপ নির্ভর শবর-‌কাহিনীতে প্রচুর ছমছমে ব্যাপার আছে, থ্রিল আছে, সর্বোপরি আছে এক সরকারি গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত। দুই মলাটে বন্দী এই শবরকে নিয়ে তেমন আলোচনাও আগে হয়নি। কিন্তু অরিন্দম শীল এই শবরকে প্রথম সিনেমায় এনেই বিপুল জনপ্রিয়তা দিলেন ‘‌এবার শবর’‌-‌এ। বক্স অফিসে ফেলুদা আর ব্যোমকেশের সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু করল শবর দাশগুপ্ত। ‘‌ঈগলের চোখ’‌ পেরিয়ে এবার পর্দায় এল তৃতীয় শবর, শীর্ষেন্দুর ‘‌প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম’‌ নিয়ে অরিন্দম শীলের ‘‌আসছে আবার শবর’‌। আসছে, মানে, এসে গেছে।
‘‌প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম’‌ একেবারেই শীর্ষেন্দু-‌ঘরানার নাম। সেই অংশটিকে অগ্রাহ্য করেননি অরিন্দম। শবর দাশগুপ্তর কঠিন, কঠোর পারফরমেন্সের সঙ্গে সেই কাহিনীও আঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে আছে এই ছবিতে। সেই কাহিনী সুমনা (‌অরুণিমা ঘোষ)‌ ও বিজয় (‌ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত)‌-‌র।
কিন্তু ছবির কেন্দ্রে আছে এই সময়ের কিছু ‘‌দিগভ্রষ্ট’‌ ছেলেমেয়ের গল্প। আছে সাইবার ক্রাইমের ছমছমে আবহ। আছে ডেটিং ওয়েবসাইট-‌এর মাধ্যমে যুবতীদের শরীরের বিনিময়ে টাকা রোজগারের অন্ধকার পথ। সেই পথে গিয়েই কি খুন হচ্ছে একের পর এক মেয়ে?‌
শবর-‌কাহিনী যেহেতু সংলাপ নির্ভর, তাই ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপট তৈরিতে বড় ভূমিকা নিয়েছেন দুই চিত্রনাট্যকার—পদ্মনাভ দাশগুপ্ত ও অরিন্দম শীল স্বয়ং। সেই বুনন বেশ জমজমাট, তৃতীয় শবরেও। চন্দননগরকে বেশ সুন্দর ধরেছেন দক্ষ চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার।
ছবির কাহিনীবৃত্তে এক-‌আধবার অসঙ্গতি এসেছে, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যে যুবক ততটা অভিজাত এবং ধনী নয় বলে হতাশায় আক্রান্ত, রাতারাতি সে কী করে দশ লাখ টাকা জোগাড় করে ফেলে, সেই প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। একটা ‘‌চেজিং’‌ দৃশ্য অতি দীর্ঘায়িত। এবং শবর যেহেতু লালবাজারের গোয়েন্দা অফিসার, তাই তার সঙ্গে কেন পুলিস বাহিনী নেই অপরাধী ধরার সময়, সেই প্রশ্নও ওঠে।
কিন্তু, থ্রিলারে এবং অ্যাকশনে সেই দুর্বলতা ঢেকে দিতে চেয়েছেন পরিচালক। এবং তৃতীয় শবর সত্যিই বহু জায়গাতেই প্রবল রোমাঞ্চকর, যা টানটান রাখে দর্শকদের। যুবতী-‌কন্যাদের একের পর এক খুন, বাংলা থ্রিলার ছবিতেও আগে দেখা যায়নি। এবং সন্দেহ নেই, অপরাধীকে হাতে-‌নাতে ধরার আগে পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা বজায় রাখতে পেরেছেন পরিচালক।
এই উত্তেজনা বজায় রাখার অস্ত্র হিসেবে দুই দক্ষ অভিনেতাকে ব্যবহার করেছেন অরিন্দম শীল। আগের দু’‌বার তো ছিলেনই, এবারও শবর দাশগুপ্ত যথারীতি শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। এবার শাশ্বত আরও তীক্ষ্ণ, আরও কঠোর এবং আরও অ্যাকশন-‌পারদর্শী। পাশাপাশি কঠিন মুখে তাঁর রসবোধের প্রকাশ—অনবদ্য। তবে, শবরের পেটেন্ট ডায়ালগ—‘‌এমনি বলছি’‌—এবার কম শোনা গেছে।
দ্বিতীয় জন—ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। একটা সত্যিই কঠিন চরিত্রকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে স্বাভাবিক করে তুলেছেন ইন্দ্রনীল। অভিনয়ের দাঁড়িপাল্লাকে দুদিক থেকে টান-‌টান রেখেছেন শাশ্বত ও ইন্দ্রনীল।
শবরের সঙ্গী নন্দর চরিত্র এবার আরও বিস্তৃত। এবং সুন্দর অভিনয় করেছেন শুভ্রজিৎ দত্ত। সিরিয়াস ভঙ্গীতে শাশ্বত ও শুভ্রজিৎ-‌এর কমিক যুগলবন্দীও বড় পাওনা। গৌরব চক্রবর্তীও পুলিস অফিসারের চরিত্রে স্বাভাবিক। অল্প অবকাশেই মীর তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। অঞ্জনা বসুও ভাল অভিনয় করেছেন। ললিতা চট্টোপাধ্যায়কে মনে থাকবে। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের কথাও উল্লেখ করা দরকার। দিতি, দর্শনা, প্রিয়াঙ্কা, তুহিনা, অনামিকা আছেন ছবিতে। এঁরা কেউ কেউ প্রথম অভিনয় করলেন। ফলে, অভিনয়ে হয়ত কেউ কেউ ততটা পটুত্ব দেখাতে পারেননি। কিন্তু নতুনদের এমন একটা জনপ্রিয় সিরিজের ছবিতে সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য পরিচালক অরিন্দম শীলের।
বিক্রম ঘোষের সঙ্গীত এই ছবির মেজাজ-‌মর্জিকে স্পষ্ট করে তুলেছে, যা প্রশংসাযোগ্য।
সব মিলিয়ে, তৃতীয় শবর বেশ জমজমাট হয়েই এল। শুধু থ্রিলার নয়, তৃতীয় শবরে একটি প্রেমের উপাখ্যান অন্য মাত্রা যোগ করেছে। শোনা যাচ্ছে নতুন শবর-‌কাহিনী লিখছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং সেটা নাকি এই পরিচালকের জন্যেই। ফলে, চতুর্থ শবরের জন্যে তৈরি হল প্রত্যাশা।‌

দা  রু  ণ
জুন মালিয়া: পরপর তিনটে শবর পরিচালনা করলেন অরিন্দম শীল। বইয়ের পাতায় ‘‌ব্যোমকেশ’‌ বা ‘ফেলুদা‌’‌ যেমন জনপ্রিয়, শবর তেমন ছিলনা। কিন্তু শবরকে দর্শকদের সামনে নিয়ে এলেন পরিচালক এবং জনপ্রিয় করলেন। দেখলাম তৃতীয় শবর -‌ ‘আসছে আবার শবর‌’‌। আমার দারুণ লেগেছে। সবথেকে ভাল লেগেছে ছবির গতি।‌ কী চমৎকার!‌‌‌
সু  পা  র্ব
পার্ণো মিত্র: ‘‌আসছে আবার শবর’‌ এককথায় সুপার্ব। থ্রিল, সাসপেন্সের এত সুন্দর মিশেল কী বলব!‌ আর শাশ্বত দা এবং শুভ্রজিৎ দা’‌কে দেখে তো আমি পুরো বোল্ড আউট!‌ কী অসাধারণ অভিনয় করেছেন ওঁরা দুজন। অরিন্দম দা’‌র মেকিং চমৎকার। দ্রুত গতির রোমহর্ষক কাহিনীতে যেভাবে টুক করে একটা প্রেমের গল্প গুঁজে দিয়েছেন সেটা আমার খুব কিউট লেগেছে!‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top