আজকালের প্রতিবেদন
আগামিকাল ২ মে, সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষের শুরু। জন্মেছিলেন উত্তর কলকাতার গড়পার রোডে ১৯২১ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এমন আন্তর্জাতিক মানের বহুমুখী প্রতিভা আর দেখা যায়নি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সারা বাংলা জুড়ে সত্যজিতের শততম জন্মদিন পালনের নানান আয়োজনে মুখর থাকার কথা ছিল। গোটা বাংলা জুড়ে সত্যজিৎ–‌বন্দনা শুরু হত। একথা সত্যি, যখন কোনও মহান প্রতিভা আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বা বিশ্লেষণের ধরা–‌ছোঁওয়ার বাইরে চলে যায়, তখন তাঁদের কাছে টানার নানান পদ্ধতি অবলম্বন করি। আগেও দেখা গেছে, কোনও কৃতী মানুষকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে আমরা যেভাবে মেতে উঠি, তাঁকে বন্দনা করি, কিন্তু তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে আমরা একটু মুখ ঘুরিয়েই থাকি। বিশ্লেষণ ছেড়ে তাঁকে মাথায় রেখে, পুজোর বেদিতে রেখে ভক্তিরসে অবগাহন করার চেষ্টা করি।
বহুমুখী ব্যক্তিত্বের প্রতিভূ তিনি। তুলি, কলম, ক্যামেরা ও সুরের প্রয়োগে তাঁর নিপুণ দক্ষতা সত্যিই অবিস্মরণীয়। সাহিত্যে চলচ্চিত্রে সঙ্গীতে শিল্পে পুরনো ধারাকে সরিয়ে রেখে নতুন রূপ দিয়েছেন। বইয়ের প্রচ্ছদ, গ্রন্থচিত্রণে তিনি নতুন যুগের হাওয়া বইয়ে দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে। বাংলা বর্ণলিপির চরিত্র চিত্রণে তাঁর ভাবনার স্বাক্ষর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ আজকাল পত্রিকার নামাঙ্কন। চলচ্চিত্রে এনেছেন নবযুগ। পত্রিকা সম্পাদনাতেও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের যখন অন্তিম পর্ব চলছিল, ঠিক তখনই আবির্ভাব হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘‌ফেলুদা’‌র। তিন বয়সের, তিন ভিন্ন চরিত্র মিলে ফেলুদা অ্যান্ড কোং–‌এর মতো ত্রিরত্ন ভূভারতে তো নয়ই, গোটা বিশ্বে মেলে কদাচিৎ। তাঁর আর এক সৃষ্টি বিজ্ঞানী প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুও আপামর বাঙালি পাঠকের অতি প্রিয় চরিত্র। সব মিলে সত্যিই তাঁর প্রতিভার তুলনা হয় না। কিন্তু আমরা সত্যিই কি সেভাবে সত্যজিৎকে নিয়ে চর্চা করেছি?‌ সত্যজিতের ফিল্মের কথাই ধরা যাক। জাপানি চিত্রপরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া একবার বলেছিলেন, ‘‌যিনি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র কখনও দেখেননি, তিনি যেন এই পৃথিবীতে বাস করেও সূর্য এবং চন্দ্র দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছেন নিজেকে।’‌
যাঁর ছবিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন আর এক মহান পরিচালক, আমরা সেভাবে কখনও বোঝবার চেষ্টা করেছি?‌ ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের মধ্যে গুটি কয়েক ক্লাসে কি সত্যিই সত্যজিতের সিনেমার বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখা যায়?‌ শ্যাম বেনেগাল একটা কথা প্রায়ই বলতেন— ‘‌সত্যজিৎ রায়ই হচ্ছেন একমাত্র ভারতীয় চলচ্চিত্রকার যিনি ছবি করেছেন ভারতীয় পদ্ধতিতে।’‌
আমরা ক’‌জন এই ভারতীয় পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছি?‌ তাঁর চলচ্চিত্রের সঙ্গীত নিয়েও সেভাবে আলোচনা করিনি কখনও। বিদেশে দেখেছি গোটা স্টেজ জুড়ে শতাধিক বাদ্যযন্ত্র সহযোগে জনপ্রিয় হলিউডি ছবির সঙ্গীত পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বাজানো হচ্ছে। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। কয়েকটি ছবির গান ছাড়া সঙ্গীত পরিচালক সত্যজিৎ আমাদের কাছে শুধু মোবাইলের রিংটোন হয়েই রয়ে গেলেন। চর্চা কোথায়?‌

 

তাঁর করা গ্রন্থ–‌প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন, পোস্টার দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু সেসব শিল্পকে কি একটা স্থায়ী প্রদর্শনী করে রাখা যেত না?‌ আমাদের সামনেই ছিল তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির নিজের নকশায় তৈরি বাড়ি। এই বাড়িতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের শ্রেষ্ঠ ছাপাখানা, বাংলার শ্রেষ্ঠ শিশু–‌কিশোর পত্রিকা ‘‌সন্দেশ’‌–‌এর প্রকাশ। এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের। আমরা পারতাম না সেই বাড়িটিকে একটি স্থায়ী মিউজিয়াম করে গড়ে তুলতে?‌ যেখানে শুধু সত্যজিৎ নন, সাজিয়ে রাখা যায় তাঁর পিতা ও পিতামহের কাজ। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য এক ধারা। সত্যজিৎ রায় তাঁর চলচ্চিত্রের প্রায় সব কিছু নিজে হাতে করতেন। চিত্রনাট্য, অভিনেতা–‌অভিনেত্রী নির্বাচন, তাঁদের পোশাক, সেট ডিজাইনের নকশা থেকে শুরু করে ছবির পোস্টার— সব কিছু। আর সেই সব সৃষ্টির আঁতুড় ঘর ছিল তাঁর খেরোর খাতা। স্থায়ী মিউজিয়ামে থাকবে সেই সব খাতার অভূতপূর্ব পৃষ্ঠার প্রতিলিপি। আমরা জানি, এখনও অতটা দেরি হয়নি। তাঁর শততম জন্মদিনে আসুন না, একবার চেষ্টা করে দেখি।

জনপ্রিয়

Back To Top