সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
বাংলা ছায়াছবিতে আরেকটি বিষাদগাথা রচিত হল। সুপ্রিয়া দেবী বা সুপ্রিয়া চৌধুরি হয়তো অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া আমাদের সিনেমার ইতিহাসে একটি অপূরণীয় ক্ষতি হিসাবে চিহ্নিত হবে। তাঁর মূল কারণ এই, যে সুপ্রিয়া শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না। তাঁকে একজন সপ্রতিভ যুবতী হিসাবে বর্ণনা করা সিনেমার একমাত্র কাজ ছিল না। বস্তুত তিনি যখন আমাদের ছায়াছবির জগতে আসেন, তখন নায়িকাদের যে অভিব্যক্তির ধরণ ছিল, তাঁরা রোম্যান্টিক, পেলব ও গীতিকবিতা মুখর হবে। কানন দেবী থেকে সুচিত্রা সেন পর্যন্ত সেই ঐতিহ্য নিরন্তর বয়ে চলেছে। 
সেখানে সুপ্রিয়া নিজেই এক লাবণ্য। 
‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌ বা ‘‌কোমল গান্ধার’‌-‌এর মতো ছবিতে সুপ্রিয়ার যে অভিনয়ের কথা আমরা বলি, সেই কথা আপাতত একটু সরিয়ে রেখে, যদি আমরা বাণিজ্যিক ছবির দিকে তাকাই,‌ তাহলে আমরা দেখব, অসিত সেনের ‘‌স্বরিলিপি’‌-‌তে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে, অজয় করের ‘‌শুন বর নারী’‌-‌তে উত্তম কুমারের বিপরীতে, এমনকী ১৯৭৩ সালে ‘‌বনপলাশীর পদাবলিতে’‌ উত্তম কুমারের অভিনয় ও পরিচালনা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সম্মুখবর্তিনী করবার সাহস দেখিয়েছিলেন। আর সেখানেই বাঙালি নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর উল্লেখযোগ্য তফাত। কারণ তিনি শরীরকে ব্যবহার করতে জানতেন। প্রায় ইউরোপিয় কায়দায়। 
আমরা যদি ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌-‌র দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, সনৎ-‌এর সঙ্গে নীতার সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক দেবী ও মানবীর সেতুবন্ধনে সুপ্রিয়াকে যে সমস্ত ফ্রেমিংয়ে গঠন করেছেন তাতে সুপ্রিয়া, এবং একমাত্র সুপ্রিয়াই পারতেন সনৎ বা অন্য যে কোনও পুরুষের উপস্থিতিকে তুচ্ছ ও অকিঞ্চিৎকর করে দিতে। এমনকী ‘‌দাদা আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম’‌, এই যে প্রাক শেষ সিকোয়েন্সটি, সেখানে টেলিফটো লেন্সে সুপ্রিয়ার যে দেহাংশ মুদ্রিত আছে, বা ধরা যাক ‘‌কোমল গান্ধার’‌-‌এ কোপাইয়ের সামনে সুপ্রিয়াকে যেভাবে বর্ণনা করা আছে, সেটা একেবারেই বোতিচেল্লির দীর্ঘগ্রীবা নারীদের অনূকরণ। এবং এই প্রতিরূপ আঁকা ঋত্বিক ঘটকের পক্ষে যেমন সম্ভব, তেমনই  এটা অন্য কোনও বাঙালি, যাঁরা সুপ্রিয়ার সমকালীন, যেমন সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায় বা কাবেরী বসু, তাঁদের পক্ষে করা সম্ভবই ছিল না। বস্তুত উত্তর স্বাধীনতা পর্বে যখন সুপ্রিয়া বাংলা ছায়াছবির পর্দায় এলেন, তাঁর মধ্যে স্বাধীনতা উত্তর স্বপ্নহীন নারীর লাবণ্যহীনতা সহজে ফুটে উঠেছিল।

এটা শুধু মাত্র ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা চক্রবর্তীর ক্ষেত্রে নয় বা ‘‌কোমল গান্ধার’‌-‌এ অনুসূয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যদিও এই দুটি তাঁর অবিস্মরণীয় অভিনয়। এক ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌ই একজনকে মানুষকে অমরতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে, উপরন্তু ‘‌কোমল গান্ধার’‌-‌এ অনুসূয়া ছিলেন সুপ্রিয়া। কিন্তু আমি উদাহরণ দেব জনপ্রিয় ছবির, ধরা যাক উত্তম কুমারের বিপরীতে তিনি অভিনয় করছেন ‘‌মন নিয়ে’‌-‌এর মতো ছবিতে। ‘‌মন নিয়ে’‌-‌তে তাঁর ডবল ‌রোল ছিল। সেখানে তিনি যে ছোট বোনের যৌন বিপর্যয় এঁকে ছিলেন। এই ধরণের রাফ এজেড অভিনয় বাংলা নায়িকাদের মধ্যে সুপ্রিয়া ছাড়া আর কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। ফারাসিরা একে ‘‌লা ফাম ফাতাঁল’‌ বলে, অর্থাৎ ‘‌গরলকণ্ঠী নারী’‌। এই বিষয়ে লিজ টেলরের সঙ্গে তাঁর অসম্ভব মিল। লিজ বা সুপ্রিয়ার বিভিন্ন অভিনয়ে দেখা যায়, তিনি একদিকে তাঁর শরীরকে একটি ভ্রমণ কেন্দ্র ও পুরুষের আহ্লাদের কেন্দ্র হিসাবে ভাবাতে পেরেছেন। আবার অন্যদিকে আতঙ্ক অর্থাৎ ফ্রয়েড যে ফ্রাস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের কথা বলেন, সেভাবেও ভাবাতে পেরেছেন। এতো কম কথা নয়। 
১৯৫৯ সালে যখন তিনি ‘‌আম্রপালি’‌ করেছিলেন, তখন তাঁর নৃত্য পটিয়সি ভূমিকা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে, এরকম সাবলীল শরীরের ব্যবহার আর কোনও বাঙালি নায়িকা ৫০ ও ৬০-‌এর দশক জুড়ে দেখাননি। তিনি দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছেন। এখানে মনে রাখতে হবে, উত্তম কুমারের অন্য নায়িকাদের সঙ্গে সুপ্রিয়ার পার্থক্য যে তিনি কিছুটা অ্যাগ্রেসিভ অভিনয় করতেন। তাই, তিনি শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যাদীপের শিখা বা বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা নন। বরং একজন আক্রান্ত স্বাধীনতার নাগরিকা। সেই নাগরিকা, যা তাঁর মুখচ্ছবির মধ্যেও আছে। তিনি সেই অর্থে সংস্কৃত কাব্যের সুন্দরী নন। বরং কলকাতার আটপৌড়ে বনলতা সেন। তাঁকে আমরা সাধারণ শাড়ি ও সাধারণ আঁচল, এর মধ্যেই দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু সেখানেও তিনি যখন, ‘‌বিলম্বিত লয়’‌ ছবিতে ‘‌এক বৈশাখে দেখা হল দু’‌জনায়’‌ গেয়ে ওঠেন, তখন বোঝা যায়, আমাদের শহরেও কোথাও কোনও হাসপাতালের সামনে দারুচিনি বৃক্ষ থাকে। যেমন চিত্তরঞ্জন সেবাসদনের সামনে। আর সুপ্রিয়া চৌধুরি তো নিজের জীবন শুরু করেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে, ভবানীপুরেই। 

 

 

বিদায় সুপ্রিয়া।     

জনপ্রিয়

Back To Top