সম্রাট মুখোপাধ্যায়: নায়িকা হয়েছেন। কিন্তু ঠিক যেন চেনা–‌ছকের গ্ল্যামার প্রধান নায়িকা নন। পরে ‘‌মা’‌ হতে শুরু করলেন। কিন্তু সেটাও যেন একটু আলাদা রকম। শুধুই স্নেহ বা অসূয়া–‌সর্বস্ব নন।
এক হিসেবে বাংলা সিনেমায় তিনি তাই একাধারে সুচিত্রা–‌সুপ্রিয়া এবং ছায়া দেবী–‌পদ্মা দেবীদের ‘‌কাউন্টার ইমেজ’‌।
যা অভিনয় ক্ষমতা ছিল রুমা গুহঠাকুরতার, তাতে তাঁকে, তাঁর চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হতে পারত সিনেমা। ‘‌বেনারসি’‌র মতো এক–‌দু’‌বারের বেশি তা হয়নি। ‘‌গঙ্গা’‌ ছবি করার ব্যস্ততায় হাত–‌ছাড়া হয়েছিল ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র নীতার চরিত্র। ঋত্বিককুমার বুঝেছিলেন এই মেয়ের ক্ষমতা। সে ছবি হয়েছিল। রুমার নীতা হওয়া হয়নি। কিন্তু তাতে মেঘে ঢাকা পড়েনি তারা।
কারণ, ‘‌মেঘে ঢাকা তারা’‌র মাস কয়েক পরেই বেরিয়েছিল ‘‌গঙ্গা’‌। আর তার হিমি চরিত্র যেন ছাপিয়ে গেল সব। সে যাবৎ বাংলা সিনেমা যেন পায়নি অমন ‘‌সাব অল্টার্ন’‌ নায়িকা। ব্যক্তিত্বে, রসিকতায়। এবং তার সঙ্গে মেশানো অব্যর্থ আবেদনে। আর তারপরই দু’‌বছর পরে ’‌৬২–তে ‘‌বেনারসি’‌। যে ছবিতে রুমাই সব। তিনিই ‘‌বেনারসি’‌। এক নামী পতিতা। যে প্রবেশ করতে চাইছে সুস্থ পারিবারিক জীবনে। এবং পারছে না। ওই ছবিতে তাঁর মুখের সঙ্গে ‘‌ইন্টারকাট’‌–এ দুর্গা প্রতিমার মুখ দর্শক বহুদিন মনে রেখেছিল। ওই ছবির পরিচালক ছিলেন অরূপ গুহঠাকুরতা। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী। আর ’‌৬২– তেই তিনি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম কাজ করলেন ‘‌অভিযান’‌ ছবিতে। অনেক পরে সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে রুমা আবার করেন ‘‌গণশত্রু’‌। ঋত্বিকের ছবি করা হয়নি।
তবে সর্বার্থে বাংলা ছবিতে ‘‌নায়িকা’‌ হিসেবে রুমা গুহঠাকুরতার প্রথম প্রতিষ্ঠা ‘‌ক্ষণিকের অতিথি’ ‌ছবিতে। এক স্বামীহারা মা হাঁটা ভুলে যাওয়া ছেলেকে নিয়ে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসেছে এক ডাক্তারের কাছে। যে ডাক্তার ছিল তার একদা প্রেমিক। মা আর প্রেমিকা সত্তা মেশানো এক অন্যরকম ‘‌ম্যাচিওর’‌ চরিত্র। ছেলের চরিত্র করেছিল অমিতকুমার। তাঁর নিজের ছেলে। প্রসঙ্গত,‌ অমিত তখনও বাবা কিশোরকুমারের সঙ্গে ‘‌দূর গগন কি ছাও মে’‌ করেনি। এই ছবির পরিচালক ছিলেন তপন সিংহ। আর তপনবাবুই এরপর রুমাকে নিয়ে কঠিনতম পরীক্ষাটি করলেন। ‘‌নির্জন সৈকতে’‌ ছবিতে রুমা করলেন এক বয়স্ক বিধবার চরিত্র। পুরী বেড়াতে এসেছে চার বিধবা ও এক সম্পর্কছিন্ন তরুণী। পাঁচজনেরই গায়ে সাদা থান। আর ছবিতে প্রচলিত ভাবনায় কোনও নায়ক নেই। এই চরিত্রের জন্য সেবার জাতীয় পুরস্কার পান রুমা দেবী, অন্য চার অভিনেত্রীর সঙ্গে। মনে রাখতে হবে এমন বয়স্ক চরিত্র যখন তিনি করছেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯!‌ মাত্র ৩৫ বছর বয়েসে করেছেন ‘‌আরোগ্যনিকেতন’‌–‌এর মতো ছবিতে শান্ত অথচ দৃঢ় মা–‌এর চরিত্র। কার মা?‌ শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের। যার সঙ্গে এক বছর আগেই নায়িকা হয়েছেন ‘‌পঞ্চশর’‌ ছবিতে।
বৈচিত্র‌্যই ছিল রুমা তূণীরের আসল তীর। তাই একাধারে ‘‌পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’‌ ছবিতে কমেডি করতে পারতেন, আবার ‘‌বাঘিনি’‌তে হতে পারতেন ব্যক্তিত্বশীলা প্রৌঢ়া। ‘‌পলাতক’‌ ছবির ঝুমুর গানওয়ালি। কিংবা ‘‌যদি জানতেম’‌–‌এ গোয়েন্দার হুইল চেয়ারে আটকে থাকা বুদ্ধিমতী অর্ধাঙ্গিনী। এই ছবিতে উত্তমকুমারের বিপরীতে সমানে টক্কর দিয়েছিলেন তিনি।
আসলে ‘‌বোম্বে টকিজ’‌ ছিল তাঁর আঁতুড়ঘর। তাই অন্য ঘরানার একটা অভিনয়–‌হাওয়া নিয়ে এসেছিলেন বাংলা ছবিতে। কিশোরকুমারকে বিয়ে করতে গিয়ে ছেড়েছিলেন রাজ কাপুর, দিলীপকুমার, দেব আনন্দদের সঙ্গে কাজের সুযোগ। পরে এই দুই শিল্পী–‌দম্পতির ছায়াতেই তো হৃষীকেশ মুখার্জি বানান ‘‌অভিমান’‌। এই ছবিতে উমা চরিত্রে জয়া ভাদুড়িকে ঠিক সেভাবেই ছোট করে ঘোমটা দেওয়াতেন ঋষীকেশ, যেমনটা রুমা দিতেন।
এখন তো সেসব হিসেবনিকেশ ছাড়িয়ে অন্য কোনও এক কুঞ্জছায়ায় চলে গেলেন হিমি কিংবা বেনারসি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top