সম্রাট মুখোপাধ্যায়: শহরে সবে পা রেখেছে বাচ্চু। প্রায় বছরখানেক পরে। সালটা ১৯৪৯। তাও খানিকটা লুকিয়েই। আসলে উপায়ও নেই। তিন–‌তিনটে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাঁর বিরুদ্ধে তখন। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ দেশজুড়ে। অতএব তার কর্মী হওয়ার ‘‌শাস্তি’ তো পেতেই হবে।
গড়িয়াহাটের কাছে ‘‌যশোদা ভবন’‌ বাচ্চু চৌধুরির এ শহরের বাসস্থান‌। যেদিন তা ছেড়ে, শহর ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। সেদিন রাতে কোনওরকমে পুলিসের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। সে যে দুই ‘‌কমরেড’‌–‌এর কাছে থাকত ওই বাড়িতে ভূপতি আর সুরপতি, দু‌জনেই পুলিসের জালে ধরা পড়লেন। বাচ্চু কিন্তু বেঁচে গেল ভূপতি–‌সুরপতির মায়ের জন্যই। তিনি পুলিসকে শপথ করে বললেন, ‘‌ও আমার ছেলে। ওর নাম নৃপতি। আজই ও নবদ্বীপ থেকে এসেছে। ওখানেই ও থাকে।’
পুলিস ও তা বিশ্বাস করে চলে গেল। বুঝতেও পারল না তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি নৃপতি নন্দী নয়। ছেলেটির ডাক নাম বাচ্চু। কেউ কেউ ডাকে বাচু বলেও। ছোটখাট রোগা চেহারার জন্য। কিন্তু ছেলেটির আসল নাম সলিল। সলিল চৌধুরি। যার আসল‌ ঠিকানা অসমের নওগাঁ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের এক দুর্গম চা বাগানে। সেখানেই তার বাবা জ্ঞানেন্দ্রনাথ চৌধুরি, স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী, ডাক্তারি করেন। সলিল শহরে এসেছে পড়াশোনা করতে। বিএ পাস করেছে ডিস্টিংশন নিয়ে। কিন্তু বাংলা নিয়ে এমএ–‌টা পাস করা হয়নি। পরীক্ষা চলার মাঝেই বাবা অসুস্থ শুনে অসমে চলে যেতে হওয়ায়।
বাবা সুস্থ হয়েছেন। সলিল শহরেও ফিরে এসেছেন। কিন্তু পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। কারণ, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হয়ে যাওয়া, হয় গ্রেপ্তারি এড়িয়ে পালানো। না হয় কৃষক আন্দোলনের জন্য সংগঠন গড়তে গ্রামে চলে যাওয়া। তারও আগে ১৯৪৪–‌এ তো ছাত্র সংস্কৃতি দলের সঙ্গে অসম চলে গিয়েছিলেন, অনুষ্ঠান করে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। সেই দলে সলিল বাঁশি বাজাতেন। টাকা তুলেছেন, কিন্তু নিজেদের খাওয়া জুটছে না ঠিকভাবে। যখন ফিরে এলেন, রোগা শরীর এত শীর্ণ হয়ে গেছে যে, হাড়পাঁজরা গোনা যেত!‌ যে মেসে থাকতেন, বউবাজারের ইস্টার্ন লজ, সেখানে কয়েকজন মেডিক্যাল ছাত্র থাকত, তারা বন্ধু বাচ্চুকেই কঙ্কাল বানিয়ে সারা গায়ে খড়ির দাগ টেনে অ্যানাটমি পড়তে বসত!‌
‌এর আগেও বার দুয়েক গ্রেপ্তার হতে হতে বেঁচে গেছেন। মহম্মদ আলি পার্কে ছাত্র সমাবেশে গান গাইছেন। পুলিস সভা ভাঙতে শুরু করল, বেধড়ক লাঠিচার্জ। এই পার্ক রাস্তা থেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে। সবাই লাফ মেরে পালাতে গিয়ে গোড়ালিতে চোট পেতে শুরু করল। এতে পুলিসেরই সুবিধা হল। পা টেনে হাঁটছে দেখলেই ভ্যানে তুলতে শুরু করল। সলিলেরও পায়ে চোট লেগেছে। কোনওরকমে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা তাদের হস্টেলে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখল তাঁকে। আরেকবার ট্রামে করে ফিরছেন, তখন থাকেন সার্কুলার রোডের এক ডেরায়, মাঝপথে ট্রাম থেকে নামিয়ে নিলেন এক কমরেড কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, খবর দিলেন ওই ডেরায় পুলিস ‘‌রেইড’‌ করেছে, বসে আছে সলিলকে ধরবে বলে।
আর ‘‌যশোদা ভবন’–‌এর কাণ্ড যখন ঘটল, তখন সালটা ১৯৪৮। সলিল চলে গেলেন সন্দেশখালির ভাঙড় অঞ্চলে। গা ঢাকা দিতে। বলে রাখা ভাল, যে সব গান আজ প্রবাদপ্রতিম, তার অনেকগুলোই কিন্তু সলিলের। এর আগেই লেখা ও সুর করা হয়ে গেছে। ‘‌ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’‌, ‘‌বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’‌, ‘‌হেই সামালো ধান হো’‌, ‘‌ও আলোর পথযাত্রী’‌। গণনাট্যের মঞ্চে গেয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু রেকর্ড বের করার উপায় নেই।
পথে ঢেলে শোণিত কণা
শহরে প্রায় বছরখানেক পরে পুজোর আগে ফিরেই সলিল শুনলেন রেকর্ড–‌এ বাজছে, ‘‌কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো রূপকথা নয় সে নয়।’‌ চমকে গেলেন সলিল। তাহলে যা কানে এসেছে তা ঠিক‌!‌ হেমন্তদা নিজেই রেকর্ডটা করে ফেলেছেন!‌ স্মৃতি সিনেমার পর্দা হয়ে উঠল যেন সলিলের মনে।
দেবব্রত বিশ্বাস আর বিনয় রায় তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে টেনে এনেছেন গণনাট্যের বৃত্তে। সেই সুবাদেই ভূপতি নন্দী তাঁকে নিয়ে গেল হেমন্তবাবুর কাছে। যদি কোনও একটা–‌দুটো গান পছন্দ হয় হেমন্তর। রেকর্ড করেন। যে সব গান শোনালেন সেদিন সলিল, হেমন্ত বুঝতে পারছিলেন রাজনৈতিক কারণেই এ সব গান রেকর্ড করবে না কোনও সংস্থা। চলে আসছেন সলিল। হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে মনে পড়ল আধখানা লেখা–‌সুর করা একটা গানের কথা। ‘‌কোনো এক গাঁয়ের বধূ’‌। ফিরে গিয়ে শোনালেন হেমন্তকে। পছন্দ হল হেমন্তর। বাকি আধখানা লিখলেন, সুর করলেন দু’‌দিনের মধ্যেই। আর যে সন্ধেয় তা তুলে দিয়ে এলেন হেমন্তর গলায়, সেদিন রাতে যশোদা ভবনে পুলিস এল।
সুর তো করেছিলেন, কিন্তু অর্কেস্ট্রেশন তো করে যাননি। এ গানে তারও তো মূল্য অসীম। তার মানে সেই কাজটা হেমন্তবাবু নিজেই করেছেন!‌ সুরকার হিসেবে নাম দিয়েছেন শুধু সলিল চৌধুরিরই। প্রচণ্ড আবেগতাড়িত হলেন সলিল। এরকম ঘটনা অবশ্য পরের বছর ১৯৫০–‌এই আবার ঘটবে। আবার ‘‌আন্ডারগ্রাউন্ড’‌–‌এ যাবেন সলিল। তার আগে সুকান্তের কবিতা থেকে করা ‘‌রানার’‌ গানটা তুলে দিয়ে গেছেন হেমন্তবাবুর হাতে। সে গানেরও অর্কেস্ট্রেশন করেছেন হেমন্তবাবু, সলিলের দিয়ে যাওয়া সামান্য ‘হিন্টস’‌ সূত্রে।
এই ১৯৫০ সালেই আর একটি ঘটনা ঘটে। ‘‌অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’‌। গানটি মঞ্চে গাইতেন দেবব্রত বিশ্বাস আর প্রীতি সরকার। আইপিটিএ–‌র দুই প্রধান গায়ক–‌গায়িকা। জর্জ বিশ্বাসের বাড়িতে একদিন উপস্থিত হেমন্ত ও সলিল দুজনেই। দেবব্রত স্বয়ং বললেন, ‘‌হেমন্ত তুমিই এই গানটা রেকর্ড করো। আমাকে তো ওরা (‌রেকর্ড কোম্পানি)‌ গাইতে দেবে না।’‌ সেই কথা অনুযায়ী হেমন্ত গানটি রেকর্ড করেন।
রুদ্ধ দেবব্রত, রুদ্ধ সলিল যেন এক মেরুতে মিলে গিয়েছিল সেদিন। আর রুদ্ধতার সেই শীতে মুক্তির বসন্ত এনে দিয়েছিলেন হেমন্ত।
‌‘‌প্রান্তরের গান আমার’‌ সলিল চৌধুরির এই আরেক দোলা লাগানো গান, প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ডেমো–‌রেকর্ডিংও হয়ে গেল। কিন্তু কণিকা চিঠি পাঠালেন সলিলকে নিজের অসহায়তা জানিয়ে যে, যদি ওই গানের রেকর্ড বেরয়, বিশ্বভারতী আর তাঁকে দিয়ে গান গাওয়াবে না!‌ বেশ কিছু বছর পরে ওই গান মুক্তি পেল উৎপলা সেনের কণ্ঠে। ১৯৫৩। তখন সলিল চৌধুরি প্রতিষ্ঠিত। ঝর্নার মতো তাঁর সুর ঝরে পড়ছে বাংলা বেসিক গান থেকে ছায়াছবিতে।
কিন্তু তার আগের দিনগুলো?‌ পুলিসি ধরপাকড়। বিশ্বভারতীর প্রচ্ছন্ন নিষেধাজ্ঞা। রেকর্ড কোম্পানিদের বাছবিচার। এতেই শেষ নয়!‌ রুদ্ধ সলিলের এই বৃত্তান্তে এবার যোগ হল কমিউনিস্ট পার্টির ‘‌সেন্সরশিপ’‌ও!‌ সলিলকে নিয়ে ছড়ানো নানা ভুল বার্তা!‌
মধুমাসের কুসুম ছিঁড়ে
‘‌মন বিদ্রোহ করে উঠল, আমি শোনাব না। কতকগুলো অ–‌সুরের কাছে আমার পরীক্ষা দিতে হবে?‌ ছ’‌বছর বয়েস থেকে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করে, সঙ্গীতকেই ধ্যান–‌জ্ঞান করে শত ঘণ্টা তার পিছনে ব্যয় করেই সেই শিক্ষাকে দেশের কাজে ব্যয় করব বলে জীবনের এতগুলি অমূল্য বছর পথে পথে ‘‌অনাহারে পুলিসের তাড়া খেয়ে হন্যে হয়ে কুকুরের মতো ঘুরেছি কীসের জন্য, কোন আদর্শে?‌ আমার আত্মত্যাগের এক শতাংশও যাঁরা করেননি, শহরে বসে লাঠি ঘুরিয়ে ইন্টেলেকচুয়াল হয়েছেন।’‌ এ সব অভিমানের, অভিযোগের কথা সলিল লিখেছিলেন প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে এসে নিজের আত্মজীবনীতে। এই তথ্য দিতে গিয়ে যে, তাঁর গানকে সেন্সর করতে গণনাট্যে বিচারকমণ্ডলী তৈরি হয়েছিল।
এইচএমভি থেকে তখন সলিল চৌধুরির কথা ও সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় রেকর্ড করেছেন ‘‌আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’‌ গানটি। তাতে একটি জায়গায় ছিল, ‘‌হায় বিধি বড়ই দারুণ, পোড়া মাটি কেঁদে মরে ফসল ফলে না।’‌ বিতর্ক উঠল এ নিয়ে। ‌সাংস্কৃতিক সেলের নেতারা অভিযোগ তুললেন, ‘‌হায় বিধি’‌ কথাটা বলে ‘‌ঈশ্বরবাদ’‌ ও ‘‌ভাগ্যবাদ’‌–‌কে প্রচার করা হচ্ছে!‌ অতএব ওটি গণনাট্যের মঞ্চের পক্ষে সঠিক নয়!‌ সলিল পাল্টা বললেন, ‘‌তাহলে ‘‌আল্লা মেঘ দে, পানি দে’‌ কীভাবে গাওয়া হয়?‌’‌ উত্তর এল, ‘‌ওটা প্রচলিত গান।’‌
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো মানুষও ভুল বুঝে আপত্তি তুললেন সলিলের গানে পাশ্চাত্য সুরানুষঙ্গ নিয়ে‌!‌ গাঁয়ের বধূকে গণনাট্যের আসরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। ‘‌পালকির গান’‌ (‌কথা:‌ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)‌ ‘‌প্রতিক্রিয়াশীল’‌ ঘোষিত হল। গণনাট্যের সংস্রবে থাকার জন্য নানা ‘‌ব্যারিকেড’‌–‌এর মুখে পড়েছিলেন সলিল গানের ব্যবসায়িক জগৎ, সমাজ, রাষ্ট্রের কাছে। এবার সেই গণনাট্য সঙ্ঘই রুদ্ধ করল তাঁকে। এই সময়ই ঘটল আরেক সমাপতন যোগ। মারা গেলেন সলিলের বাবা। মা ও ছয় ভাইবোনের দায়িত্ব সলিলের ওপর। অস্তিত্বের নিদারুণ সঙ্কট দেখা দিল। পার্টি ‘‌ওয়েজ’‌ দিত ৩০ টাকা। একা মানুষ চলে যেত কষ্টে। এবার চলবে কী করে?‌ এরকম সময়েই বম্বে থেকে ডাক এল বিমল রায়ের ইউনিট–‌এ কাজ করবার। ৫০০ টাকা বেতনে। সলিলের মনে পড়ল, লেনিন বলেছিলেন, ‘‌বিপ্লবোত্তর রুশ দেশের সংস্কৃতিতে বড় ভূমিকা নেবে সিনেমা। নতুন আলোর খোঁজে পাড়ি দিলেন বম্বে।
অভিযোগ উঠল সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে। সলিল ‘‌এসকেপিস্ট’‌। কেরিয়ারের জন্য বম্বে পালাল!‌ আর অন্যদিকে সেই বম্বে যাওয়াতে তৈরি হল ‘‌দো বিঘা জমিন’‌। সলিলেরই গল্প ‘‌রিকশাওয়ালা’‌ থেকে। ছবির সুরও তাঁরই করা। যে সিনেমা হয়ে উঠবে ভারতীয় সংস্কৃতি–‌চর্চায় সমাজতান্ত্রিক শিবিরের এক চিরকালীন অবদান। অথচ সলিল তখন সেই শিবিরের এক অংশের কাছেই ব্রাত্য!‌ নিন্দিত‌!‌
মধুরেন.‌.‌.‌
অনেক বছর পরে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। সলিল চৌধুরির কাছে চেয়ে পাঠালেন তাঁর একটি গানের ক্যাসেট। অবসর সময়ে শুনবেন। সলিলবাবু এ অনুরোধ শুনে তাঁর যত গণসঙ্গীত আছে তা একটি ক্যাসেটে ভরে পাঠিয়ে দিলেন। দিন দুয়েক পরে প্রমোদবাবু ফের অনুরোধ করে পাঠালেন, উনি শুধু গণসঙ্গীত নয়, সলিলবাবুর বাছাই করা আধুনিক গানগুলোও শুনতে চান। সলিলবাবু নতুন ক্যাসেটটি সেভাবেই রেকর্ড করেছিলেন।
[‌তথ্যঋণ:‌ রচনাবলী। সলিল চৌধুরি। মিলেমিশে। রচনা সংগ্রহ (‌১)‌। সলিল চৌধুরি, দে’‌জ]‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top