ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, সিঙ্গাপুর:‌ দেশে লক ডাউন শুরু হওয়ার ঠিক আগেই আমি কলকাতা ছেড়ে সিঙ্গাপুরে চলে এসেছিলাম পরিবারের কাছে।
আসলে খুব টেনশন হচ্ছিল আমার ছেলেমেয়ের জন্য। যদিও আগেই ওদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছিল, আর আমার
স্বামী সঞ্জয় ছেলেমেয়েদের দেখাশুনোর ব্যাপারে খুবই সতর্ক, তবু মা হিসেবে আমার তো চিন্তা থাকেই।
করোনা আতঙ্ক না থাকলেও অবশ্য আমি প্রায় প্রতি উইকেন্ডেই চলে আসি সিঙ্গাপুর আর সুযোগ পেলে
থেকেও যাই বেশ কিছুদিন। এবার ঠিক সময়ে চলে এসে ভালো করেছি। কারণ, এরপর আর চাইলেও আসা হত না।
ফ্লাইটই তো বন্ধ হয়ে গেল।
আমাদের ফ্ল্যাট খুব উঁচুতলায়। নিচে রাস্তা প্রায় দেখাই যায় না। বাড়ির ভিতর আমরা ক–জন যাকে বলে
পুরোপুরি ফ্যামিলি টাইম কাটাচ্ছি। অঙ্কন আর ঋষনার সঙ্গে স্ক্র‌্যাবল আর বিজনেস বোর্ড গেম খেলছি
চুটিয়ে। আমি নানারকম রান্না করতে ভীষণ ভালোবাসি। তাই কিচেনেও অনেকটা সময় কাটছে। এর মধ্যে একদিন
দুর্দান্ত একটা স্যালাড বানিয়েছিলাম। কিমার একটা অন্যরকম প্রিপারেশনও করেছিলাম। কিন্তু খেয়াল রাখতে
হচ্ছে যাতে বেশি রিচ না হয়। বই পড়ার নেশা আমার ছোট থেকেই। ভাল ভাল বই পড়ছি, গান শুনছি, সিনেমা
দেখছি, ছবি আঁকছি। আর ইমিউনিটি বাড়াতে ছেলেমেয়েকে নিয়ে যোগ করছি রোজ। এই যে করোনা আক্রমণের
মধ্যে দিয়ে মাদার নেচার আমাদের শিক্ষা দিতে চাইল, সেটা আমাকে খুব ভাবিয়েছে। আমি তাই ভাবলাম, এই
ঘরবন্দি অবস্থায় যেটুকু করা যায়, সেটুকু চেষ্টা করি। ব্যালকনিতে গাছের যত্ন নিচ্ছি। তবে আমি ক্রিয়েটিভ
কাজ ছাড়া একদম থাকতে পারি না। তাই নিজে নিজেই রিহার্সাল করছি। একটা নৃত্যনাট্য পরিকল্পনা করেছি।
সেটার স্কেচ এঁকে রাখছি যাতে সাজাতে সুবিধে হয়।
আর যে অভিজ্ঞতাটা হল এই সঙ্কটের সময়ে সিঙ্গাপুরে থেকে, সেটা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার না করে পারছি
না। চিনের সঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য থাকার সুবাদে সিঙ্গাপুরে কিন্তু অনেক আগেই করোনা ভাইরাসের আগমন
ঘটেছিল। এই সংক্রমণকে যখন‘উহান ফ্লু’বলছিল চিন, তখনই তা ঢুকে পড়েছিল সিঙ্গাপুরে। কিন্তু সরকার
বুঝেছিল এটা সাধারণ ফ্লু নয়। সতর্কতার সঙ্গে কেসগুলোকে ট্র্যাক করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। একটা অ্যাপও
আছে গভর্নমেন্টের কাছে ট্র‌্যাক করার জন্য। সঞ্জয় আর অন্যান্য বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার
সময় খবর পাচ্ছিলাম, কীভাবে ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকেই সরকারি বা কর্পোরেট অফিস বাড়িগুলোতে ঢুকতে গেলে
সবাইকে কন্ট্যাক্ট ডিটেলস দিতে হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, সিঙ্গাপুরে ঢোকার সবকটা পয়েন্টে টেস্ট কিট দেওয়া
হয়েছিল, যাতে তিনঘণ্টার মধ্যে পজিটিভ কিনা জানা যায় আর দরকার হলে কোয়ারেন্টাইন পাঠিয়ে দেওয়া যায়।
সিঙ্গাপুর সরকারের আর একটা উদ্যোগ আমার খুব ভালো লেগেছে। এয়ারলাইন্স, ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে যেমন
আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে এই ক্ষতিটা কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য, তেমন দেওয়া হচ্ছে শিল্প–সংস্কৃতি
ক্ষেত্রকেও। এন্টারটেনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি যে বিশাল লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে আছে করোনার জেরে, সেটা আমরা
ভালই বুঝতে পারছি।
কলকাতায় শুনছি বেশির ভাগ বাড়িতেই খবরের কাগজ পৌঁছচ্ছে না। এখানে রোজ সকালে কাগজ পাচ্ছি। প্রথম
পাতায় সরকারি বিজ্ঞাপন– কী কী উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। আর চিকিৎসা তো একদম
ফ্রি, সবাই জানে। এখন একটাই প্রার্থনা, সবাই সুস্থ থাকুন, পৃথিবী যেন এই দুঃসময় থেকে তাড়াতাড়ি মুক্তি
পায়।

জনপ্রিয়

Back To Top