সম্রাট মুখোপাধ্যায়
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দু বছরের লড়াই। বৃহস্পতিবার সকালে মুম্বইয়ের স্যার এইচ এন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন হাসপাতালে প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট অভিনেতা ঋষি কাপুর। বয়স হয়েছিল ৬৭। বুধবারই অসুস্থতা নিয়ে ভর্তি হন। পাশে ছিলেন স্ত্রী নীতু কাপুর ও দাদা রণধীর কাপুর।
২০১৮–‌তে ধরা পড়ে ক্যান্সার। নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। এক বছর পর গত সেপ্টেম্বরে দেশে ফেরেন। আবার ফিরতে চেয়েছিলেন সিনেমায়। হলিউডের ‘‌দ্য ইন্টার্ন’‌–‌এর রিমেকে দীপিকা পাড়ুকোনের সঙ্গে অভিনয় করার কথা ছিল। গত ফেব্রুয়ারি ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন।
রাজ কাপুরের দ্বিতীয় সন্তান ঋষি। ১৯৭০–‌এ শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ ‘‌শ্রী ৪২০’‌ ও ‘‌মেরা নাম জোকার’‌ ছবিতে। পরে নায়ক ১৯৭৩ সালে, ‘‌ববি’‌–‌তে। বিপরীতে ডিম্পল কাপাডিয়া।
১৫০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ‘‌অমর আকবর অ্যান্টনি’‌, ‘‌লায়লা মজনু’‌, ‘‌সরগম’‌, ‘‌বোল রাধা বোল’‌ বা ‘‌প্রেম রোগ’‌ ছবিতে যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনই করেছেন ‘‌কাপুর অ্যান্ড সন্স’‌, ‘‌মুল্‌ক’‌,‘‌১০২ নটআউট’‌ বা ‘‌লাভ আজকাল’‌ ছবিতেও। তাঁর শেষ মুক্তি–‌পাওয়া ছবি ইমরান হাসমির সঙ্গে ‘‌দ্য বডি’‌। রেখে গেলেন পুত্র, জনপ্রিয় নায়ক রণবীর,  মেয়ে ঋদ্ধিমা ও অভিনেত্রী স্ত্রী নীতু কাপুরকে। পরিবারের ১৫ সদস্যের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় মুম্বই মেরিন লাইনসে। তাঁর মৃত্যুতে দেশ জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।‌
নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইটা খুবই কঠিন ছিল ঋষির সামনে। সত্তর দশকের গোড়ায় রাজেশ খান্নার সোনালি যুগ চলছে। উঠে আসছেন অমিতাভ বচ্চন। উল্টোদিকে ‘‌মেরা নাম জোকার’‌ বছরতিনেক আগে মুখ থুবড়ে পড়ে কপর্দকশূন্য করে দিয়েছে রাজ কাপুর তথা আর কে ফিল্মসকে। এর ভেতর দিয়েই ১৯৭৩–এ ঋষির আত্মপ্রকাশ। 
শিশুশিল্পী হিসেবে দুবারই অভিনয় করেন বাবার ছবিতে। ১৯৫৫–‌য় তিন বছর বয়সে। ‘‌শ্রী ৪২০’–‌ ‘‌প্যার হুয়া ইকরার হুয়া’‌ গানের দৃশ্যে তিন শিশুর একজন হয়ে। খুব দুষ্টুমি করছিলেন। নার্গিস চকোলেটের লোভ দেখিয়ে শট দেওয়ান।
বছরতিনেক আগে আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় মীনা আইয়ারের অনুলিখনে। তাতে অকপটে জানিয়েছেন, বাবার সঙ্গে নার্গিসের প্রেম বা বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা। অকপট বলে পরিচিত ঋষির আত্মজীবনীর নামও ‘‌খুল্লম খুল্লা ঋষি কাপুর আনসেন্সর্ড’‌।
আশির দশকের শেষদিকে ধীরে ধীরে রোমান্টিক চরিত্র ছেড়ে ঢুকে পড়ছেন পারিবারিক ছবিতে। ‘‌সিন্দুর’‌, ‘‌ঘর ঘর কি কহানি’‌, ‘‌ঘরানা’‌— সফল নায়ক ঋষি। একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‌আরে আমি তো চিরকালই ফ্যামিলি বয়। পরিবারের চাহিদাতেই আমার পর্দায় আসা।’‌
যে রাজেশ–‌ঝড়কে ঠেকিয়ে তাঁর সাফল্য, তাঁর সঙ্গে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল ঋষির। ভয়ের এবং শ্রদ্ধার। ‘‌সত্যম শিবম সুন্দরম’‌–‌এ রাজেশকেই পছন্দ ছিল রাজের। ঋষিই বাবাকে প্রভাবিত করে, নিয়ে আসেন কাকা শশী কাপুরকে। অথচ ঋষিই ১৯৯৯–‌এ যখন ‘‌আ অব লওট চলে’ করলেন‌, তাতে প্রধান চরিত্রে নিলেন রাজেশকেই!‌  ঋষির কেরিয়ারে চিরকালই ছবি হিট হওয়াতে গান ‘‌ফর্মুলা ওয়ান’‌–এর কাজ করেছে।
তাঁর সাফল্যের আরেক তাস স্ত্রী নীতু সিং। ওঁদের জুটিতে প্রথম হিট ৭৫–এ ‘‌রফু চক্কর’‌, এরপর ‘‌খেল খেল মেঁ’‌ ওই বছরই। তারপর ‘‌কভি কভি’‌, ‘‌দুসরা আদমি’‌, ‘‌অমর আকবর অ্যান্টনি’‌, ‘‌ঝুটা কঁহি কা’—  পাক্কা এক ডজন ছবি।  তাঁর সাফল্যের‘‌ফর্মুলা নম্বর থ্রি’‌ অমিতাভ বচ্চন। ‘‌অমর আকবর অ্যান্টনি’‌, ‘‌নসিব’‌, ‘‌কভি কভি’‌, ‘‌কুলি’ থেকে ‘‌১০২ নট আউট’‌ বক্স–অফিস হিট!‌ 
রোমান্টিক নায়ক থেকে বিরতি কাটিয়ে ফিরে এসে ঋষি দেখিয়েছেন তিনি দাপুটে অভিনেতাও। ‘‌কাপুর অ্যান্ড সন্স’–‌এর জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন। কেরিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসের মধ্যগগনেই অস্তমিত হলেন ঋষি।

জনপ্রিয়

Back To Top