আজকাল ওয়েবডেস্ক: চারদিক কাঁপাচ্ছে বঙ্গসন্তানরাই। রাজ করছেন বিশ্বের সমস্ত দরবারে। তা সে অর্থনীতিই হোক, কি বলিউড। এমনই আর এক বঙ্গসন্তানের কাজে মুগ্ধ মু্ম্বইয়ের বড় বড় পরিচালক ও প্রযোজকেরা। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছেন অনিকেত। কলকাতার একটি মাল্টিন্যাশনাল সংস্থায় কাজ করতেন তিনি। ‘‌মুম্বই অ্যাকাডেমি অফ দ্য মুভিং ইমেজ’‌–এ তাঁর বানানো একটি ছোট ছবি ‘‌আতর’‌–এর স্ক্রিনিং হয়েছিল। সেই ছবির জন্য তিনি যে স্টোরিবোর্ড বানিয়েছিলেন, সেটা সোজা মুকেশ ছাবরার কাছে যায়। তখন তিনি একটি ফোন পান তাঁর কাছ থেকে। ‘‌ধন্যবাদ’ এই চার অক্ষরের একটি সুন্দর শব্দই তাঁর মন ভাল করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর‌ আবার কলকাতায় ফেরা আর ওই কর্পোরেটের খাঁচায় ঢোকা। শৈল্পিক সত্তায় রসদ জোগানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। আর না। খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এল পাখি। এরপর ছ’‌মাস নিজের কাজ দেখিয়ে দেখিয়ে কলকাতার বড় ছোট সমস্ত প্রযোজকের কাছে গেলেন। কিন্তু না, কলকাতায় সম্ভবত তাঁর মতো প্রতিভার প্রয়োজন তখনও পড়েনি। কাজ নেই। এরকমই এক সময়ে বিখ্যাত সংস্থা ডেলয়েট থেকে কাজের সুযোগ আসে। বিদেশে চলে যেতে হবে। টাকা পয়সাও ভাল। কিন্তু সেই আবার কর্পোরেটের কারাগারে ঢোকা। একদিকে শৈল্পিক সত্তা, আরেকদিকে বৈষয়িক সত্তার দ্বন্দ্ব লাগল জোর। কিন্তু জিতল শেষমেশ প্রথমটাই। ছেড়ে দিলেন সেই কাজ। এমনভাবেই কাটছে দিন। হঠাৎই ‘‌মেঘ না চাইতেই জল’। একটি ফোন আসে। ‘আমরা ফক্স স্টার‌ স্টুডিও থেকে ফোন করছি। মুকেশ ছাবরার প্রথম ছবি আসছে। ‘‌দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস্‌’–এর হিন্দি। আপনাকে সেটার স্টোরিবোর্ড করে দিতে হবে।’‌ ‘‌হাতে যেন চাঁদ এল আমার। তখন আমি উড়ছি। কথা বলতে গিয়ে গলা কাঁপছিল আমার। জানি না কোথাও থাকব, কী করব। কিন্তু একটা আশার আলো যেন দেখছিলাম আমার সামনে।’‌ বললেন অনিকেত। মুম্বইতে কাউকে চেনেন না। কোনও থাকার জায়গা নেই। শুধু স্বপ্নের ডাকটুকু এসেছিল। সেই ডাকেই বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে নতুন শহরে পাড়ি দিলেন তিনি। থাকার জায়গা নেই। ভাবলেন বিমানবন্দরে মালপত্র রেখে ‘‌ফক্স স্টার’‌–এর অফিসে গিয়ে দেখা করে বিমানবন্দরে ফিরেই রাত কাটাবেন। কিন্তু সব যেন আশীর্বাদ। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই জানতে পারলেন, কলকাতার একজন মুম্বই থেকে ফিরে আসছেন কলকাতায়। ফোন করে জানতে পারেন, ঘরটি রেখে দিয়েছেন। তাঁকে বেকার মাসে মাসে ভাড়া দিতে হবে। ব্যস, অনিকেত তাঁর প্রস্তাব রাখতেই মেনে নিলেন তিনি। সেই ছ’‌জন মিলে একটি ফ্ল্যাটে থেকে বলিউডে যাত্রা শুরু অনিকেতের। 
তারপর?‌ ‘দিল বেচারা’–তে কাজ করতে করতে বলিউডের প্রভাবশালীদের সঙ্গে একটু একটু করে আলাপ বাড়তে থাকল। শুধু বলিউড না।‌ ভিকি কৌশালের বাবা অ্যাকশন ডিরেক্টর শ্যাম কৌশালের সঙ্গে অ্যাকশন দৃশ্যের স্টোরিবোর্ডের কাজ করেছেন দক্ষিণী ছবিতেও। সেই তালিকায় রয়েছে মণি রত্নমের ‘‌পনিয়িন সেলভন’‌ ছবিটিও। প্রথমবার শ্যাম কৌশালের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ‘‌হাউজফুল ৪’–এর একটি অ্যাকশন দৃশ্যের স্টোরিবোর্ড করতে গিয়ে।‌ ‌এছাড়া যশ রাজের মতো বড় ব্যানারের ছবিতেও কাজ করছেন তিনি। অক্ষয় কুমারের পরের ছবি ‘‌পৃথ্বীরাজ’–এর স্টোরিবোর্ডের জন্যেও তাঁর দক্ষতাকেই মূল্য দেওয়া হয়েছে। এমন সুন্দর নিঁখুত কাজ বলিউডেও কেউ খুব একটা করেননি এতদিন। তাঁর ছবিগুলিতে আলোর ব্যবহারও থাকে। একদম সিনেমার দৃশ্যটিই আপনি দেখতে পাবেন অনিকেতের কাজে। তাই সকলে যেন তাঁকে লুফে নিয়েছে মুম্বই নগরীতে।

 

 

এখন তিনি ও তাঁর স্ত্রী ফিল্মসিটির কাছেই একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাঁর স্ত্রীও একজন শিল্পী। দু’‌জনে মিলে আঁকিবুকির মাধ্যমেই সুন্দর দিন কাটাচ্ছেন সে শহরে। কিন্তু নিজের শিকড় ভোলেননি তিনি। কলকাতায় এখনও বেশ কিছু বইয়ের প্রচ্ছদের কাজ তিনি করেন। সত্যজিৎ রায়ের ছবি আঁকা দেখেই তাঁর শখ তৈরি হয় এই দিকে। তাই সেই সংক্রান্ত কাজ থেকে তিনি কখনওই মুখ ফেরাননি। অনির্বাণ ঘোষের লেখা বাংলা বই ‘‌হায়রোগ্লিফের দেশে’–এর প্রচ্ছদ করেছেন। এছাড়াও একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদের কাজ তিনি করছেন। ‌‌‌
‘‌অনিকেত’ অর্থ গোটা বিশ্বই যার আশ্রয়। একটি নির্দিষ্ট চার দেওয়ালে নিজেকে বন্দি রাখেনা যে। নিজের নামটিকে সার্থক করেছেন এই বঙ্গসন্তান।‌

কথোপকথনে:‌ তিস্তা রায় বর্মণ

জনপ্রিয়

Back To Top