আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ সেই এক ঘটনা। ৩০ বছর বাদে। যেন দেজা ভু! পুরুষতন্ত্রের চেহারাটি একই রয়ে গিয়েছে। যতই ‘পুরুষতন্ত্র গুঁড়িয়ে‌’ দেওয়ার কথা হোক না কেন। আগামী সমস্ত যুগেই হয়ত, পুরুষজাত তাদের ইতিহাসটা বহন করেই চলবে। আর নারীরা?‌ সেই ‘ডাইনি‌’ আখ্যা নিয়েই চলবে। আজ যেখানে রিয়া। ৩০ বছর আগে একই জায়গায় ছিলেন‌ রেখা। তাঁদের সঙ্গীদের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ উঠবে তাঁদেরই দিকে। প্রমাণ যাই বলুক না কেন, আদালতের রায় যাই বলুক না কেন। ‘‌মিডিয়া ট্রায়াল’‌– এর ফলে মানুষের মনে তাঁরা সেই ‘‌ঝাড়ফুঁকো করা মহিলা’ হিসেবেই রয়ে যাবেন। খবরের শিরোনাম আজও বদলায়নি। সেদিন ছিল, ‘‌ওই ডাইনি আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে’। আজ হল, ‘‌আমার ভাইয়ের ওপর কালা জাদু করত ওই মেয়ে।’ কোথায় এগোলাম আমরা?‌ কেবল প্রযুক্তিই এগোলো। সঙ্গে নিয়ে এল একজন মহিলার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত তথ্য। যা হয়তো, তদন্তের জন্য প্র‌য়োজন না। প্রয়োজন কেবল চ্যানেলের টিআরপি বাড়ানোর জন্য। 
ফ্ল্যাশব্যাকে যদি ৩০ বছর আগে যাওয়া যায়, দেখা যাবে, ১৯৯০ সালের মার্চমাসে বিয়ে হল অভিনেতা রেখা ও ব্যবসায়ী মুকেশ আগরওয়ালের। কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। রেখা জানতেন না যে মুকেশ গুরুতর মানসিক অবসাদে ভোগেন। তাঁর বন্ধুদের থেকে পরে এও জানতে পারেন যে মুকেশের মধ্যে অনেক আগে থেকেই আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। মুকেশ নানাভাবে সমস্যা তৈরি করতে থাকেন। তাঁর বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ফলে দাম্পত্য কলহ এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে রেখা বাধ্য হন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে। তারই মধ্যে মুকেশের ব্যবসা মন্দার মুখ দেখতে শুরু করে। সেই বছরই অক্টোবর মাসে মুকেশ আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে লিখেছিলেন, ‘কেউ দোষী নয়।’‌‌ এরপরেই গোটা সমাজ এবং বলিউড ইন্ডাস্ট্রিও রেখাকে দায়ী করতে শুরু করে। তখন খবরের কাগজের প্রথম পাতা ভরিয়ে ছাপা হয়েছিল মুকেশের মায়ের সাক্ষাৎকার। যিনি বলছেন, ‘‌ওই ডাইনি আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। ভগবান ওকে কোনওদিনও ক্ষমা করবেন না।’‌ এছাড়াও কিছু শিরোনাম এমন ছিল, ‘‌দ্য ব্ল্যাক ইউডো’, ‘‌মুকেশের আত্মহত্যার পেছনে ভয়াবহ সত্য’‌‌। দেশজুড়ে শুরু হল ‘‌ডাইনি শিকার’। রেখার নাম দেওয়া হল ‘‌ঠাণ্ডা হৃদয়ের পুরুষ–খেকো’। এখন আর অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তবে পরিচালক সুভাষ ঘাই ও অভিনেতা অনুপম খেরের মন্তব্যগুলি আজও বাঁধিয়ে রাখার মতো। ঘাই বলেছিলেন, ‘‌রেখার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মুখে কালি লেপে দিল। যা কোনওদিন মুছে ফেলা যাবে না। এবং এরপর থেকে কোনও সম্মানীয় পরিবার কোনও নায়িকাকে নিজেদের ঘরের বউ হিসেবে আনার আগে দু’‌বার ভাববে। কাজের ক্ষেত্রেও পথটি কঠিন হয়ে যাবে। এমনকী কোনও বিবেকবান পরিচালকও এরকম মহিলাকে কাজ দেবে না। দর্শক কীভাবে এরকম মহিলাকে ভারতের নারী বা ন্যায়ের দেবী হিসেবে মেনে নেবে?‌’ অনুপম খের বলেছিলেন, ‘‌তিনি একজন জাতীয় খলনায়িকাতে পরিণত হয়েছেন। ব্যক্তিগত ও পেশাগত, দুই জীবনেই প্রভাব পড়বে রেখার। আমি জানি না কখনও সামনাসামনি দেখা হলে আমার প্রতিক্রিয়া কী হবে।’‌‌ 
যখন রেখার জীবনী লেখা হয়, তখন বেশ কিছু বিষয় সামনে আসে। কিন্তু তখন যা ড্যামেজ হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। বেশ খানিক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ‘‌ফুল বানে অঙ্গারে’ ছবির মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কামব্যাক। তারপর থেকে কোনও পুরুষকে তাঁর জীবনে কলকাঠি নাড়তে অনুমতি দেননি রেখা। একা নিজের জীবনের ম্যাপ তৈরি করেছেন তিনি।
৩০ বছর বাদে একইরকম মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে রিয়ার জীবন। যেখানে হাজার হাজার ক্যামেরা ও বুম মাইক তাঁকে ঠুকরিয়ে শেষ করে দিতে চাইছে। ওঝার মতো তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে সমস্ত দেশবাসী। সুশান্তের মৃত্যুতে রিয়ার ভূমিকা ছিল বলে ইডি বা সিবিআই এখনও পর্যন্ত কোনও সূত্র পায়নি। কিন্তু দেশবাসীর কাছে রিয়াই ‘‌ডাইনি’। রিয়ার ওঁর ‘‌হত্যাকারী’‌।‌ ‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top