অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌সুচিত্রা সেন আমার পায়ে মাথা রেখে কেঁদেছিলেন’‌, গত বছর আমাদের ‘‌বিনোদন’‌-‌এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে একথা বলেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। এটাই ছিল শিরোনাম। তাই নিয়ে অনেক ফোন এসেছিল আজকাল দপ্তরে, রঞ্জিত মল্লিকের কাছেও। তখন তিনি ছিলেন অবসরে। বলেছিলেন, আর ছবি করব না। এবছর অন্য পরিস্থিতি। ৬ বছরের অবসর ভেঙে এবছর তিনটি ছবিতে বাংলার দর্শকদের সামনে আসছেন তিনি। সেই ছবিগুলির একটি, ‘‌হানিমুন’‌, মুক্তি পেল গতকাল।
তার তিনদিন আগে, তাঁর গল্ফ গার্ডেনের বাড়িতে রঞ্জিত মল্লিকের মুখোমুখি আমরা। শুরুতেই উঠল সুচিত্রা সেন প্রসঙ্গ। পূর্ণেন্দু পত্রী শুরু করেছিলেন ‘‌চতুরঙ্গ’‌ ছবির শুটিং। রঞ্জিত মল্লিক তখন বাংলা ছবির নবাগত নায়ক। সবে মৃণাল সেনের ‘‌ইন্টারভিউ’‌ করেছেন। ‘‌চতুরঙ্গ’‌-‌য় রঞ্জিত মল্লিক হয়েছিলেন শচীশ, সুচিত্রা সেন ছিলেন দামিনীর ভূমিকায়। প্রথম দিনের শুটিংয়েই শচীশ তথা রঞ্জিত মল্লিকের পায়ে মাথা রেখে কেঁদেছিলেন দামিনী তথা সুচিত্রা সেন। মহানায়িকার সঙ্গে প্রথম দিনেই এমন একটা দৃশ্যের শুটিংয়ে হাত-‌পা কেঁপে অস্থির হয়েছিলেন নবাগত নায়ক। মিসেস সেন-‌ই তাঁকে ভরসা জুগিয়েছিলেন।
কিন্তু, একদিন শুটিংয়ের পর এই ছবির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ‘‌চতুরঙ্গ’‌-‌র প্রযোজক অকস্মাৎ মারা যাওয়ায় ছবির কাজ সাময়িক নয়, চিরদিনের জন্যেই বন্ধ হয়ে যায়। সেই প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু হয় রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে কথোপকথন।
• ‘‌চতুরঙ্গ’‌ না করতে পারার আক্ষেপটা নিশ্চয়ই রয়ে গেছে?‌
•• সেটা তো থাকবেই। পূর্ণেন্দু পত্রী অন্যধরনের পরিচালক ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ‘‌ছেঁড়া তমসুক’‌ করেছি। ‘‌চতুরঙ্গ’‌ তো অসাধারণ উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের। সঙ্গে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। কার না আক্ষেপ হবে?‌
• পরে তো ওঁর সঙ্গে একটাই ছবি করেছেন আপনি—‘‌দেবী চৌধুরানী’‌?‌
•• মুক্তি পাওয়া ছবি তো একটাই। কিন্তু ‘‌চতুরঙ্গ’‌ প্রথম দিনেই অসমাপ্ত হয়ে গেল। আর একটা ছবিও শুরু হয়েছিল সুচিত্রা সেনের সঙ্গে।
• কী ছবি?‌ ক’‌দিন শুটিং হয়েছিল?‌
•• দীনেন গুপ্তর পরিচালনায় ‘‌কৃষ্ণকান্তের উইল’‌। সাত-‌আটদিন শুটিং হওয়ার পর সেই ছবিও বন্ধ হয়ে যায়।
• তাহলে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে হ্যাটট্রিক চান্স মিস?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ সেটা ঠিক, সেটা ঠিক। হ্যাটট্রিক হতে পারত।
• ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’‌ না হলেও বঙ্কিমচন্দ্রের ‘‌দেবী চৌধুরানী’‌ তো হল।
•• হ্যঁা, আসলে সেই সময় আমি বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনীর স্পেশালিস্ট নায়ক হয়ে উঠেছিলাম। ‘‌দেবী চৌধুরাণী’‌ তো করেইছি, ‘‌রজনী’‌, ‘‌বিষবৃক্ষ’‌, ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌ করেছি।
• এসবই সাহিত্য-‌নির্ভর ছবি। আপনার কি মনে হয়, সাহিত্য থেকে সরে যাওয়ার জন্যে বাংলা ছবি সেভাবে দর্শক-‌গ্রাহ্য হচ্ছে না?‌ তরুণ মজুমদার বার-‌বার বলেন, ভাল ছবির জন্যে সাহিত্যের কাছে যেতে হবে বাংলা সিনেমাকে।
•• দেখুন, ভাল গল্প ছাড়া তো ভাল ছবি হতে পারে না। গল্পটা তো ছবির ভিত্তি। কিন্তু এখন যে বাংলা ছবি সেভাবে ব্যবসা করতে পারছে না, তার বড় কারণ টেলিভিশন। টিভিতে সারা সপ্তাহ জুড়ে এত-‌এত ছবি দেখানো হয় যে মানুষ আর হল-‌এ যেতে আগ্রহী হচ্ছে না। লোকে ফোনেও সিনেমা দেখে নিচ্ছে।
• কিন্তু কিছু কিছু ছবি তো এখনও লোকে আগ্রহ নিয়ে সিনেমা হলে দেখতে যাচ্ছেন।
•• হ্যঁা, যাচ্ছেন। তার সংখ্যা সত্যিই খুব কম। ছবির বিষয় বা মেকিং এমন হতে হবে, যেটার ইমপ্যাক্ট আপনি টেলিভিশনের ছোট পর্দায় পাবেন না। দেখুন, হিন্দিতে একশ কোটি টাকা খরচ করে যে ছবি তৈরি হচ্ছে, দর্শক সেই গ্র‌্যাঞ্জার, সেই বিশাল ব্যাপারটা টিভিতে পাবেন না। যখন ৭০ মিলিমিটারে ‘‌শোলে’‌ দেখানো হল সিনেমায়, তখন লোকে তো হুমড়ি খেয়ে সেই ছবি দেখলেন। সেই ইমপ্যাক্ট তো টিভিতে পাওয়া কোনওমতেই সম্ভব নয়। কিন্তু টাকার বাজেটে বাংলা ছবি তো হিন্দির সঙ্গে পারবে না। একদিকে তৈরি হচ্ছে প্রচুর বাংলা ছবি, অন্যদিকে হলের সংখ্যা ৭০০ থেকে ৩০০-‌রও কমে নেমে এসেছে।
• তবুও সমস্যা কিন্তু মিটছে না। অধিকাংশ ছবিই নাকি লোকসানে চলছে।
•• দেখুন, সমাধানের কথাটাও ভাবতে হবে। প্রথমত, ভাল গল্প, ভাল পরিচালনা তো চাইই। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সব বাঙালির কাছে ছবি পৌঁছে দেওয়া। তার জন্যে দুই বাংলা যদি যৌথভাবে ছবি তৈরি করে, এক লাফে বেড়ে যাবে দর্শক সংখ্যা। সারা পৃথিবীতে ভাষা-ভাষীর বিচারে বাংলা বোধহয় পঞ্চম স্থানে। বাইশ-‌ চব্বিশ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তাদের কাছে বাংলা ছবিকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে হবে না। একসঙ্গে বসতে হবে প্রযোজক, পরিচালকদের।
• আপনি তো ভালই ভাবনাচিন্তা করেছেন। এটা কি অবসর নেওয়ার সুফল?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ তা বলতে পারেন। আর একটা বিষয় বাংলা ছবির ক্ষতি করেছে। সেটা হল, গ্রামের ছবি, শহরের ছবি। আগে তো কখনও শুনিনি এটা মফস্‌সলের ছবি, এটা কলকাতার ছবি। সত্যজিৎ রায়ের ছবির ক্ষেত্রেও শুনিনি, উত্তম-‌সুচিত্রার ছবির ক্ষেত্রেও শুনিনি। এই বিভাজনটা অক্ষমতা ঢাকার চেষ্টা।
• আপনি কি এই বিভাজন দেখেই অবসর নিয়েছিলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ না, না। আসলে চল্লিশ-‌বিয়াল্লিশ বছর তো ছবি করলাম। একটা একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল। মনে হল এবার একটু নিজের মতো অন্য কিছু করি। কত কিছুই তো করার আছে। দেশ-‌বিদেশ ঘোরা, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারা, বই পড়া। কেনিয়া, ইজিপ্ট, ইউরোপ, আমেরিকা ঘুরলাম। পাঁচরকম মানুষের সঙ্গে কথা বললাম। অনেক বই পড়লাম।
• একঘেয়েমির জন্যে অবসর নিয়েছিলেন বললেন। সেটা কি বাংলা ছবিতে দক্ষিণী ছবির রিমেকের বাড়াবাড়িও একটা কারণ?‌
•• হ্যঁা, সেটাও একটা কারণ। দেখুন আমরা ভাত-‌ডাল খাওয়া বাঙালি। রোজ রোজ ইডলি-‌ধোসা খেতে কেন ভাল লাগবে?‌ সহ্যই বা হবে কেন?‌ দক্ষিণী ছবির রিমেকও আমার অবসর নেওয়ার অবশ্যই একটা বড় কারণ।
• পাঁচ-‌ছ বছর বাদে অভিনয়ে ফিরলেন তিনটে ছবি নিয়ে। প্রথম যে ছবি মুক্তি পাচ্ছে, সেই ‘‌হানিমুন’‌ও তো ‘‌ছুটির ফাঁদে’‌র রিমেক?‌
•• বাংলা ছবি থেকে রিমেক তো আমি অনেক করেছি। তাতে তো আমার আপত্তি নেই। আমি পিনাকী মুখার্জির ‘‌প্রতিশ্রুতি’‌ করেছি। সেটা রিমেক। আগে আমার চরিত্রটা, যতদূর মনে পড়ছে পাহাড়ি সান্যাল করেছিলেন। আমার ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌ও রিমেক। আমার অত বড় হিট ‘‌স্বয়ংসিদ্ধা’‌ও তো রিমেক। পুরনো ছবিতে আমার চরিত্রটা করেছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
• আপনি ঠিক ক’‌বছর বাদে অবসর ভেঙে আবার অভিনয়ে ফিরলেন?‌
•• ৬ বছর তো হবেই।
• অনেক সময় বিয়ের জন্যে কিংবা সন্তান হওয়ার জন্যে দু-‌এক বছর বিরতি দিয়ে যখন কোনও নায়িকা আবার ছবি শুরু করেন, তখন নায়িকার কামব্যাক নিয়ে কাগজপত্রে বেশ হুলুস্থুলু হয়। আপনার ক্ষেত্রে.‌.‌.‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ আমার ক্ষেত্রে কি কামব্যাক হবে না?‌
• কামব্যাক-‌ই তো!‌ বহু বছর আগে ঘোষণা করে অভিনয় ছেড়েছিলেন বিকাশ রায়। আর সিনেমায় ফেরেননি। আপনিও ঘোষণা করেছিলেন অবসরের। এবং কামব্যাক করলেন।
•• কামব্যাক-‌ফামব্যাক কিছু নয়। দীর্ঘ ৪২ বছরের একঘেয়েমি, দক্ষিণী রিমেকে অনীহা, সব মিলিয়ে নিজের মতো থাকার জন্যে অবসর নিয়েছিলাম। আমি জীবনে যত ছবিতে অভিনয় করেছি, তার দ্বিগুণ ছবি ফিরিয়ে দিয়েছি। অবসর নেওয়ার পরেও বহু মানুষ লাগাতর বলে যাচ্ছিলেন ছবি করার জন্যে। কিন্তু কাছের লোকেরা যখন বলে, তখন তো ভাবতেই হয়।
• আপনি তো প্রেমেন্দুবিকাশ চাকির ‘‌হানিমুন’‌ ছাড়াও হরনাথ চক্রবর্তীর ‘‌কাঁটায় কাঁটায়’‌ করলেন। নেহাল দত্ত-‌র ‘‌অপরাজেয়’‌-‌তেও কাজ করছেন। অবসর ভেঙে হ্যাটট্রিক?‌ ‌
‌•• হ্যাটট্রিক হল বটে!‌ (‌হাসি)‌ আসলে সেই ‘‌শত্রু’‌ থেকে হরনাথের সঙ্গে পরিচয়। তখন অঞ্জনবাবুর (‌অঞ্জন চৌধুরি)‌ সহকারী হরনাথ। তারপর ওর সঙ্গে অনেক ছবি করেছি। ৩০ বছরের সম্পর্ক। হরনাথ এসে যখন বলল, নারায়ণ সান্যালের ‘‌কাঁটায় কাঁটায়’‌ নিয়ে ছবি করব, আপনাকে চাই, তখন হরনাথকে না বলি কী করে?‌ চাকির (‌প্রেমেন্দুবিকাশ)‌ সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। ও ক্যামেরাম্যান। প্রথম ছবি পরিচালনা করছে। না বলতে পারিনি। নেহাল ছিল তরুণ মজুমদারের সহকারী পরিচালক। ‘চাঁদের বাড়ি‌’‌র সময় বলেছিল, যখন ছবি করব, আপনাকে চাই দাদা। নেহাল যখন এসে বলল, না করতে পারিনি।
• তাহলে নতুন পরিচালকরা আপনার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারেন?‌ 
•• নিশ্চয়ই পারেন। নেহাল তো নতুন-‌ই। চাকিও পরিচালক হিসেবে নতুন। কিন্তু আমার একটাই কন্ডিশন, গল্পটা ভদ্রস্থ এবং বিশ্বস্ত হওয়া দরকার। তা না হলে আমার পক্ষে অভিনয় করা সম্ভব নয়।
• আপনার কন্যা কোয়েল তো শুধু অভিনেত্রী নন, নিসপালের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে ‘সুরিন্দর ফিল্মস‌’‌-‌এর অন্যতম কর্ণধারও বটে। ‘হানিমুন‌’‌-‌এর প্রযোজনায় গ্রিনটাচ যেমন আছে, সুরিন্দর ফিল্মসও আছে। এরপর কোয়েল যদি প্রযোজক হিসেবে নতুন ছবির প্রস্তাব নিয়ে আসেন, সেখানে কী শর্ত থাকবে আপনার?‌
•• একই শর্ত। গল্পটা ভদ্রস্থ এবং বিশ্বস্ত হতে হবে। অবিশ্বাস্য দক্ষিণী রিমেক হবেনা। কোয়েল শর্ত পূরণ করলে তবেই রাজি হব। (হাসতে হাসতে‌)‌ মেয়ে বলে ছাড় নেই। সন্তুষ্ট না হলে কোয়েলকেও না বলে দেব।
• তাহলে নতুন ইনিংস শুরু হল আপনার?‌
•• নতুন ইনিংস শুরু হলেও লাগাতার খেলবনা।
• আপনার বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র মল্লিক কবিতা লিখতেন। আপনিও লেখেন নাকি গোপনে গোপনে?‌
• (হাসতে হাসতে‌)‌ না, না, চেষ্টা করে দেখেছি, হয়নি। তবে কবিতা পড়তে ভালবাসি। আমার অভিনয়ে হাতেখড়ি বাবার কবির লড়াই-‌এর লেখা দিয়ে। তখন আমার বছর দশেক বয়েস। ভবানীপুরে আমাদের মল্লিক বাড়িতে নাচ, গান, নাটকের চর্চা লেগেই থাকত। সেই সময় আমি বাবার কবির লড়াই-‌এ ‘হেবো‌’‌ করেছিলাম। আমার ভাই করেছিল ‘‌জগা’‌।
• কে জিতেছিল?‌
•• হেবো আর জগার কবির লড়াই-‌এর শেষে বলা হয়েছিল ‘সবার সম্মুখে হইল প্রমাণ / ‌দুই দলই লড়িয়াছে সমান সমান।’‌ তাই আমি আর ভাই দুজনেই জিতেছিলাম।
• আপনি দুটো হিন্দি ছবিও করেছিলেন।
•• হ্যাঁ। ‘পরিবর্তন‌’‌ আর ‘‌নয়া নশা’‌।
• তারপর আর করলেন না কেন?‌ মুম্বই যেতে অনীহা?‌
•• ব্যাপক অনীহা। যেতেই পারতাম না। প্রথমত আমি অত কেরিয়ারিস্ট ছিলাম না কখনও। আর, সবচেয়ে বড় কারণ, কলকাতায় আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলিতে আড়াইশো জন লোক। একান্নবর্তী পরিবার ছেড়ে, একা একা মুম্বই গিয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। আমি সবাইকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছি। একা একা ভাল থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top